বই নিয়ে চার বিখ্যাত ব্যক্তির মজার ঘটনা

আবরার রাকিব : বই নিয়ে অনেকের সাথে অনেক মজার ঘটনা ঘটে থাকে, খুব স্বাভাবিক। এমন ঘটনা আমার সঙ্গেও হয়েছে। ঘটনাটি শেয়ার করতে চাই :

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়া আমার একটা রোগ বলা চলে। আবুল মনসুর আহমদের সুপরিচিত ‘আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর’ মোটা বইটি আমি লাইব্রেরি থেকে ইস্যু করে পড়তে শুরু করি। গত দুই মাস স্বাস্থ্যবান এই বইটি আমি একটানা প্রতিদিন লাইব্রেরি থেকে ইস্যু করে নিয়েছি।

একদিন দেখি, আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই লাইব্রেরিয়ান আমার জন্য বই হাতে ডেস্কে হাজির, যদিও আমি বইয়ের কোন স্লিপ লাইব্রেরীয়ানকে দেইনি । অবস্থাটা এমন যে, আমি লাইব্রেরিতে আসলে ওই বইটিই যে নেব, লাইব্রেরিয়ানের সেটা মুখস্ত।

এর কয়েকদিন পর লাইব্রেরিয়ান আমাকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন- ‘আর কয়দিন আপনি এই বই ইস্যু করবেন, আমারে বলেনতো দেখি।’

তো আজকের এ লেখায় হুমায়ূন আহমেদ, আবুল মনসুর আহমদ, জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক এবং ড. ইউনুস এই চারজন ‘বিশেষভাবে খ্যাত’ ব্যাক্তির সঙ্গে বই নিয়ে ঘটেছে এমন মজার ঘটনা লিখার চেষ্টা করেছি।

⊙ হুমায়ূন আহমেদ (প্রথম বিখ্যাত ব্যাক্তির ঘটনা )

ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে হুমায়ূন আহমেদ তখন আমেরিকায়। অসুস্থতার কথা ভুলে থাকার জন্য নিজেকে ব্যাস্ত রাখছেন। ওই উদ্দেশ্যে প্রচুর বই জোগাড় করলেন।

আমেরিকায় যে বাড়িতে উঠেছিলেন তার পাশেই একটি পাবলিক লাইব্রেরি ছিল, তিনি ওই লাইব্রেরির মেম্বারও হলেন। মেম্বার হয়ে হুমায়ূন আহমেদ মোটামুটি অবাক হলেন। তিনি দেখলেন বিদেশী লেখকদের বইয়ের থাকে তার নিজের লেখা অনেক বই!

হুমায়ূন আহমেদ কৌতুক করে লাইব্রেরিয়ানকে বললেন- আরে, এ বইগুলোতো আমার প্রিয় লেখকের বই!

লাইব্রেরিয়ান বললেন- তুমি যেহেতু মেম্বার হয়েছো, চাইলেই এই লেখকের একটি বই নিয়ে পড়তে পার। হুমায়ূন আহমদ তখন তার নিজের লেখা হিমুর একটি বই ইস্যু করে নিয়ে এলেন।

⊙ আবুল মনসুর ( দ্বিতীয় বিখ্যাত ব্যাক্তির ঘটনা )

ভারত পাকিস্তান যখন আলাদা হল, আবুল মনসুর আহমদ তখন কলকাতায়। চৌরংগীর মোড়ে বইয়ের দোকানে ঘুরে ফিরে বই হাতড়ানোই ছিলো তার কাজ। এমনিতে নানান কিসিমের বইয়ে ভরা বুক স্টলে বই দেখে বেড়ানো তার চিরকালের অভ্যাস। তখনকার দাংগা হাংগামায় অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চৌরংগীর নতুন বই পুস্তকের দোকানগুলোতে আবুল মনসুর যাওয়া আসা করতেন। বই কেনার চেয়ে পরখ করতেন বেশি। এতে অবশ্য দোকানদাররা রাগ করতেন না।

‘উকিল ছাব’ বা ‘এডিটর ছাব’ পরিচয়ে দীর্ঘ বারোটা বছর কালা শেরওয়ানী পরা আবুল মনসুরকে তারা খুব ভালো করেই চিনতেন। আসল নাম না জানলেও এই লোকটাকে বই পুস্তকের দোকানদাররা যথেষ্ট খাতির করতেন। যে কোন বই দেখতে চাইলে দোকানদাররা নামিয়ে দেখাতেন, যদিও জানতেন শেষ পর্যন্ত বইটা ‘উকিল ছাব’ কিনবেন না। তবে মাঝে মাঝে কিনতেন। শ টাকার বই ঘেটে শেষ পর্যন্ত আট আনা- এক টাকার একটা বই অবশ্য কিনতেন।

আবুল মনসুর আহমদের এই অভ্যাসের সাথে দোকানদাররা পরিচিত হয়ে উঠলো। ‘উকিল ছাব’ আসছেন দেখলেই দোকানদাররা মুচকি হেসে এ ওর দিকে তাকাতাকি করতো। আবুল মনসুরও সেটা বুঝতেন, টিটকারির ব্যপারটা গায়ে না মেখে তিনিও তাদের সাথে মুচকি হাসতেন।

আবুল মনসুরকে দেখে দোকানদাররা যদিও মুখে মুখে বলতো- ‘আইএ ছাব, আইএ ছাব’। অাবুল মনসুরের ধারণা দোকানদাররা মুখে মুখে এমনটা বললেও মনে মনে ঠিকই বলতো- ‘দু চারঠো দেখকে চলে যাইয়ে ছাব’।

⊙ জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ( তৃতীয় বিখ্যাত ব্যাক্তির ঘটনা )

গবেষণার কাজে আহমদ ছফা জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সহযোগীতা বা পরামর্শ নিতে তার বাসায় আসা যাওয়া করতেন। রাজ্জাক স্যারের বাসায় বুক সেল্ফে মূল্যবান সব বইয়ের কালেকশন ছিল। ছফা একদিন সেই বুক সেল্ফে বই ঘাটছিলেন।

রাজ্জাক স্যার বললেন- ‘আপনে এখন কী পড়াশোনা করবার লাগছেন ?

ছফা বললেন- কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা। রাজ্জাক স্যার তখন যেই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটি দিলেন সেটি হল- ‘মাই বয় গো এন্ড সোক’ । এর ব্যাখ্যাও রাজ্জাক স্যার দিলেন- ‘মূলত পছন্দের টপিকের কাছাকাছি বই পেলেই পড়ে ফেলতে হবে। তারপর পড়তে পড়তে একটা সময় বুঝতে পারবেন আপনার আর কি কি পড়া উচিত।’

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে পিএইচডি করার জন্য রাজ্জাক স্যার প্রফেসর হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে ছিলেন। গবেষণার সময় হ্যারল্ড লাস্কি রাজ্জাক স্যারকে এই একই উপদেশ দিয়েছিলেন।

রাজ্জাক স্যার গবেষণার ফাঁকে সময় পেলেই লন্ডনের রাস্তায় বই খুঁজতে বের হতেন। মূল্যবান বই খুঁজে পেলে সেগুলো কিনে ফেলতেন। হ্যারল্ড লাস্কি মারা গেলে রাজ্জাক স্যার আর গবেষণা সম্পন্ন করেন নি। তার ধারণা ছিল এই গবেষণা পেপার হ্যারল্ড লাস্কি ছাড়া অন্য কেউ মূল্যায়ণ করতে পারবেন না। পরে ডক্টরেট ডিগ্রি না নিয়েই তিনি লন্ডন ঘুরে ঘুরে কেনা সমস্ত বই জাহাজে তুলে বাংলাদেশে চলে আসেন।

বই পুস্তক রাজ্জাক স্যারকে কিভাবে ঘিরে থাকতো তার খুব সুন্দর বর্ণনা আহমদ ছফা দিয়েছেন। সর্বপ্রথম যেদিন আহমদ ছফা রাজ্জাক স্যারের বাসায় যান সেদিনের কথা আহমদ ছফা লিখেছেন-

‘বেশ কিছু অপেক্ষা করার পরও কাউকে না পেয়ে আমি ভয়ে ভয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলাম।

ঘরটির পরিসর বিশেষ বড় নয়। চারদিকে বইপুস্তকে ঠাসা। ঘরটিতে একটিমাত্র খাট, না, খাট বলা ঠিক হবে না, চৌকি। সামনে একটি ছোট টেবিল। চৌকিটির আবার একটি পায়া নেই। পায়ার জায়গায় বইয়ের উপর বই রেখে ভরাট করা হয়েছে। চমৎকার ব্যবস্থা। পুরোনো বই পত্রের আলাদা একটা গন্ধ আছে। আমি সেই বইপত্রের গঞ্জালে হতবিহ্বল হয়ে দাড়িয়ে আছি।

এই ঘরে যে কোন মানুষ আছে প্রথমে খেয়ালই করিনি। হঠাৎ দেখলাম চৌকির উপর একটা মানুষ ঘুমিয়ে আছে। একটা পাতলা কাঁথা সে মানুষটার নাক অবধি টেনে দেয়া। চোখ দুটি বোজা। মাথার চুল কাঁচা অনুমানে বুঝে নিলাম, ইনিই প্রফেসর রাজ্জাক।’

⊙ ড. ইউনূস ( চতুর্থ বিখ্যাত ব্যাক্তির ঘটনা )

চট্টগ্রামের বক্সিরহাটে ড. ইউনূসের বাবার স্বর্ণের দোকান। দোকানের উপরের তলায় বাসা। ড. ইউনূসের দাদাও এই পেশাতেই ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সংসারে অভাব চলছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খবর নেওয়ার সাধ্য ড. ইউনূসের বাবার ছিল না। তাই পড়ার খোড়াক জোগাতে নিজস্ব কৌশল উদ্ভাবন করতে হত তাকে। বই ধার থেকে শুরু করে বই চুরি পর্যন্ত করতে হয়েছে তাকে পড়ার খোড়াক জোগাড়ের জন্য।

তখনকার আমলে কলকাতা থেকে প্রকাশিত শুকতারা পত্রিকাটি ছিল শিশুদের সবচেয়ে পছন্দের। পত্রিকায় নিয়মিত একটি প্রতিযোগীতা হতো, বিজয়ীদের নাম ঠিকানা পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করা হত। নিয়ম ছিল এই প্রতিযোগীতায় বিজয়ী হলে ফ্রি পত্রিকার গ্রাহক হওয়া যায়।

ড. ইউনূস প্রতিযোগীতায় অংশ নিতেন না যার ফলে বিজয়ী হয়ে ফ্রি পত্রিকাও পেতেন না। তবে তিনি ফ্রি পত্রিকা পাওয়ার কৌশল অবলম্বন করলেন। বিজয়ী প্রতিযোগীদের যেই নাম প্রকাশিত হতো তার মধ্যে একজনের নাম বেছে নিয়ে একদিন সম্পাদককে লিখলেন-

‘মাননীয় সম্পাদক,
আমি অমুক, একজন বিজয়ী প্রতিযোগী, আমাদের বাসা বদলানো হয়েছে, তাই আমাদের ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এখন থেকে আমার নির্ধারিত ফ্রি পত্রিকার কপিটি ডাকযোগে বক্সিরহাটে পাঠালে বাধিত হব। বাড়ির নাম্বার হলো….’

ড. ইউনুস এরপর থেকে নিয়মিত ফ্রি পত্রিকার কপি পেতেন। এবং প্রিয় শিশুতোষ পত্রিকা পাঠের মাধ্যমে জ্ঞান তৃষ্ণা মিটাতেন ।

⊙ চারজন বিখ্যাত ব্যক্তিদের মজার ঘটনা তো শেষ হলো । আমার সাথে ঘটেছে এমন একটা ঘটনা বলেই শেষ করছি-

কয়েক মাস আগের কথা। নীলক্ষেত ধরে হাটছি, হলে ফিরব। বইয়ের দোকানের সামনে রিডিং ক্লাবের শাকিল ভাইয়ার সাথে দেখা, হাতে পাঁচ-ছয়টা বই, আরো বই দেখছেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- বই কিনতে আসছো ?

আমি বললাম, সব ভালো ভালো বইতো আপনি নিয়েই ফেললেন, আমি আর কি কিনব ?

উনি এবার একটু রসিক, আমার এহেন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বললেন-
‘শোন, অন্যের বই সর্বদা ভালো,
আর অন্যের বউ সবসময় *সুন্দর’

* শাকিল ভাই ‘অন্যের বউ’ বলার পর ‘সুন্দর’ শব্দটা ব্যবহার করেন নাই, কী ব্যবহার করেছেন তা বুঝতে পারা আপনার বিচক্ষণতার উপর নির্ভর করছে…

দ্রঃ এই লেখায় চারটি বইয়ের সহযোগীতা নেওয়া হয়েছে। আশা করি লেখাটা পাঠ করলে তৃপ্তি পাবেন। বইয়ের প্রতি নেশাটাও বৃদ্ধি পাবে আমাদের।

সহায়ক গ্রন্থসমূহঃ
১. নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ
২.আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর
৩. যদ্যপি আমার গুরু
৪. গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ?

October 24, 2017

জাবি ক্যাম্পাসে পেয়ারার সঙ্গে ফেনসিডিল, আটক ১

October 24, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *