শেকসপিয়র, ডিকেন্স এবং জেন অস্টিন

হরমন, কসমেটিস আর প্লাস্টিকের যুগে মানুষ চাইলেই বৃদ্ধ হওয়া ঠেকিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মৃত্যু! মৃত্যু কি? এই প্রশ্নের উত্তরে এখন পর্যন্ত সবাই সাদা খাতাই জমা দিয়েছে। তবে এটুকু বলা যায়, জীবনের পৃথিবীতে মৃত্যু হল খেয়ালি ঈশ্বরের এক ষড়যন্ত্রের নাম! সেই ষড়যন্ত্রের নামে ভিন্ন ভিন্ন দরোজা দিয়ে সবাই চলে যায় আগে কিংবা পরে। তবু ব্যবহার করতে না পারলে শ’ কিংবা হাজার শুধু সংখ্যা হয়েই থেকে যায়, আর ৪১ বছরের জীবনে জেন অস্টিন যা করে গেছেন তা দু’শ বছর পরও তাকে নিয়ে নতুন করে ভাবনায় মগ্ন করেছে ইংরেজ সমাজকে। ক’দিন আগেই ছিল অস্টিনের ২০০তম মৃত্যুবার্ষিকী।

‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ গ্রন্থের লেখক জেন অস্টিনকে বলা হয় নারী স্বাধীনতার অন্যতম পথিকৃৎ। ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’, ‘ম্যানস্ফিল্ড পার্ক’, ‘এমা’ তার বিখ্যাত রচনা। অষ্টাদশ শতকে তার উপন্যাসের নারীবাদী চরিত্রগুলোর প্রভাব পরবর্তীকালে নারীবাদীদের কাজে লক্ষ্য করা যায়। ১৮১৭ সালের জুলাই মাসে মাত্র ৪১ বছর বয়সে জেন অস্টিনের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ২০০ বছর পূর্তিতে ইংরেজ সরকার জেন অস্টিনের ছবি সংবলিত ২ পাউন্ডের কয়েন ও ১০ পাউন্ডের নোট বাজারে ছাড়ছে। জেন অস্টিন রানী এলিজাবেথের পর প্রথম ব্যক্তি, যার ছবি একই সময়ে কয়েন ও নোটে ব্যবহার করা হয়। ডাকটিকিটের বাইরে লেখক-সাহিত্যিকদের ছবি সংবলিত মুদ্রার প্রচলন উৎসাহ জোগাবে সাহিত্যিকদের তাদের কাজের প্রতি।

অস্টিন হ’ল প্রথম নারী লেখক (উইলিয়াম শেকসপিয়র এবং চার্লস ডিকেন্সের পদচিহ্ন অনুসরণ করে) যার ছবি নোটের ওপর ব্যবহার করা হয়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কার্নি উইংচেস্টার ক্যাথিড্রাল দাঁড়িয়ে কেন অস্টিন নির্বাচিত হয়েছেন এবং নোটের প্রযুক্তিগত দিক ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংকনোট দেশের সমষ্টিগত স্মৃতির ভাণ্ডার হিসেবে সেবা দেয়, যুক্তরাজ্যের মহিমান্বিত ইতিহাস সচেতনতা প্রচার করে এবং তার সর্বশ্রেষ্ঠ নাগরিকদের অবদানকে হাইলাইট করে। অস্টিনের উপন্যাসের একটি সার্বজনীন আবেদন আছে এবং প্রথম প্রকাশের মতো আজও তাদের বক্তব্য সমান শক্তিশালী। তবে অস্টিন সমর্থকদের এই নোটগুলো ব্যবহার করা শুরু করার আগে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
আধুনিক নারীবাদীরা জেনের লেখালেখির ভিতর যে নারীবাদ রয়েছে, তাকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নন। বরং তাদের কাছে এটা এক ধরনের ক্লাসিক ফিমেল ফ্যান্টাসি। কিন্তু লয়েড ডব্লুউ ব্রাউনের মতো অনেকেই জেনের লেখালেখি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, বিংশ শতাব্দীতে যে নারীবাদী ঘরানার উত্থান তার সূত্রটি ছিল অষ্টাদশ শতকে লেখা জেনের সাহিত্যে। এ প্রসঙ্গে জেনের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে সমালোচকরা উপস্থাপন করছেন জেনের উপন্যাসের চরিত্র কিংবা উপন্যাসের উপজীব্যকে।

জেন অস্টিন (১৬ ডিসেম্বর, ১৭৭৫, ১৮ জুলাই, ১৮১৭) ছিলেন একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক। ইংল্যান্ডের ভদ্রসমাজের পটভূমিকায় রচিত তার রোম্যান্টিক কথাসাহিত্য তাকে ইংরেজি সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা বহুপঠিত লেখকদের সারিতে স্থান দিয়েছে। তার বাস্তবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও তীক্ষè সমাজ বিশ্লেষণ গবেষক ও সমালোচক মহলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানটি পাকা করেছে। অস্টিনের উপন্যাসগুলো অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ভাবোপন্যাসের সমালোচনামূলক পুনরীক্ষণ। এগুলো উনবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতাবাদের উত্থানের একটি সোপানও বটে। তার উপন্যাসের প্লট মূলত হাস্যোদ্দীপক হলেও তা সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সেকালের মেয়েরা যে বিবাহ ব্যবস্থার ওপর কতটা নির্ভরশীল ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটায়। তার জীবদ্দশায় তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। এ সময় মাত্র কয়েকজন সমালোচকই তার রচনার সঠিক মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন। ১৮৬৯ সালে তার এক ভ্রাতুষ্পুত্র ‘আ মেমোয়ার অফ জেন অস্টিন’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করলে, তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ১৯৪০-এর দশকে বিদ্বজ্জন সমাজে তিনি একজন মহান ইংরেজ সাহিত্যিকরূপে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অস্টেনকে নিয়ে প্রচুর গবেষণামূলক কাজ হয় এবং একটি জেনীয় অনুরাগী সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
সাহিত্যকে চিনতে অস্টিনের সময় লেগেছিল ২২ বছর, আর জেন অস্টিনকে চিনতে সাহিত্য দুনিয়ার সময় লাগেছে প্রায় ছয় দশক; সময়টা অস্টিনের পুরো জীবনের চেয়েও বেশি।

সূত্র : গার্ডিয়ান ও বিবিসি অনলাইন

সূত্র : গার্ডিয়ান ও বিবিসি অনলাইন

বেহেশতের লোভে এ কী পরিণতি!

October 22, 2017

এক নজরে বাংলার শুদ্ধতম কবি জীবনান্দ দাশ

October 22, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *