পাকিস্তান চালাচ্ছে কে?


পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। ছবি: এএফপি

চলতি মাসের ২ তারিখের ঘটনা। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে চলা দুর্নীতির মামলায় আদালতে শুনানি চলছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবাল শুনানির সময় আদালতে ঢুকতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ তাঁর পথরোধ করে দাঁড়ান আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আদালতে ঢুকতে দেবেন না তাঁরা। অথচ এই মন্ত্রীর অধীনেই রয়েছে দেশের সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী!

এ ঘটনাতেই বোঝা যায়, কেমন চলছে পাকিস্তানের সরকারব্যবস্থা। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাধা দেন তাঁরই অধীনে থাকা বাহিনীর সদস্যরা, সেখানে আদতে কে ক্ষমতায় আছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হতেই পারে। তবে কি দেশটির সামরিক বাহিনীই এখন সর্বময় প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী? যা কিনা আমলে নেয় না সরকারের কোনো মন্ত্রীকেও!

পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা ক্রমে বেড়েই চলেছে। ওপরের ঘটনায় এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবাল বলেছেন, ‘আমি পুতুল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারব না। এখানে অবশ্যই একক শাসন থাকতে হবে, একটি সরকার থাকতে হবে।’

তবে সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেছেন, ওই সেনারা নওয়াজ শরিফের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যেই আধা সামরিক বাহিনীর ওই সদস্যদের মোতায়েন করার আদেশ কে দিয়েছিলেন, তা তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, একটি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই জানেন না তাঁর অধীনে থাকা বাহিনীর সদস্যদের কে মোতায়েন করেছিলেন!


পাকিস্তানের সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া। ছবি: এএফপি

অন্যদিকে, নওয়াজ শরিফের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টি অনুমোদন করে একটি বিল পাস করেছে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী পদে নওয়াজকে অযোগ্য ঘোষণা করে রায় দেন আদালত। এর পরপরই পদত্যাগ করেন তিনি। ওই সময় সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ দেওয়া ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটির দুজন ছিলেন সামরিক বাহিনীর সদস্য। ওই ঘটনার পর দেশটির পার্লামেন্টে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত ‘বেশ নাটকীয়’ বলে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকেরা।

ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে পার্লামেন্টের নেওয়া সিদ্ধান্ত সামরিক বাহিনী ও রাজনীতিবিদদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের কথা ভেবে স্বাভাবিকভাবেই সামরিক বাহিনী তার নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে চাইছে। কারণ, গত ৭০ বছরেরও বেশি সময় পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেছে সামরিক বাহিনী। ক্ষমতায় যখন ছিল না, তখনো সেনাবাহিনী বাইরে থেকে শাসন কাঠামোয় প্রভাব বিস্তার করে গেছে। সেই নিয়ন্ত্রণ যে এত সহজে তারা ছাড়তে চাইবে না, তা তো অনুমেয়।

বেসামরিক পক্ষ ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার এই দ্বৈরথে পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্র আরও দুর্বল হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল তালাত মাসুদ বলেন, ‘উত্তেজনা ক্রমে বাড়ছে। কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে করে গণতন্ত্র আরও দুর্বল হচ্ছে।’

ব্লুমবার্গ বলছে, নতুন করে সৃষ্ট এই উত্তেজনায় পাকিস্তানের অর্থনীতির চাকার গতিও ধীর হচ্ছে। গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক গতি দেখা গিয়েছিল। গত ৩০ জুন পর্যন্ত চলা অর্থবছরে ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত হারে এগিয়েছে পাকিস্তানের অর্থনীতি। আর গত কয়েক মাসেই ঘাটতিতে পড়তে হয়েছে সরকারকে। অবস্থা এমন পর্যায়েই পৌঁছেছে যে কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণ থেকে বেইল আউট চাইতে হতে পারে।

চলতি বছরে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে মূলধনের সূচক পড়ে গেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। কাতারের পর পাকিস্তানেই এ খাতে সবচেয়ে অবনতি দেখা গেছে। দেশটির মুদ্রা রুপির অবমূল্যায়ন করার চাপ আছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর। কারণ, এ বছর এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মুদ্রার মান বাড়লেও পাকিস্তানের রুপির কমেছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বাণিজ্যে জড়ানোর ইতিহাস তো পুরোনো। সেই বিশাল সাম্রাজ্য খাদ্য ও সিমেন্ট উৎপাদন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজেও বিস্তার লাভ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেছেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। সম্প্রতি আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তিনি এ মন্তব্য করেছেন। এর পরপরই মুখ খোলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। গত ৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। দীর্ঘ মেয়াদে ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পরিস্থিতি ঠিক থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’

তবে কি পাকিস্তানে ফের সামরিক আইন জারি হতে চলেছে? দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আসিফ গফুর বলেছেন, সামরিক আইন জারি করার কোনো সম্ভাবনাই নেই। গত ৫ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘এ নিয়ে কথাই বলাই উচিত নয়।’ তিনি আরও বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেনাপ্রধান কামার জাভেদ বাজওয়া ইরান সফরে যাবেন। সেখানে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। এ ছাড়া তিনি কাবুলে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সঙ্গেও আলোচনায় অংশ নেবেন।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেইন বলেছেন, বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে নিরাপত্তার মতো ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার এখতিয়ার কি সেনাপ্রধানের আছে? এই দায়িত্ব প্রচলিতভাবে পড়ে বেসামরিক সরকার বা আমলাতন্ত্রের ওপর। বেসামরিক পক্ষের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্কে যে চিড় ধরেছে, এ ঘটনা তারই পরিচায়ক। তাঁর মতে, ‘আফগান নীতি সরাসরি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সব সভায় নেতৃত্ব দিচ্ছে সেনাবাহিনী।’

বেসামরিক ও সামরিক—এই দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে গত জানুয়ারি মাস থেকে। ওই সময় প্রশ্নবিদ্ধ সামরিক আদালতের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে বাধা দিয়েছিলেন আইনপ্রণেতারা। মূলত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ-বিষয়ক শুনানির ক্ষেত্রে এই বাড়তি ক্ষমতা চেয়েছিল সেনাবাহিনী।

গত জুলাই মাসে নওয়াজ শরিফের অযোগ্যতা ঘোষিত হওয়ার ফলে পাকিস্তানে কোনো প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণ মেয়াদে না থাকার ঐতিহ্য বজায় থাকে। অন্য সব প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নওয়াজ একটি জায়গায় এগিয়ে ছিলেন। সেটি হলো সেনাবাহিনী ও রাজনীতিবিদদের দ্বৈরথে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় উল্টো তাঁকেই সরিয়ে দিয়েছিল সেনাবাহিনী। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, নওয়াজের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক একটু বেশিই তিতকুটে।

নওয়াজ শরিফ, তাঁর তিন ছেলেমেয়ে ও অর্থমন্ত্রী ইসহাক দারের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির মামলা চলছে। গত মাসেই তাঁরা লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন। এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মামলা মোকাবিলার জন্য নির্বাসন থেকে হঠাৎ তাদের দেশে ফিরে আসায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। নওয়াজের ছোট ভাই ও পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর শেহবাজ শরিফ গত ৩ অক্টোবর টুইটারে লিখেছেন, ‘পুরো দল নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বে এককাট্টা রয়েছে।’ অর্থাৎ পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ এবার কোমর বেঁধেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছে। আগামী নির্বাচনের আগে এ অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার নয়। তাহলে শুধু অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়, পাকিস্তানের আরও নানা ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে সংকট।

ভয়াবহ যানজটের ১০ শহর

October 24, 2017

পুতিনের বিরুদ্ধে লড়বেন প্লেবয়ের প্রচ্ছদ কন্যা!

October 24, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *