ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ও আমাদের দায়

টঙ্গীর আন নূর জামে মসজিদের সাবেক খতিব সাহেবের ইন্তেকালের পর একজন নতুন খতিব নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৫ বছর সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সাবেক খতিব সাহেবের পরিবারে কর্মক্ষম কেউ না থাকায় তাঁর পরিবারের বরাবর মাসিক সম্মানী অব্যাহত রাখে মসজিদ কমিটি।
মসজিদসংলগ্ন বাসাটিও মরহুম খতিবের শিশুসন্তান ও স্ত্রীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। বর্তমান বংলাদেশে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। এ দেশের খতিবরা কোনো মসজিদে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সবটুকু ঢেলে দিয়ে ৪০ বছর সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও বার্ধক্যজনিত কারণে অব্যাহতি নিলে ফিরতে হয় একেবারেই খালি হাতে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ২০০৯-১০ অর্থবছরের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে মসজিদের সংখ্যা দুই লাখ ৫০ হাজার ৩৯৯টি (যুগান্তর : ৩ অক্টোবর, ২০১৭) ২০১৭ সালে এসে এ সংখ্যা নিশ্চয়ই তিন লাখের ওপর। প্রতিটি মসজিদে গড়ে তিনজন করে লোক কর্মরত থাকলে এ সেক্টরে কর্মরত আছেন ৯ লক্ষাধিক মানুষ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুসলমানের জীবনের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছেন ইমাম-খতিব। খতিব সাহেব যেমন প্রতি জুমায় সমাজের সমস্যাগুলো তুলে ধরে এর ধর্মীয় সমাধান বর্ণনা করেন, সমাজের মানুষের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে যেমন উদ্বুদ্ধ করেন। মুসলমানদের সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও থাকে ইমামের মমতার হাত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে ইমামদের সামাজিক সম্মান-মর্যাদা থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁরা চরম অবহেলায়।
নেই প্রয়োজন পূরণের মতো সম্মানী, নেই আবাসন। জীবনে বাড়ি-গাড়ি করবেন তো দূরের কথা, কোনো রকম টেনে চালাতে হয় তাঁর সংসার। বার্ধক্য এলে ফিরতে হয় খালি হাতে।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, জমিয়াতুল ফালাহ (চট্টগ্রাম), আন্দরকিল্লাহ শাহি মসজিদ (চট্টগ্রাম) ও রাজশাহীর হেতেম খাঁ—বাংলাদেশের এ চারটি মসজিদের ইমামরা সরকারি স্কেলে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন পান। এর বাইরে রাজধানীর যেসব মসজিদে প্রতি সপ্তাহে শুধু জুমায় লক্ষাধিক টাকা দান সংগৃহীত হয়, সে মসজিদগুলোতেও যা সম্মানী দেওয়া হয় তা রীতিমতো লজ্জাজনক। ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানীর মতো এলাকায় যেখানে দুই রুমের একটি বাসার ভাড়া ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, সেখানে খতিবদের বেতন ৩০ হাজারের মধ্যে। ৪০ হাজার টাকা হাতে গোনা কয়েকটি মসজিদে। অথচ এসব মসজিদে এসি আছে, মসজিদের টয়লেটও টাইলস করা। মসজিদের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকাও আছে। ধানমণ্ডির মতো এলাকায় কোনো মসজিদের খতিব হতে হলে দেশসেরা একজন আলেম হতে হয়। তিনি সবটুকু উৎসর্গ করে দিয়েও ভালো একটা বাসায় থাকবেন, সন্তানদের ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াবেন, মাতা-পিতার জন্য ভালো পোশাক কিনে দেবেন—তা শুধু স্বপ্নই থেকে যায়।

স্কুল-কলেজ বা কোনো প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত খরচের চেয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনটাই খরচের বেশি গুরুত্বপূর্ণ খাত, কিন্তু মসজিদের ক্ষেত্রে এর বিপরীত। বেশির ভাগ মসজিদ কমিটি মসজিদের অবকাঠামোগত খরচকে যতটা গুরুত্ব দেয়, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ব্যাপারে তার সিকি ভাগও দেয় না। মসজিদের বিশাল বিশাল মার্কেট থেকে প্রাপ্ত লাখ লাখ টাকায় উন্নত কার্পেট, লাইটিং, টাইলস, এয়ারকন্ডিশনের মতো আয়েশি খাতগুলোতে অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতা থাকলেও ইমাম-মুয়াজ্জিনের একান্ত প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্মানী দিতে কৃপণতার প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। ভাবখানা এমন যে মসজিদের আয় নিজেদের আয়েশের জন্য; ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য নয়। মসজিদের অন্য সব খরচই প্রয়োজনের, শুধু ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানীটাই অপ্রয়োজনের খাত। আলোকসজ্জা ও এয়ার ফ্রেশে বছরে হাজার হাজার টাকা খরচ করা হলেও মন বাধা দেয় না, কিন্তু বছর শেষে ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী বাড়ানোর প্রসঙ্গ এলেই যেন কমিটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এসি লাগাতে তো সমস্যা নেই, কিন্তু মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানীর উন্নয়নের প্রয়োজনটা বোধ করা উচিত ছিল না? কমিটির ভাবা উচিত যে ইমাম আমাদের, তাঁর প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি তাঁদের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় বই-পুস্তক ও কম্পিউটারের ব্যবস্থাও করে দেওয়া উচিত কমিটির। খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের প্রতি অর্থনৈতিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না তা হাশরের ময়দানে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করতে হবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেকে অবশ্যই তার দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। ’ (বুখারি : ১/৩০৪, মুসলিম : ৩/১৪৫৯)

এর বড় একটা কারণ হলো, ইমামদের জন্য কোনো কার্যকর বেতন কাঠামো না থাকা। ২০০৬ সালের ১৫ নভেম্বর মসজিদ পরিচালনানীতি, কমিটি ও মসজিদের পদবিসহ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তাতে আটটি পদ এবং সেগুলোর বিপরীতে সম্মানী ধরা হয় এমন : ১. খতিব, সম্মানী চুক্তিভিত্তিক। ২. সিনিয়র পেশ ইমাম, বেতন স্কেল ১৩৭৫০-৫৫০-১৯২৫০ টাকা। ৩. পেশ ইমাম, ১১০০০-৪৭৫-১৭৬৫০ টাকা। ৪. ইমাম, ৬৮০০-৩২৫-৯০৭৫-ইবি-৩৬৫-১৩০৯০ টাকা। ৫. প্রধান মুয়াজ্জিন, ৫১০০-২৮০-ইবি-৩০০-১০৩৬০ টাকা। ৬. জুনিয়র মুয়াজ্জিন, ৪১০০-২৫০-৫৮৫০-ইবি-২৭০-৮৮২০ টাকা। ৭. প্রধান খাদেম, ৩১০০-১৭০-৪২৯০-ইবি-১৯০-৬৩৮০ টাকা। ৮. খাদেম, ৩০০০-১৫০-৪০৫০-ইবি-১৭০-৫৯২০ টাকা। (যুগান্তর : ৩ অক্টোবর, ২০১৭) এ বেতনের হার তৎকালীন জাতীয় বেতন স্কেলের (ষষ্ঠ, ২০০৫) বিচারে সিনিয়র ইমামের পঞ্চম গ্রেড, পেশ ইমামের ষষ্ঠ, ইমামের নবম, প্রধান মুয়াজ্জিনের দশম, জুনিয়র মুয়াজ্জিনের ১১তম, প্রধান খাদেমের ১৫তম গ্রেড এবং খাদেমের ১৬তম গ্রেড হুবহু মিলে যায়। অর্থাৎ স্পষ্ট বোঝা যায় যে এ হিসাবই ধরা হয়েছে। বর্তমান স্কেল (২০১৫) হিসাবে সিনিয়র পেশ ইমামের মূল বেতন ৪৩ হাজার টাকা, পেশ ইমামের ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, ইমামের ২২ হাজার টাকা, প্রধান মুয়াজ্জিনের ১৬ হাজার টাকা, জুনিয়র মুয়াজ্জিনের ১২ হাজার ৫০০ টাকা, প্রধান খাদেমের ৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং খাদেমের ৯ হাজার ৩০০ টাকা হওয়ার কথা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য সুবিধা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের এক যুগ অতিবাহিত হতে চললেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

ঢাকার বেশির ভাগ মসজিদে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয়। এমনকি রাজধানীর বাইরের অনেক মসজিদেরও লাখ লাখ টাকা মাসে আয়। যেমন কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদে কিছুদিন আগে তিন মাসে নগদ এক কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা এবং সোনা-রুপা পাওয়া যায়। (কালের কণ্ঠ : ২৮-০৮-২০১৭) প্রতি মাসে প্রায় ৪০ লাখ টাকা শুধু দানবাক্স থেকে আয়। খতিব সাহেবের জন্য চুক্তিভিত্তিক মাসে ৫০ হাজার টাকা সম্মানী ধরলেও খতিব থেকে খাদেম পর্যন্ত এ মসজিদের খরচ হবে এক লাখ ৯৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ এ মসজিদের শুধু দানবাক্সের টাকা দিয়েই (অন্যান্য আয় বাদে) বড় বড় অন্তত ২০টি মসজিদের খতিব ও ইমামদের সরকারি স্কেলে পূর্ণ বেতন দেওয়া যাবে। রাজধানীর যেসব মসজিদ বড় এবং পাঁচ-ছয় লাখ টাকা মাসে আয় হয়, যেসব মসজিদ কমিটি তো দুই লাখ টাকা বেতন দিতে পারে। তবে সব মসজিদে আটজন স্টাফ লাগবে না। বেশির ভাগ মসজিদেই তিন-চারজন যথেষ্ট। রাজধানী ও এর আশপাশের প্রায় সব মসজিদই এ স্কেলে সব স্টাফের বেতন দিয়ে আরো টাকা অতিরিক্ত থাকবে। আন্তরিকতা থাকলে শুধু মার্কেটের চিন্তা না করে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থাও করতে পারে। তাহলে আর বাড়িভাড়া দিতে হবে না। মসজিদের স্বাধীন চলমান অবস্থায় হস্তক্ষেপ না করে ইমামদের সম্মানী প্রদানের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক হলে বেহাত হয়ে যাওয়া এক লাখ একর ওয়াকফ সম্পত্তির আয় এবং বায়তুল মোকাররমসহ রাজধানীর মসজিদগুলোর বিশাল বিশাল মার্কেটের আয় থেকে সেসব মসজিদের খরচ বহন করেও অন্য মসজিদগুলোর ইমামদের বেতন স্কেলের অন্তত অর্ধেকের জোগানে অংশ দিতে পারত।

৪০ বছর কোনো মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বার্ধক্য চলে এলে ইমামদের খালি হাতে বিদায় নিতে হয়। যিনি জীবন-যৌবন কাটালেন, মেধা ও অভিজ্ঞতার পুরোটা ঢেলে দিয়েছেন সমাজের কল্যাণে, তিনিই এখন সমাজের কাছে মূল্যহীন। অথচ এ সময়ে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খরচই বেড়ে যায়। মসজিদ কমিটি তো চাইলে এ মর্মে সবেতনে তাঁকে রাখতে পারে, তিনি অনেকটা অবসরেই থাকবেন। অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়ায় যতটুকু পারেন, মসজিদের দায়িত্ব পালন করবেন। বাকিটুকু পেশ ইমাম বা সহকারী খতিব পূরণ করবেন। অথবা খতিব সাহেবকে ৫০ শতাংশ মাসিক বেতন অব্যাহত রেখে অবসরে দিয়ে দেবে আর আরেকজন সহকারী খতিব নিয়োগ দেবে। খতিব সাহেবের ইন্তেকালের পর সহকারী খতিব পূর্ণ খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। টঙ্গীর আন নূর মসজিদের মতো শহুরে প্রতিটি মসজিদই চাইলে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ইমামের ইন্তেকালের পর তাঁর পরিবারে কর্মক্ষম কেউ না থাকলে তাঁর পরিবারের জন্য সামান্য কিছু অর্থ হলেও বরাদ্দ রাখতে পারে।

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কারি ও খতিব

বাইতুশ শফীক মসজিদ, বোর্ডবাজার, গাজীপুর।

http://www.kalerkantho.com/print-edition/islamic-life/2017/10/20/555626

"বিশ্বনবী" কার লেখা নজরুলের নাকি মোস্তফার?

October 22, 2017

প্রকাশিত হচ্ছে ‘কারাগারের রোজনামচা’র ইংরেজি অনুবাদ

October 22, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *