নোবেল বিজয়ী ইশিগুরোর লেখালেখি

জাপানি বংশোদ্ভূত কাজুও ইশিগুরো ব্রিটিশ নাগরিক। এবারের (২০১৭) নোবেল পুরস্কার তিনি একজন ব্রিটিশ হিসেবে পেয়েছেন। ১৯৬০ সালে ইশিগুরোর বয়স যখন পাঁচ বছর, সমুদ্রবিজ্ঞানী বাবার সাথে ইংল্যান্ড গমন করেন। সেখানেই তার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কাটে। পরবর্তী বছরগুলো ব্রিটেনে তিনি অতিবাহিত করেন। জাপানের সাথে তার কোনো যোগসূত্র থাকে না। জাপানের জীবন কিংবা স্মৃতি নিয়ে তিনি কোনো উপন্যাস লেখেননি। তার চেতনায় ও স্মৃতিতে জন্মভূমি জাপানের অস্তিত্ব নেই।

তার লেখার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট লন্ডন এবং সেখানকার জীবন। সেই দেশের জীবনশৈলী ও সংস্কৃতি। তার প্রথম উপন্যাস ১৯৮২ সালে লেখা, শিরোনাম ‘আ’ পেইল ভিউ অব হিলস (A PALE VIEW OF HILLS) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) প্রেক্ষাপটে রচিত। কেন্দ্রীয় চরিত্রে একজন বিধবা। যিনি নাগাসাকির বোমা বিস্ফোরণে বেঁচে যান।

১৯৮৬ সালে ইশিগুরো আরেকটি উপন্যাস নাম ‘অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফোটিং ওয়ার্ল্ড (AN ARTIST OF THE FLOATING WORLD) উপন্যাসটি একজন শিল্পীর জীবনকাহিনী। যিনি তার সৈনিকজীবনের অতীত স্মরণ করছেনে। এ উপন্যাসটি সেই বছর বুকার পুরস্কারের ক্রম তালিকায় স্থান পেয়েছিল।
তার তৃতীয় উপন্যাস, ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ (THE REMAINS OF THE DAY) ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত যুদ্ধÑ পরবর্তী ইংল্যান্ডের পটভূমিকায় রচিত একজন ব্রিটিশ বয়স্ক বাটলারের অতীত স্মৃতিচারণ। উপন্যাসটি বুকার পুরস্কার পায়। এটা চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে। এ চলচ্চিত্রও ১৯৯৩ সালে পুরস্কৃত হয়।
১৯৯৭ সালে ‘দ্য আনকনসোল্ড (THE UNCONSOLED) প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি একজন পিয়ানোবাদকের করুণ জীবন। যিনি তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ২০০০ সালে ‘হোয়েন উই ওয়্যার অরফানস (WHEN WE WERE ORPHANS) অনেকটা রহস্য উপন্যাসের আদলে রচিত ও প্রকাশিত হয়।
২০০৫ সালে রচিত ‘(নেভার লেট মি গো’) ২০১০ সালে এই উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়িত হয়।

এখানে একটি বিষয় লক্ষ করা যায়, ইশিগুরোর বেশির ভাগ উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে এবং দর্শকনন্দিত হয়েছে।
তিনি তার উপন্যাসে ব্রিটিশ সমাজের ভেতরের শ্রেণী-বিভাজনকে চমৎকার নৈপুণ্যে তুলে ধরেছেন। তার ভাষা সাবলীল, সরল, মেদহীন এবং স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি ‘ন্যারেটিভ’-এর আশ্রয় নিয়ে প্রতিটি উপন্যাসকে একটা স্থাপত্যশিল্পের মতো গড়ে তুলেছেন। তার দীর্ঘ ৩৫ বছরের সাহিত্যজীবনে তার অপরূপ গদ্যের জন্য বহুবার পুরস্কার পেয়েছেন। প্রায় সব উপন্যাস প্রথমপুরুষে লেখা। ইশিগুরো খুব অন্তরঙ্গ এক শৈলী ব্যবহার করেছেন এই উপন্যাসগুলোতে।
জাপানি উপন্যাসের যে ঐতিহ্য ও ধারা গড়ে উঠেছে, সেই পথে ইশিগুরো পা বাড়াননি। তার পথ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি নিজস্ব এক নান্দনিক পৃথিবী গড়ে তুলেছেন। জাপানি শিল্পসংস্কৃতির ছিটেফোঁটাও তার উপন্যাসে নেই। সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ লেখক এবং ইংরেজি সাহিত্যের ধারাবাহিকতার প্রেক্ষাপটে ফেলে তাকে বিচার করতে হবে।
তিনি ইংরেজিতে লিখে থাকেন। অন্যএক জনপ্রিয় জাপানি ঔপন্যাসিক মুরাকামি যেমন জাপানি ভাষায় লেখেন, তারপর তা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়, ইশিগুরোর ক্ষেত্রে তা নয়। তিনি সরাসরি ইংরেজি ভাষায় লেখেন।

জন্ম জাপানের বন্দরনগর নাগাসাকিতে ১৯৫৪ সালে, ১৯৬০ সালে বাবার হাত ধরে দেশত্যাগ; কিন্তু কোথাও তার উদ্বাস্তুজীবনের স্মৃতি নেই। হতে পারে, মাত্র পাঁচ বছর বয়স ছিল তার তখন, সেই কারণেই হয়তোবা শৈশব স্মৃতি তার অবচেতনে তেমনভাবে দাগ কাটেনি। কিন্তু তার কিছু উপন্যাসে বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা প্রেক্ষাপট হিসেবে এসেছে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৯ বছর পরে তার জন্ম, তিনি তার লেখায় যুদ্ধের করুণ পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
উল্লেখ্য, জাপানি সাহিত্যের সাথে আমাদের পরিচয় ষাট দশকে। নোবেল বিজয়ী ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার সহস্র স্মারক (Thousand Carnes) এর বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে। সেই সময়ে কলকাতার ‘দেশ’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় উপন্যাসটি ছাপা হয়েছিল।
বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে কওয়াবাতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের বুকার বিজয়ী মুরাকামি যতটা কাছের, ইশিগুরো ততটা নন। জাতিতে জাপানি হলেও ইশিগুরো আমাদের কাছে ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক।

দ্য টাইমস বুক রিভিউয়ের এক সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘নয়-দশ বছর বয়সে খুব গভীর আগ্রহে শার্লক হোমস আমাকে আকর্ষণ করে। আমি এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলাম যে, আমার আচার-আচরণেও তা প্রকাশ পায়।’ লন্ডনের ক্যান্টারবারির কেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজি সাহিত্য এবং দর্শন অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে ‘সৃজনশীল লেখা বা ক্রিয়েটিভ রাইটিং কাসে বেশ ক’জন ব্রিটিশ লেখকের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান, যা তার জীবনে এক বিশেষ ভূমিকা রাখে।

দ্য ইংলিশ পেশেন্টের কানাডিয়ান ঔপন্যাসিক মাইকেল ওদাজে বলেছেন, ‘আমি ভীষণ অভিভূত। তিনি এমন একজন রহস্যময় লেখক যে প্রতিবার তার প্রতিটি বই প্রকাশের পর আমি বিস্মিত হই।’
এরকম অসংখ্য লেখক তাদের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে ইশিগুরোকে অভিবাদন জানিয়েছেন। তিনি তার উপন্যাসে যেমন রহস্য এনেছেন, তেমনি ‘ফ্যান্টাসি’ এনেছেন, কোনো কোনো সমালোচক বলেন, ‘জাদু বাস্তবতাও’ এনেছেন। একটি নির্দিষ্ট মতবাদ তাকে আক্রান্ত করতে পারেনি।
ইশিগুরো ২৯তম নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক। তিনি শুধু ব্রিটেনে নন, সারা বিশ্বে, এমনকি জাপানেও জনপ্রিয়। তার উপন্যাস বাণিজ্যিকভাবে সফল। আমেরিকায় তার উপন্যাস ২.৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে।


স্ত্রী লরনা এবং একমাত্র মেয়ে নাওমিকে নিয়ে তার সুখী দাম্পত্যজীবন। স্ত্রী একজন সমাজকর্মী। বয়স এখন ৬২, নিয়মিত লেখালেখি করছেন, ইশিগুরো তার সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মাঝে ভীষণ বন্ধুবৎসল ও জনপ্রিয়।
৩৫ বছরের সাহিত্যজীবনে, তিনি অসংখ্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভীষণ বিনয়ী।
নিঃসন্দেহে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বের পাঠক তাকে আবার নতুন করে পাঠ করবেন। বাংলাদেশেও তার উপন্যাস দুই ভাষায় প্রাজ্ঞ ও যোগ্য অনুবাদকের সহানুভূতি পাবেন, এই প্রত্যাশা করি।

দিগন্ত সাহিত্য

প্রিয়তমা

October 21, 2017

প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বই

October 21, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *