বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ২

বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের বৈষ্ণব গান

পঞ্চদশ শতকে বৈষ্ণব গদ্য কবিতার বা বাংলা পদাবলির উত্থান হয়েছিল। মিথিলার মহান কবি বিদ্যাপতির কবিতা যদিও তা বাংলা ভাষায় লিখিত হয়নি তথাপি এটি বাংলা সাহিত্যকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে এটি তাকে মধ্য-বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তোলে। চতুর্দশ শতাব্দীতে তিনি ভারতের বিহারের আধুনিক ডারবঙ্গ জেলায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর বৈষ্ণব গান বাংলার জনগণের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল। চণ্ডীদাস ছিলেন প্রথম প্রধান বাঙালি কবি যিনি বৈষ্ণব গান লিখেছিলেন , যিনি আধুনিক দিনের বীরভূম জেলার (বা অন্য মতামত অনুযায়ী, বাঁকুড়া জেলার) পঞ্চম শতাব্দীতে পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী ছিলেন । চণ্ডীদাস তাঁর মানবতার ঘোষণার জন্য সুপরিচিত- “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ..”)।
মালাধর বসু এবং কৃত্তিবাস ওঝা

দুটি বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ ভাগবত পুরাণ এবং রামায়ণ মধ্য বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল । মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণ বিজয় (শ্রীকৃষ্ণ বিজয়, লর্ড কৃষ্ণের বিজয়), যা মূলত ভাগবত পুরাণের দশম এবং একাদশ পাঠের অনুবাদ, এটি একটি পূর্বতন বাংলা কাহিনী যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা যায়। পঞ্চদশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার অন্তর্গত পঞ্চিমবঙ্গে মালাধর বসু সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেছিলেন। ১৪৭৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে রচিত শ্রীকৃষ্ণ বিজয় ছিল কৃষ্ণের কিংবদন্তীর প্রাচীনতম বাংলা বণর্নামূলক কবিতা।

রামায়ণ শ্রী রাম পাঁচালী শিরোনামের অধীনে যা কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামেও পরিচিত কৃত্তিবাস ওঝা দ্বারা অনুবাদিত হয়েছিল, যিনি আজাদ নদীয়া জেলার অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী ছিলেন। তিনিও মালাধর বসুর মতো পঞ্চদশ শতকেরও বেশি সময় ধরে অগ্রসর হয়েছিলেন।
চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব সাহিত্য

চৈতন্যোত্তর বা বৈষ্ণব পরবর্তী সাহিত্য চৈতন্য মহাপ্রভুর সময় পরবর্তীকালের সাহিত্যের সূচনা করেছিল । এর মধ্যে রয়েছে, চৈতন্যের জীবনের উপর ভিত্তি করে এবং পরে বৈষ্ণব পদাবলী গৌড়ীয় বৈষ্ণব পণ্ডিত বা কবিদের দ্বারা রচিত হয়েছিল। বৈষ্ণব পরবর্তী সাহিত্যের প্রধান পদকর্তা ছিলেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ, বৃন্দাবন দাস ঠাকুর, জয়ানন্দ, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস প্রমুখ।

আধুনিক যুগ

মূলত বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগ নিয়ে মত পার্থক্য থাকলেও,মোটামুটি ভাবে ১৭৬০ খ্রীষ্টাব্দ ভারত চন্দ্রের মৃত্যুর পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূত্রপাত বলে নানা সমালোচক মতপ্রকাশ করেছেন। কালের দিক থেকে আধুনিক যুগকে কয়েক টি ধাপে ভাগ করা যায়- ১৭৬০-১৭৯৯খ্রিঃ(আধুনিক যুগের প্রথম পর্ব) ১৮০০-১৮৫৮খ্রিঃ(আধুনিক যুগের দ্বিতীয় পর্ব) ১৮৫৯-১৯০০খ্রিঃ(আধুনিক যুগের তৃতীয় পর্ব) ১৯০১-১৯৪৭খ্রিঃ(আধুনিক যুগের চতুর্থ পর্ব) ১৯৪৮-২০০০খ্রিঃ(আধুনিক যুগের পঞ্চম পর্ব) ২০০১খ্রিঃ- বর্তমানকাল(আধুনিক যুগের ষষ্ঠ পর্ব)
প্রাক-রবীন্দ্র যুগ
রবীন্দ্র যুগ
রবীন্দ্রোত্তর যুগ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য
পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য
পূর্ব পাকিস্তান-বাংলাদেশের সাহিত্য
সাহিত্যধারা
চর্যাপদ
মূল নিবন্ধ: চর্যাপদ
চর্যাপদ পুঁথির একটি পৃষ্ঠা

চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্য তথা সাহিত্য নিদর্শন। নব্য ভারতীয় আর্যভাষারও প্রাচীনতম রচনা এটি।[৭] খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এই গীতিপদাবলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ়ার্থ সাংকেতিক রূপবন্ধে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যেই তাঁরা পদগুলি রচনা করেছিলেন। বাংলা সাধন সংগীতের শাখাটির সূত্রপাতও এই চর্যাপদ থেকেই। এই বিবেচনায় এটি ধর্মগ্রন্থ স্থানীয় রচনা। একই সঙ্গে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্রাবলি এই পদগুলিতে উজ্জ্বল। এর সাহিত্যগুণ আজও চিত্তাকর্ষক। ১৯০৭ খ্রীস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকে চর্যার একটি খণ্ডিত পুঁথি উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চর্যাপদের সঙ্গে বাংলা ভাষার অনস্বীকার্য যোগসূত্র বৈজ্ঞানিক যুক্তিসহ প্রতিষ্ঠিত করেন। চর্যার প্রধান কবিগণ হলেন লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, শবরপাদ প্রমুখ।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
মূল নিবন্ধ: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বড়ুচণ্ডীদাস নামক জনৈক মধ্যযুগীয় কবি রচিত রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কথা বিষয়ক একটি আখ্যানকাব্য। [৮] ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রাম থেকে এই কাব্যের একটি পুথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে তাঁরই সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে পুথিটি প্রকাশিত হয়।[৯] যদিও কারও কারও মতে মূল গ্রন্থটির নাম ছিল শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। কৃষ্ণের জন্ম, বৃন্দাবনে রাধার সঙ্গে তাঁর প্রণয় এবং অন্তে বৃন্দাবন ও রাধা উভয়কে ত্যাগ করে কৃষ্ণের চিরতরে মথুরায় অভিপ্রয়াণ – এই হল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মূল উপজীব্য। আখ্যানভাগ মোট ১৩ টি খণ্ডে বিভক্ত। পুথিটি খণ্ডিত বলে কাব্যরচনার তারিখ জানা যায় না। তবে কাব্যটি আখ্যানধর্মী ও সংলাপের আকারে রচিত বলে প্রাচীন বাংলা নাটকের একটি আভাস মেলে এই কাব্যে। গ্রন্থটি স্থানে স্থানে আদিরসে জারিত ও গ্রাম্য অশ্লীলতাদোষে দুষ্ট হলেও আখ্যানভাগের বর্ণনানৈপূণ্য ও চরিত্রচিত্রণে মুন্সিয়ানা আধুনিক পাঠকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চর্যাপদের পর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রাচীনতম আবিষ্কৃত নিদর্শন। বাংলা ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে এর গুরুত্ব তাই অপরিসীম। অপরদিকে এটিই প্রথম বাংলায় রচিত কৃষ্ণকথা বিষয়ক কাব্য। মনে করা হয়, এই গ্রন্থের পথ ধরেই বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির পথ সুগম হয়।

বইমেলায় আলেম লেখকদের বই

October 22, 2017

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‍্যাগিং নামের নোংরামী বন্ধ হোক

October 22, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *