অগ্নিঝড়া কন্যার অগ্নিঝড়া সময়

ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস একটি বিষয়ে এসে বিভক্ত হয় যায়। সেটি হলো সময় ও চরিত্রে। বলা বাহুল্য সময়কে তো এখানে বিভাজন কিংবা এড়ানো অসম্ভব। তাহলে তো ইতিহাসের আশ্রয়টুকুই শেষ হয়ে যায়। বাকি থাকে চরিত্র। এই চরিত্রগুলোর উপরই নির্ভর করে উপন্যাসের মূল কাঠামো এবং বক্তব্য। সময়টা ইতিহাসের বলে কোনো সন্দেহ নেই।। চরিত্রগুলোও হতে পারে ওই সময়েরই। কিন্তু সেগুলো হতে পারে কাল্পনিক। অন্যদিকে সময়টা ইতিহাসের হয়েও চরিত্রগুলো হতে পারে বাস্তব। যে-বাস্তব চরিত্রগুলো ওই সময়েরই ইতিহাসের নির্ণায়ক, গতিপথের সঞ্চালক কিংবা নতুন ইতিহাসেরই জনক। বলতে দ্বিধা নেই কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাস লেখা যতটা সহজ বাস্তব চরিত্র নিয়ে লেখা ততটাই কঠিন। কারণ এখানে লেখককে তথ্য, তত্ত্ব, ঘটনার পরম্পরা, সম্পূরক ঘটনা- প্রতিটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সত্যাশ্রয়ী হতে হয়। সামান্যতম বিচ্যুতি থেকেও মুক্ত হতে হয়।

সমস্যা হলো ইতিহাসের এই উপাদানগুলো তো নন-ফিকশনাল। কিন্তু লেখক ব্রতী হয়েছেন উপন্যাস লিখতে। নন-ফিকশনাল উপাদান ব্যবহার করে লেখককে যখন ফিকশন লিখতে বসতে হয় তখন ইতিহাসের সত্যনিষ্টতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সৃজনশীল উপন্যাস লেখা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।
লেখক মোস্তফা কামাল সেই জটিল পথের পথিক হলেন। তাঁর উপন্যাস অগ্নিকন্যার সময় আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে উজ্জ্ব সময়ের, তাঁর চরিত্রগুলো আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাজনৈতিক সৃজনশীলজন। যাঁদের আত্মত্যাগের উপর দাঁড়িয়ে আজ আমরা ভোগ করছি স্বাধীনতার সুখ।

শেরে বাংলা বলতে যেমন একজন এ কে ফজলুল হককেই বুঝি, বঙ্গবন্ধু বলতে যেমন একজন শেখ মুজিবুর রহমানকেই বুঝি তেমনি অগ্নিকন্যা বলতেও আমরা একজন মতিয়া চৌধুরীকেই বুঝি। কিন্তু অগ্নিকন্যা উপন্যাস শুধু একজন মতিয়া চৌধুরীরই জীবন-বয়ান নয়।
তাহলে অগ্নিকন্যায় কী রয়েছে। অগ্নিকন্যায় রয়েছে একজন মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট। আর সেই প্রেক্ষাপটে অবলীলায় চলে আসে আমাদের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রেরা। চলে আসে সাতচল্লিশের দেশভাগ। দেশভাগের নায়কেরা (কিংবা খলনায়কেরা)। চলে আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চলে আসে চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, চলে আসে ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন। অগ্নিঝরা উপনাসে প্রথম খণ্ডের ব্যাপ্তি-কাল এ পর্যন্তই।

তাতেই অবধারিতভাবে চলে আসে আমাদের নায়কেরা। চলে আসে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ-সহ আরো অনেকে। চলে আসে আমাদের চিরশত্রুরাও।
ভাবতেই শিহরিত হতে হয় এমন একটা উপন্যাস যার চরিত্রগুলো আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাদের কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই অগ্নিকন্যার উপন্যাস না হয়ে ইতিহাসগ্রন্থ হযে যাওয়ার কথা। লেখক মোস্তফা কামাল প্রথমেই উপন্যাসটিকে এই ত্রুটি থেকে মুক্ত করেছেন। ফলে পাঠকের পিপাসা জন্মেছে একটি উপন্যাস পড়ার। ইতিহাস পড়ার নয়। তিনি ইতিহাসের গুরুগাম্ভীর্য পরিহার করেছেন, পরিহার করেছেন ইতিহাস কপচানোর প্রবণতাও। ফলে পাঠক ভারমুক্ত হয়েছে ইতিহাসের চাপ থেকে। কিন্তু লেখক সুকৌশলে উপন্যাসের কাঠামোর ভেতর দিয়েই প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন ইতিহাসের সেই অংশের দিকে যেখানে হয়তোবা ঠিকমতো আলো পড়েনি। আমরা হয়তোবা একটি ঘটনার ফলাফল বা প্রতিক্রিয়া দেখেছি। কিন্তু এর অন্তরালের ঘটনা ও ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে জানতাম না। লেখক উপন্যাসের কাঠামোর ভেতরে দিয়ে সেখানেও আলো ফেলেছেন। ফলে পাঠক উপন্যাসের নামে আসলে ইতিহাসের অলি-গলির ভেতরে ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। লেখক মোস্তফা কামাল সুকৌশলে এ কাজটি করেছেন।

তাতে প্রচলিত জানা ইতিহাসের সাথে আড়ালের ইতিহাসও প্রকাশ্য হয়েছে। পাঠক উপন্যাস পাঠের আনন্দের সাথে ইতিহাসের জানা-অজানা তথ্যের সাথে পরিচিত হতে পেরেছেন। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য যা অত্যন্ত জরুরি।

ছোট মতিয়ার কথা দিয়েই উপন্যাসের শুরু। মনে হবে এই মতিয়া যেকোনো মতিয়া। কিন্তু দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা জানা যায় তখনই খটকা লাগে আগের অধ্যায়ে পড়া মতিয়া সাধারণ মতিয়া নন। তারপর তো একে একে চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন মওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উপস্থিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানী স্বার্থরক্ষার সবগুলো খল চরিত্র। জানা হতে থাকে পূর্ববাংলা নিয়ে সব চক্রান্তের খবর। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত দিনে দিনে যুক্তিপূর্ণ এবং মজবুত হতে থাকে। গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের একটি দলের। যে দলের সভাপতি হন মওলানা ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু। ধীরে ধীরে আরো অসাম্প্রদায়িক চরিত্র অর্জন করার মাধ্যমে জনগণের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়ে যায় দলটি।

কিন্তু দলের ভেতরে ভাঙন ধরানোর বহুবিধ ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধুকেই সামাল দিতে হয়। উত্তপ্ত হতে থাকে ছাত্র রাজনীতি। ইডেন কলেজের এক ছাত্রী সংগঠিত করতে থাকনে তাদের ছাত্রদের। বঙ্গবন্ধুর অন্যায় আটকাদেশের বিরুদ্ধে মিছিলে নামেন তিনি। পশ্চিম পাকিস্তানীদে যে কোন অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন তিনি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে তিনিই মতিয়া চৌধুরী। এরই মধ্যে পরিচয় হয়ে যায় আরেক ডাকসাইটে সাংবাদিক বজলুর রহমানের সাথে। তিনি দৈনিক সংবাদের সহকারি সম্পাদক। মতিয়ার এ হেন প্রতিবাদী আচরণের দায় গিয়ে পড়তে থাকে তার পুলিশ অফিসার বাবার উপর। বারবার তাকে হেনস্তা করা হয়। দেয়া হয় হুমকি। একবার মিছিল থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় মতিয়াকে। মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে নিয়ে আসেন তার পুলিশ অফিসার বাবা। মতিয়া এতে অপমানিত বোধ করেন। বলেন আমাকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে আনা তোমার ঠিক হয়নি। তুমি নিজেকে ছেটে করেছো। আমাকেও ছোট করেছো। কিন্তু পুলিশ অফিসার বাবা বলেন, তোকে জেল হাজতে রেখে আমি বাসায় গিয়ে ঘুমায় কী করে। বোঝা যাচ্ছে, পিতৃত্বের কাছে হেরে যাচ্ছে পুলিশ অফিসারের চরিত্র।
তারপর মতিয়ার প্রতিবাদী চরিত্র ও মিছিল মিটিংয়ের বিরুদ্ধে নানাবিধ হুমকি আসতে থাকে। বাবা পুলিশ অফিসার হওয়ার কারণে পুলিশ কর্তৃপক্ষের শীর্ষ মহল থেকে হুমকি ও বাধা আসতে থাকে। অভিভাবক হিসেবে যখন বাবা এসব সামলাচ্ছেন তখন মতিয়া একটি কাজ করে বসে। হুট করে বজলুর রহমানকে বিয়ে করে ফেলে। বিষয়টি এতই আচমকা ঘটে যে বজলুর রহমান নিজেও চমকে যান। কারণ একদিন হঠাৎ এসেই মতিয়া বলেন, চলো আজ আমরা বিয়ে করব।

বাসায় ফিরে বাবা মাকে সংবাদটি দিয়ে চমকে দেন তিনি। যুক্তি দেখান এখন থেকে লিগ্যাল অভিভাবক হিসেবে তোমার দায় নিতে হবে না। সব দায় গিয়ে পড়বে বজলুর রহমানের উপরে। মেয়ের বুদ্ধিমত্তায় আনন্দিত বোধ করেন তারা।
এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করে ফেলেছেন ছয়দফা। যা প্রকাশ হবার সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের আত্মার দাবী হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। মতিয়া বুঝতে পারছেন এটাই স্বাধীনতার মূল ইশতেহার। ছয়দফা ক্রমাগত পরিণত হবে একদফায়। দৈনিক সংবাদে হেডলাইনের সংবাদটি পড়েই তিনি নিজের ঘরে গিয়ে বসলেন। গভীর মনোযোগ দিয়ে পত্রিকার প্রতিবেদনটি আবার পড়লেন। মনে মনে বললেন ক্যাম্পাসে যেতে হবে। আলেচানা করতে হবে ছয়দফা নিয়ে। বসতে হবে ছাত্রনেতাদের সাথে। গড়ে তুলতে হবে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন।
এখানেই শেষ হযে যায় উপন্যাস। বুঝা যাচ্ছে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যার হবার প্রধান ঘটনা ঘটে গেছে। ছয় দফাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে রাজনীতি। মতিয়া চৌধুরী ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান।
এক অর্থে অগ্নিকন্যা উপন্যাসটি জননেত্রী মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যা হযে উঠবার ভূমিকা। দীর্ঘ ইতিহাস যার প্রেক্ষাপট রচনা করে দিয়েেেছ। মতিয়া চৌধুরীও সেই প্রেক্ষাপটকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। সঠিক পাঠ নিতে পেরেছেন সময়ের। এই সুদীর্ঘ প্রেক্ষাপট পেরিয়ে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিকন্যা হয়ে উঠবার পেছনে রয়েছে হাজারো সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কাহিনি। পাঠকের পিপাসা ইতোমধ্যে পেয়েছে চরম রূপ। অগ্নিকন্যা উপনাসের পরবর্তী অংশ হয়ে উঠবে সেই পিপাসা মেটানোর উজ্জ্বল উদ্ধার।

যেখান থেকে নেওয়া

তৃতীয় অশ্বারোহীর মলাট খুলে

October 20, 2017

পেত্নি মরলে দাঁড়কাক হয়

October 20, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *