টিপু সুলতানের জন্মদিনকে ঘিরে ভারতে নতুন বিতর্ক

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে মহীশুরে রাজত্ব করেছিলেন যে টিপু সুলতান – তিনি একজন নায়ক না কি খলনায়ক, তা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

মহীশুর এখন যে কর্ণাটক রাজ্যের ভেতর, সেখানে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস মহা ধূমধামে টিপু সুলতানের জন্মদিন উদযাপন করতে চলেছে আগামী মাসে – কিন্তু বিরোধী বিজেপি তার তুমুল বিরোধিতা করছে।

বিজেপির অভিযোগ, রাজ্যে আসন্ন ভোটের কথা মাথায় রেখে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভোট টানতেই কংগ্রেস টিপু সুলতানের মতো একজন ‘খলনায়কে’র জন্মদিন পালন করা হচ্ছে।

কর্ণাটকের বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী অনন্ত কুমার হেগড়ে তো টিপু সুলতানকে একজন খুনি ও ‘কুখ্যাত ধর্ষণকারী’ বলতেও দ্বিধা করেননি। টিপু সুলতান গণহারে অসংখ্য নারীকে ধর্ষণ করেছিলেন বলেও তিনি দাবি করেছেন।

টিপু সুলতানের জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে স্থানীয় এমপি হিসেবে তার নাম থাকলে তিনি গিয়ে অনুষ্ঠানে বিরাট গণ্ডগোল বাঁধাবেন বলেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমকি দিয়ে রেখেছেন।

কিন্তু এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে বিজেপির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জগদীশ শেট্টার ও দলের অন্য নেতাদের পাঁচ বছরের পুরনো একটি ছবি – যেখানে তাদের টিপু সুলতানের মতো পাগড়ি পরে ও হাতে অবিকল তার ভঙ্গিতে তলোয়ার ধরে মঞ্চে ছবি তোলাতে দেখা যাচ্ছে।

যে দল টিপু সুলতানকে একজন দেশবিরোধী অত্যাচারী শাসক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, সেই বিজেপিকে এই ছবি বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

“তাহলে বিজেপি নেতারা কি পাঁচ বছর আগে জানতেন না টিপু সুলতান একজন নিষ্ঠুর অত্যাচারী?”, তাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন কর্ণাটক কংগ্রেসের সভাপতি দীনেশ গুন্ডু রাও।

কিন্তু টিপু সুলতানের মতো একজন ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে কেন ভারতে নতুন করে এই বিতর্ক? তার পক্ষের ও বিপক্ষের শিবির টিপু-কে নিয়ে কী যুক্তি দিচ্ছেন?

আসলে টিপু সুলতানের জন্মদিন পালন করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বাকবিতণ্ডা চলছে কর্ণাটক ও তার পাশের রাজ্য তামিলনাড়ুতে। টিপুর পক্ষে কথা বলে এর আগে হুঁশিয়ারিও শুনতে হয়েছিল বিশিষ্ট কর্ণাটকি অভিনেতা ও নাট্যকার গিরিশ কারনাডকেও।

কর্ণাটকের বর্তমান কংগ্রেস সরকার অবশ্য আগাগোড়াই বলে আসছে টিপু সুলতানের জন্মজয়ন্তী পালনে অন্যায় কিছু নেই। কর্ণাটকের মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা দীনেশ গুন্ডুরাওয়ের কথায়, ”রাজ্যের মহান সন্তান টিপু সুলতানের জন্য আমরা সবাই গর্বিত।”

”তিনি সুশাসক ছিলেন, সাম্প্রদায়িক ছিলেন না মোটেই – আর এই বীর যোদ্ধা ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়েও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কর্ণাটকে রেশমচাষ থেকে অনেক সংস্কার শুরু হয়েছিল তার হাতেই। আর যে সব হত্যাকাণ্ডের কথা বলছেন সেরকম বিতর্ক তো গুজরাটে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও আছে,” বলছেন মি গুন্ডুরাও।

টিপু সুলতান যে বিতর্কিত, ঐতিহাসিকরাও অবশ্য তা অস্বীকার করেন না। দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক শৌভিক মুখোপাধ্যায় অবশ্য মনে করেন এই বিতর্কের বীজ নিহিত আছে টিপু-কে নিয়ে সে আমলের লেখালেখির ভেতরে।

তিনি জানাচ্ছেন, ”টিপু-কে নিয়ে যাবতীয় গবেষণার মূল উৎস হল সে আমলে ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তাদের রিপোর্ট। এখন শত্রুর সম্বন্ধে তারা যে খুব একটা ভাল কথা বলবেন না তা তো বলাই বাহুল্য।”

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় আরও বলছেন, ”টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যেমন হিন্দু-নিধন বা মন্দির ধ্বংস করার অভিযোগ আছে তেমনি মারাঠাদের হাতে প্রায় ধ্বংস হতে যাওয়া শঙ্করাচার্যর প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্গেরী মঠকে তিনিই কিন্তু আবার পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন।”

কিন্তু বিজেপি মনে করছে টিপুর হাতে যত হিন্দু বা কুর্গ এলাকায় যত খ্রিষ্টান মারা গেছেন তারপর তাকে মহান শাসক হিসেবে তুলে ধরাটাই চরম অন্যায়। বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর তাই প্রশ্ন ”আজ মৃত্যুর ২০০ বছরেরও পর কেন আচমকা কংগ্রেসের টিপুকে মনে পড়ল?”

”হিন্দুদের খতম করায় তিনি নিজের সেনাপতিকে প্রশংসা করে চিঠি লিখেছিলেন। আর ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াইতেও তিনি তো আর এক ঔপনিবেশিক শক্তি ফরাসিদের হয়ে দালালি করেছেন। আজ পাকিস্তান তাদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের নাম রেখেছে টিপু-র নামে, সেই সুলতানকে কীভাবে আমরা সম্মান জানাতে পারি?”, বলছেন মি. স্বামী।

১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপতনমের যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন টিপু সুলতান। তার মৃত্যুর ২১৮ বছর পর আজ তাকে দেশ কী চোখে দেখবে, তা নিয়ে পরিষ্কার দুরকম মত দেখা যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি।

ইরানকে একঘরে করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

October 25, 2017

ইলিশের মেলা পদ্মা নদী

October 25, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *