আমি মক্কা-মদীনাকে খুব ভালবাসি; আপনি?

বিনয়ী। সদালাপী। স্পষ্টবাদী। কোন হাক ডাক নেই। একদম সাদা-মাটা মানুষ। রাগ নেই। সদায় হাস্যজ্জল। মিষ্টিভাষী। কথা বলেন অত্যন্ত মার্জিতভাবে। মেপে মেপে। তিন দিন ধারাবাহিক বিভিন্ন ভাবে কথা বলে জানা গেল তিনি আওলাদে রাসূল (সা:)। হযরত আলী ইবনে হোসাইন (রা:) বংশধর। টগবগে যুবক। দুই বছর আগে মদিনা তায়্যেবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সমাপ্ত করে যোগদেন মক্কার বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘‘আব্দুল সামাদ আল-কোরাইশী’’ নামে পারফিউম কোম্পানীতে।

আল-কোরাইশ-আল শরীফ বংশে তার জন্ম। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিতে রয়েছে তার যথেষ্ট দখল। আরবী ভাষার পাশাপাশি ফার্সি ও ইংরেজীতে যথেষ্ট পারদর্শি। অনর্গল কথা বলেন ইংরেজী ভাষায়।

তার নাম মাহমুদ আল শরীফ আল কোরাইশী-আল সাউদ। তবে তিনি মাহমুদ আল শরীফ নামেই পরিচিত। তার সঙ্গে পাঁচ দিনের কথোপ-কথন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরী করেছেন আজহার মাহমুদ।

ক্যাম্পাসলাইভ: কেমন আছেন মাহমুদ আল শরীফ। মদীনায় কিভাবে বেড়ে ওঠেছেন।
মাহমুদ আল শরীফ: আলহামদুলিল্লাহ। আমি খুবই ভাল আছি। শুকরিয়া সেই সত্ত্বার যিনি মদীনার পবিত্র নগরীতে আমাকে পাঠিয়েছেন। পৃথিবীর অন্য যে কোন স্থানের তুলনায় সর্বোচ্চ মর্যাদাকর নগরীতে আমার জন্ম। আমি নবী আহমদ-মুহাম্মদ মোস্তফার নগরী মদীনা আল মোনাওওয়ারাতে জন্মগ্রহণ করতে পেরে নিজেকে মর্যাদাকর ও গর্বিত মনে করছি।

মাহমুদ আল শরীফ বলেন, আমার পতিা একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন। তার নাম সাউদ আল-শরীফ। মা হুদা আল শরীফ। তার নানা ও দাদা একই বংশের লোক।

মুহাম্মদ আল শরীফ মদীনাতেই বেড়ে উঠেছেন। স্কুল বা মাদ্রাসায় পড়েছেন মদীনায়। মাধ্যমিক ও কলেজ সমাপ্ত করেন।

ক্যাম্পাসলাইভ: কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। কি আপানার টার্গেট।
মাহমুদ আল শরীফ: আমি মক্কা ও মদীনার অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তায়্যেবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মা-বাবার আগ্রহ ও আমার প্রবল ইচ্ছায় বিবিএতে ভর্তির সুযোগ পাই। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে বিবিএ সমাপ্ত করি। তখন থেকেই বড় ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন আমার। এসব চিন্তা করেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য চাকুরীতে যোগ দেই।

৩ বছর যাবত অত্যন্ত সম্মানের সাথেই চাকুরী করে যাচ্ছি। পরিচিত হচ্ছি দেশ-বিদেশের নানান ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। শিখছি নানান কলা-কৌশল। মাহমুদ বলেন, আল্লাহ তায়ালা ব্যবসাকে করেছেন হালাল ও সুদকে করেছেন হারাম। এই মর্মবাণী সদায় আমাকে প্রেরণা দেয়। হর-হামেশাই দিচ্ছে মনোবল, সাহস, আর সততার দীপ-শিখা। আমি সব সময় সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তার অনুকম্পা আর তার আদেশে নির্দেশের প্রতি থাকি যত্নবান।

তিনি বলেন, আমি এখন পারফিউম স্পেশালিষ্ট। গত ৩ বছর কঠোর পরিশ্রম ও মনোনিবেশের ফলে এ জগতে একটা অবস্থান করে নিয়েছি। এই নামকরা কোম্পানীর সেল বৃদ্ধি ও সুনাম রক্ষায় থাকি সবসময় তৎপর। আমি আরও কয়েক বছর চাকুরী করার পর নজর দেব একক ব্যবসায়। এখন নিজেকে মনে করি একজন শিক্ষানবিস।

ক্যাম্পসলাইভ: আপনার বংশীয় খানদান ও নিজেকে কিভাবে মিলিয়ে দেখেন
মাহমুদ আল শরীফ: তার শপথ যার হাতে আমাদের প্রাণ। সেই স্রষ্টার প্রশংসায় আমি সর্বদায় অবনত। তার করুনায় আমার জন্ম হয়েছে হোসাইন বিন আলী (রা:) বংশে, সেই হিসেবে আমরা আওলাদে রাসূল (সা:)। এটা আমাদের গর্ব। তবে কোন অহংকার নেই। ইসলামে গোত্র, বংশ, সাদা, কালো, আরবী, আজমী, মাররেকী, মাগরীবির কোন স্থান নেই। এখানে সকলেই রাসূল (সা:) এর উম্মত।

আল্লাহর বান্দা। আমার দাদা ছিলেন আল-শরীফ-আল কোরাইশ বংশের এখন প্রভাবশালী নেতা। অত্যন্ত মুত্তাকী পরহেজগার ও বিনয়ী খানদান। কোরাইশ বংশের লোকজনকে আগে রাষ্ট্র থেকে সম্মানী দেয়া হতো। নানা কারণে এটা এখন বন্ধ। আমার দাদা সঙ্গে ছিল রাষ্ট্র নায়কদের সুসম্পর্ক। তিনি ছিলেন বড় মাপের মানুষ। তার সবকিছু ফলো করেন আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। তিনি পুলিশ অফিসার ছিলেন।

ক্যাম্পাসলাইভ: দেশ প্রেম ও মক্কা মদীনা সম্পর্কে কিছু বলবেন?
মাহমুদ আল শরীফ: হ্যাঁ এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই। ‘‘আই লাভ মদীনা আল-মোনাওওয়ারা’’। মক্কা-মদীনাকে ভালবাসি। এটা আমার গর্বের ভূমি। মক্কার চাইতেও মদীনা আমার প্রিয়। অলটাইম লাভ মদীনা। মদীনাকে ভালবাসি। রাসূল (সা:) এর গড়া পূণ্যভূমি আমাদের প্রেরণার ভূমি। এই মাটি ও মানুষকে ভালবাসি। এ মাটির জন্য জান-মাল উৎসর্গ করে দিতে প্রস্তুত। লাখ লাখ মদীনার যুবক এ মাটির মর্যাদা ও সুনাম রক্ষায় প্রস্তুত।

মুহাম্মদ আল শরীফ বলেন, আমাদের মদীনার আমীর (গভর্নর) হলেন খালেদ ফয়সাল। তিনি অত্যন্ত সভ্রান্ত ও খানদানী মানুষ। তার সুন্দর ও বিচক্ষণতা এবং দুরদর্শিতার ফলে মদীনা নগরী দিন দিন সমৃদ্ধ ও সুন্দর হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ শহরে রুপান্তরিত করতে তিনি সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আল শরীফ বলেন, আগে মদীনার নাম ছিল তিনটি। তায়্যেবা, ইয়াসরিব ও মদিনা আল মুনাওয়ারা। তবে শেষের নামটিই বেশী প্রসিদ্ধ। এটিই ব্যবহৃত হচ্ছে। এ নগরী সমৃদ্ধির মূল কারণ বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক, মানুষের মুক্তির পথ প্রদর্শক, আহমাদ, মোহাম্মদ মোস্তাফা (সা:) এর কবরস্থান বা রওজা শরীফ। এ কারণে মক্কা-মদীনা বিশ্বের কাছে নন্দিত। সমাদৃত ও প্রসিদ্ধ।

মাহমুদ বলেন, এই নগরে অর্থাৎ মদীনায় বর্তমানে ফুলের চাষ হয়। একধরনের সুগন্ধি গোলাপ ফুল এখানে চাষ হচ্ছে। এছাড়া লেবু, সুগন্ধি এক ধরনের পাতারও চাষ হয় (যা চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে পান করা হয়)। এই পাতা নেনা নামে পরিচিত।

তাছাড়া দুনিয়া জুড়ে প্রায় ২০ ধরনের খেজুরের সুখ্যাতি রয়েছে। সব চাইতে দামী খেজুর হলো আযওয়া। এছাড়া সরকারী পৃষ্ট পোষকতারয় নানান ধরণের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। চাষাবাদ, তথ্য প্রযুক্তি, মিল-ইন্ড্রাষ্টি ও খেজুর উৎপাদনে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

ক্যাম্পাসলাইভ: মদীনা ও মক্কা নিয়ে সৌদি পরিকল্পনার ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?
মাহমুদ আল শরীফ: তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মাদীনায় বেশ কয়েকটি টুরিষ্ট স্পট তৈরীর মহান পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে মরকার। এখন মসজিদে নববীর সামনে থেকে নিয়মিতভাবে টুরিষ্ট বাস চালু হয়েছে।

বিদেশীরা এসব বাসে চড়ে জিয়ারাত করেন। এছাড়া মসজিদে নববী উন্নয়নে ২/৩ বছর ধরে ‘‘মদীনা মেইড’’ নামে একটি কোম্পানী তৈরী করা হয়েছে। এই কোম্পানী বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরী করেছেন। সারা দুনিয়ার লোকজন তা ক্রয় করেছেন।

সরকার মসজিদে নববী উন্নয়ন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। পরিকল্পনার মধ্যে আছে আগামী ১০ বছরের মধ্যে পাঁচাতারা হোটেল শেরাটন, হিলটন, তাইয়্যিবা সেন্টার, সাজা সেন্টার, দারুত তাক্কওয়া, আব্রাওয়ে, মুবিন দিক ও দারুত তাওহীদসহ বহুতল অনেক বিল্ডিং ভেঙ্গে অন্যত্র সরিয়ে নেবে। সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যমন্ডিত করা হবে মসজিদে নববীকে।

মসজিদে নববী প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেন, এখানে বেশ কয়েকজন ইমাম বা খতিব আছেন। তারা সুললিত কন্ঠে বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজ পড়ান। এদের মধ্যে ৫ জন খুবই সুপরিচিত। আলী আল হোজাইফি, আল কাসিম, আল শোয়াইন ও আল আজমী প্রমুখ। মাহমুদ মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে বলেন, এই মসজিদের মোয়াজ্জিনরা বংশানুক্রমে মোয়াজ্জিন হন। ৬/৭ জন মুয়াজ্জিন আজানের কাজটি সম্পন্ন করেন।

মক্কা-মদীনা উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের ব্যাপারে বলেন, সরকারের ভিশন ২০৩০ সালের মধ্যে মক্কা-মদীনাকে আরও উন্নত ও আধুনিক শহরে রূপান্তরিত করা। মসজিদুল হারামের সামনের ওয়াচ টাওয়ার ও মক্কা টাওয়ারসহ সুরমন্য বিল্ডিং বেশ কিছু ভবন ভেঙ্গে ফেলা হবে। মসজিদুল হারামে একযোগে ৩০ লাখ লোক জামায়াতে নামাজের ব্যবস্থা করা। বাদশা ফাহাদের বাড়িটিও ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলেও জানাজানি আছে মক্ক-মদীনায়।
সরকার টুরিষ্ট স্পর্ট হিসেবে জেদ্দা, তায়েফ, আবছা, আলওয়াজ হে ও রিদমীর নাম ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।

ক্যাম্পাসলাইভ: কেমন চলছে পারিবারিক জীবন?
মাহমুদ আল শরীফ: আলহামদুলিল্লাহ! আমি খুবই সুখী। মাত্র ৩ মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। মদীনার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক সদস্যার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। আমরা দু’জনই হ্যাপি। আমার স্ত্রীর নাম শাইমা আতাউল্লাহ।
আপনি কি ৪ বিবাহের জন্য প্রস্তুত? এ প্রসঙ্গে আল শরীফ বলেন, হাদীসে আছে ৪ টি বিয়ে করা যায়। তবে প্রত্যেকের সঙ্গে সমান আচরণ বা ইনসাফ না করতে পারার সম্ভাবনা থাকলে এ ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই একটি বিয়ে করাই যথেষ্ট।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার পিতাও একটি বিয়ে করেছেন। আমি একা। আমার কোন ভাই-বোন নেই। বাবা-মাকে নিয়ে সুখেই আছি। আমাদের যা আছে তা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। আল হাররা শারফিয়া কিং আব্দুল আজিজ রোডের স্থায়ী বাসিন্দা আমরা। আমার পূর্বপুরুষ পবিত্র মক্কা নগরীর।

ক্যম্পাসলাইভ: আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
মাহমুদ আল শরীফ: আপনাকেও ধন্যবাদ, প্রতি বছর আসার দাওয়াত ও দোয়া রইল।

(ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমএইচ

ইউরোপে উচ্চশিক্ষা, স্কলারশিপ পাবেন যেভাবে

October 25, 2017

স্কুলে যেতে পারে না বিশ্বের ১৩ কোটি মেয়ে শিশু

October 25, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *