চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি, ডাক পড়তে পারে প্রণব মুখার্জির

লেখক: নাইম নিজাম

যেখানেই যাই রাজনীতি আড্ডা আলোচনায় পর্যবেক্ষণে ঠাঁই পায়। তিন দিনের সফরে দিল্লি গিয়েছিলাম।
দীপাবলির উৎসবে মেতেছে তখন দিল্লি। দেওয়ালির এ উৎসবের একটি বিষয় আমার দারুণ লাগে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী বোনেরা ভাইয়ের জীবন মঙ্গলময় করতে ভাইফোঁটা দেন, হাতে বাঁধেন রাখি। আমার বড় আপার মৃত্যুর পর আমি লিখেছিলাম, ‘বোনের স্নেহের কাছে ভাইয়ের সব প্রেম ম্লান। ’ শক্তিমান কবি ও লেখক আবু হাসান শাহরিয়ারের লেখা থেকেই কথাটি আমি হূদয়ে গেঁথেছিলাম। ভাইদের জন্য বোনেরাই কেবল হূদয় উজাড় করা নিঃস্বার্থ স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা দিতে পারে। ভাইয়েরা ততটা পারে না। বিয়ের আগে ভাইয়েরা পাগল থাকে বন্ধুদের জন্য, কেউ কেউ প্রেমিকার জন্য। বিয়ের পর ভাইদের জীবন শৃঙ্খলে বাঁধা হয়ে পড়ে। গৃহসুখ ও শান্তির জন্য তার নিজস্ব ভালোলাগা ছোট ছোট সুখ ও অনুভূতি স্বার্থপরের মতো বলি দেয়। কেউ কেউ অনেকটা ক্রীতদাসের মতো জীবনও বেছে নেয়। কিন্তু বোনেরা যেখানেই থাকুক ভাইদের জন্য ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অগাধ স্নেহ-মমতা দিতে কার্পণ্য করে না।

যাক দীপাবলি নিয়ে এ অনুভূতিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে গিয়ে একজনের সাম্প্রদায়িক মন্তব্য মুছে দিতে হলো। তিনি লিখেছিলেন, ‘আপনি নামের শেষে পীর নয় ঠাকুর লিখলেই পারেন। ’ এমন ধর্মান্ধের সঙ্গে তর্কে যেতেও রুচিতে কুলায় না। রুচি এমন এক জিনিস সেটি সায় না দিলে যা খুশি তা খাওয়া যায় না, যা খুশি তা বলা যায় না, যা খুশি তা পড়া যায় না। এমনকি যেখানে সেখানে যার তার কাছে সাময়িক লোভ মোহ বা স্বার্থের জন্য ছুটে যাওয়াও যায় না। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের কিংবা বিবেকবোধসম্পন্ন নাগরিকের আপসেরও সীমা থাকে। কেউ কেউ পারে জলের মতো সব পাত্রের আকার ধারণ করতে, কিংবা আলুর মতো সহজলভ্য হয়ে যে কোনো তরকারিতে ব্যবহূত হতে।

বরাবর আমি গর্ববোধ করি একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নিলেও একটি অসাম্প্রদায়িক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছি। মা, বাবা ও বোনদের তাহাজ্জুদের নামাজ, সুরেলা কোরআন তেলাওয়াতে ঘুম ভেঙেছে। স্কুলজীবনে ফজর ও মাগরিবের নামাজ পড়ে পড়তে বসা রেওয়াজে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু পাড়ার কাকার বাড়িতে থাকা কৃষ্ণসুন্দর দা বা ভারতে গিয়ে অকাল প্রয়াত ঝন্টু দা যখন পাড়ায় ঢুকতেন তখন কি হিন্দু কি মুসলমান সব ছেলে দৌড়ে বাড়িতে ঢুকতাম। সবার অভিভাবক তিনি। মাও বলতেন ঝন্টু এসে গেছে এখন পাড়া শান্ত। জোছনা রাতে আমার প্রেম কবিতা গান আড্ডা ও জলজোছনার শহরে মা মাসিমাদের নিয়ে উঠানে শীতল পাটি বিছিয়ে পানের বাটার গল্পের আসর বসাতেন। আসাম প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাস আমাদের অনেকের বাড়িতে রোজার মাসে ইফতার পাঠাতেন। আমার অকাল প্রয়াত মেজভাই সাবিত আহমদ পীরকে তিনি ভীষণ স্নেহ করতেন। তিনি ঈদের দিন নেহেরু টুপি, শেরওয়ানি ও সাদা ধুতি পরে ঈদগাহের বাইরে দাঁড়াতেন। ঈদের জামাত শেষে মুসল্লিদের সঙ্গে কোলাকুলি করতেন। ঈদ এলে হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধু স্বজনদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমরা দাওয়াত করতাম। পৌষ সংক্রান্তি এলে তারা আমাদের নিমন্ত্রণ করতেন। নিমন্ত্রণ ও দাওয়াত এই দুই শব্দ আমাদের সামাজিক ও আন্তরিক বন্ধনকে কখনো ছিন্ন করতে পারেনি।

সুমহান মুক্তিযুদ্ধে কী প্রলয় ঘটে গেছে একালের প্রজন্ম শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর কন্যা ডা. নুজহাত চৌধুরীর বক্তৃতায় চোখে-মুখে অশ্রুজলে দেখতে পায়। একাত্তরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসররা সাম্প্রদায়িকতার স্লোগান তুলে এদেশে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে ডুবেছিল। ফারুক মিয়া নামে সুনামগঞ্জের একজন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক পরিবারেই জন্ম নেননি সহোদরদের নিয়ে পাকিস্তানের দালাল মুনায়েম খানের ছাত্র সংগঠনই করেননি, একাত্তরে আল ফারুক বাহিনী গঠন করেছিলেন। গরিব রিকশাচালকদের বুকে অস্ত্র ধরে তার বাহিনীতে যোগদান করিয়েছিলেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধকালীন যেসব পরিবারের সন্তানরা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাদের অভিভাবকদের কাছে চাপ সৃষ্টি করতেন সন্তানকে ফিরিয়ে এনে দেওয়ার জন্য। যুদ্ধকালীন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তালেবকে হানাদার বাহিনী যখন রণাঙ্গন থেকে ধরে আনে তখন এরা উল্লাস করেছিল। নির্যাতন ক্যাম্পে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে অকথ্য নির্যাতনই চালায়নি ফারুক চৌধুরীরা হানাদার বাহিনীর জিপে টেনে শহরতলিতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিল।

সুনামগঞ্জ জেলা জাসদের সভাপতি আ.ত.ম. সালেহ গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে সিলেটে প্রবেশ করলে হানাদার বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দিয়েছিল। শহরের রাহাত মঞ্জিলের হানাদার বাহিনীর দোসর গণি দারোগা ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পদ গণিমতের মাল বলে লুটপাট করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম দেওয়ান ওবায়দুর রেজা ও বারি মিয়াদের বাড়ি ভেঙে দিয়েছিল। যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা গণি দারোগার বাড়িতে গুলি করে প্রবেশ করেছিল। গণি দারোগার দুই ছেলে অস্ত্রধারী আলবদর ছিলেন। ফারুক চৌধুরীদের বাড়িতে ব্রাশফায়ারই করেনি সিলেট পর্যন্ত তাকে খুঁজেছিল। তিনি পাকিস্তানে পালিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে শহরে যেতে পারেননি। এসব হানাদার বাহিনীর দোসররা সারা দেশেই ছিল। তাদের ছোবল যারা খেয়েছে তারাই জানে সেই বিষের যন্ত্রণা কতটুকু। ১৯৭০ সাল থেকে আমাদের পরিবার বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। একাত্তরে সীমান্ত এলাকার যে আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছিলাম সেই সময় এক আত্মীয় মাকে মা বলায় প্রশ্ন করেছিলেন আমরা হিন্দু নাকি। মা ডাক নাকি হিন্দু শব্দ! আমরা মাকে মা বাবাকে বাবা বলে ডাকতাম। এটা ধর্মের কোনো বিরোধ ছিল না। কারও কারও মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার বিরোধ ছিল। আমৃত্যু সেই আত্মীয়কে ক্ষমা করতে পারিনি।

একাত্তরে যারা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে বর্বরতা চালিয়েছে, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কীভাবে তাদের ক্ষমা করবে? নুজহাত, শমী কায়সার, শাহিন রেজা নূরসহ অসংখ্য শহীদ সন্তানদের চোখের দিকে তাকালেই আমার এ কথাই মনে হয়। একাত্তরে আমরা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত করে ধর্মনিরপেক্ষ শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলাম জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। আর আমাদের সেই মুক্তি সংগ্রামে যিনি অসীম সাহসিকতা নিয়ে আমাদের আশ্রয়, অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক ভারতের নেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের জনগণ নানা সংকটের মুখে থেকেও এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। ভারতের সামরিক বাহিনী মিত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধই করেনি জীবনও দিয়েছে। ভারতের বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার সম্প্রতি প্রকাশিত আত্মজীবনীতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার বা বন্ধুত্বের বাতিঘর হিসেবে নিজের ভূমিকাকে তুলে ধরেছেন। অকপটে বলেছেন তার জীবনে দেখা বড় ঘটনা হলো বাংলাদেশের জন্ম।

বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। তারপর যাদের নাম আসে তাদের মধ্যে রয়েছেন সিদ্ধার্থ শংকর রায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি ও একজন কমিউনিস্ট নেতার অন্তর্ঘাতমূলক সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা পশ্চিমবঙ্গের তিন দশকের দাপুটে মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু। বাংলাদেশের বন্ধুত্বের বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়িয়ে আছেন দীর্ঘ রাজনীতির পথ হাঁটা কংগ্রেস রাজনীতির প্রাণপুরুষ বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। যতবার দিল্লি গিয়েছি ভারত সরকারের আমন্ত্রণেই হোক লোকসভার নির্বাচন কভার করতেই হোক কিংবা ব্যক্তিগত সফরেই হোক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে ততবারই দেখা করেছি। রাষ্ট্রপতি ভবন তিনি শুধু ভারতবর্ষের মানুষের জন্যই খুলে রাখেননি বাংলাদেশের জন্যও উন্মুক্ত করেছিলেন। তার বিদায়ের আগেও দেখা করেছি। অবসরে বইয়ের ভুবনে ডুবে থাকা এই জ্ঞানী পণ্ডিত রাজনীতিবিদের মুখে সবার ব্যাপারে ইতিবাচক মন্তব্যই শুনেছি। এক জীবন্ত ইনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে প্রতিবার তাকে মনে হয়েছে। দিন, তারিখ, সনসহ একেকটি ঘটনা গল্পের নায়কের মতো বলে যান ইতিহাসের এই কিংবদন্তি।

একবার তাকে বলেছিলাম বাংলাদেশে একজন রাজনীতিবিদ রয়েছেন তার নাম তোফায়েল আহমেদ। যিনি আপনার মতো দিন, তারিখ, সনসহ একেকটি ঘটনা বর্ণনা করতে পারেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশে তার একটি বোন ও ভাই রয়েছেন। একজন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, অন্যজন একাত্তরের বীরযোদ্ধা বাঘা সিদ্দিকীখ্যাত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। এবারের সফরে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল শনিবারে কিন্তু তার এক আত্মীয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি চলে যান পশ্চিমবঙ্গে। রবিবার সন্ধ্যায় তিনি ফিরেছেন। আমি দুপুরের ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরেছি। দুই দিন বাড়তি থাকলে দেখা হতো। তার ছেলে এখন লোকসভার সদস্য। কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখার্জি দিল্লি কংগ্রেসের মুখপাত্র। রাজনীতিতে বাবার হাত ধরে আসা এই মেধাবী কন্যা দিল্লির রাজনীতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। উত্তরখণ্ড প্রদেশ কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদিকা শিল্পী অরোরার সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা হয়েছে। রসিকতার ছলে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, কংগ্রেস থেকেই বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন এ কথা সত্য নয়। বিজেপি থেকেও কংগ্রেসে যোগদানের ঘটনা ঘটছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুলের নেতৃত্বেই তার গভীর আস্থা। তবে দিল্লিতে কর্মরত একদল সিনিয়র সাংবাদিকের সঙ্গে আড্ডায় আড্ডায় উঠে এসেছে নানান ঘটনা। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের যে রূপ মাধুর্য বিশ্বরাজনীতিতে বহমান সেখানে আঁচড় বসিয়েছে বিজেপির শক্তি হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তোলা আরএসএসসহ নানা সংগঠন। সাংগঠনিকভাবে নানা নামে বিজেপি ও তার অনুসারীরা শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুললেও সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসকদের হাত ধরে ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তির যে উত্থান ঘটেছিল তার উত্তরাধিকারিত্ব গণতান্ত্রিক শক্তি যেমন বহন করেছে তেমনি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উঠে আসা ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে সেই ধর্মান্ধ শক্তির বিষাক্ত নিঃশ্বাস ছড়িয়েছে বিজেপি ও আরএসএস। এখান থেকে সেখানে অনেকের অভিমত, ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেউ চিন্তাও করেননি আধুনিক বিজেপি নেতা প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে তার জোটের করুণ ভরাডুবি ঘটবে। ইন্ডিয়া টুডের মতো গণমাধ্যম সেই ভোটযুদ্ধে বাজপেয়ির বিজেপিকে ৩০০ আসন নিশ্চিত করেছিল। সব জনমত জরিপ ভুল প্রমাণ করে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হননি শাসক ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন মনমোহনের হাতে।

বিজেপির সিনিয়র নেতা ও বাজপেয়ির উপ-প্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, আমাদের ভাগ্য ভালো যে বিরোধী দলের নেতা সোনিয়া গান্ধী। অথচ সোনিয়াই জনমত নিয়ে ভোটযুদ্ধে ব্যালট বিপ্লব পক্ষে টেনেছিলেন। সেই সময়ও কংগ্রেসে নেতৃত্বের সংকট ছিল। এক বছর আগেও যারা ভাবেননি নরেন্দ্র মোদির বিজেপির কর্তৃত্বে ভারতদুর্গে কেউ আঘাত হানতে পারবেন না সেখানে আজ বলাবলি হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সেখানে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে গণঅসন্তোষের মুখে তাকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব আর হিন্দুত্ববাদ— এই তিন নিয়ে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি জোট আগামী লোকসভা নির্বাচনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাচ্ছেন। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে শুরুতে জনমত তার পক্ষে গিয়েছিল। বলা হচ্ছিল, বড়লোকরা এবার ধরা পড়বেন। সেই আলোকে উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে পার পেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তুলে আর সচেতন মুসলিম নারীদের ভোট টেনেছিলেন তিন তালাকের বিরোধিতা করে। এতে সচেতন মুসলিম নারীদের অহমে লেগেছিল। ৪০০ আসনের মধ্যে মায়াবতী যেখানে ১০০ আসনেই মুসলিম প্রার্থী দিয়েছিলেন সেখানে বিজেপি সব হিন্দু প্রার্থী দিয়েছিল। সব মিলিয়ে সেই নির্বাচনে বিজেপি উতরে গেলেও এখন তার জনমতে ভাটা পড়েছে। লোকসভা নির্বাচনে যেখানে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, কালো টাকা সাদা করে এনে গরিবদের পরিবার প্রতি ১৫ লাখ টাকা দেবেন। ব্যাংক অ্যাকাউন্টও খুলেছিলেন কিন্তু তাদের সেই কপাল খোলেনি, ১৫ লাখও জোটেনি। কৃষকরা মহাজনি সুদে আটকা পড়ে শেষ হয়েছে। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, এ বক্তৃতা ছিল নির্বাচন জমানোর। নোট বাতিলের কারণে ছোট ও ক্ষুদ্র শিল্প মার খেয়েছে। বেকারত্বের দুর্দশা দেখা দিয়েছে। এমনকি গণমাধ্যম কর্মীরাও রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় গণছাঁটাইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন।

কৃষকদের ফসল উৎপাদনের ন্যূনতম ৫০ ভাগ সহায়তা দিতে না পারা অন্যদিকে মহাজনি ঋণের বোঝায় কয়েক হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। গরু নিয়ে যে বাড়াবাড়ি হয়েছে তা সংঘাতেই শেষ হয়নি বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের পথকেও রুদ্ধ করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। অনেকে বলছেন, নরেন্দ্র মোদির রাজনীতির চমক ভাষণেই শেষ হয়েছে। এখন তাকে সমালোচকরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নয় গুজরাটের প্রধানমন্ত্রী বলছেন। প্রতি সপ্তাহে তিনি গুজরাট যাচ্ছেন সেখানকার নির্বাচনে ফলাফল গড়ে তুলতে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে গুজরাট নিয়ে বুলেট ট্রেন উদ্বোধন করেছেন। বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি একক নেতৃত্ব ও ক্যারিশমায় উঠে এসেছিলেন এক স্লোগানে ‘আব কি বার মোদি কা সরকার’। এবার সমালোচকরা বলছেন ‘আব কি বার দুরছে নমস্কার’।

নরেন্দ্র মোদি তিন বছরে সংবাদ সম্মেলনের মুখোমুখি হননি। বিজেপির যুবকরা হিন্দুত্ববাদের স্লোগান তুলে যারাই তাদের বিরোধী তাদেরই শত্রু দেশের এজেন্ট বানিয়ে নিগৃহীত করছেন। দিল্লির একটি উপনির্বাচনে আম আদমি পার্টির বিজয়ী লোকসভা সদস্য বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন নিশ্চিত বিজয়ের আশায়। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেছে আম আদমি পার্টির প্রার্থী আরও বেশি ভোটে জয়লাভ করেছে।

নরেন্দ্র মোদিকে ভেরি গুড ইভেন্ট ম্যানেজার বলেছিলেন আদভানি। সেখানেই তিনি রয়ে গেছেন। চারবারের লোকসভা সদস্য বিনোদ খন্নার মৃত্যুতে গুরুদাসপুরের শূন্য আসনের উপনির্বাচনে রাহুল গান্ধীও প্রচারণায় নামেননি। অথচ কংগ্রেসের কাছে বিজেপি হেরেছে বিপুল ভোটে।

সমালোচকরা আরও বলছেন, ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ডাকলেন। আর পাকিস্তান একের পর এক হামলা চালাল। বিরোধী দলে থাকতে আজকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, পাকিস্তান একজন জওয়ানকে মারলে আমরা ১০ জন মারব। এখানেই তাদের রাজনীতি ভাষণে ঠাঁই পেয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দৃশ্যমান রাজনীতিতে বিজেপির একচ্ছত্র ক্ষমতা দেখা গেলেও ভিতরে ভিতরে ক্ষয়েই যাচ্ছে। সমালোচনার মুখে মোদি ও তার দল পতিত। এটি এক বছর আগেও ছিল না। কংগ্রেসে এখন পিদাম্বড়ম, গোলাম নবী আজাদ ও রাজস্থানে রাজ পরিবারের ছেলে রাজীব গান্ধীর রেলমন্ত্রী মাধব রাও সিন্ধিয়ার ছেলে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মতো নেতারা উঠে এসেছেন। নভেম্বরে কংগ্রেসের সম্মেলনে রাহুল গান্ধী পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের কাছে রাহুল গান্ধী হয়তো নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে গ্রহণযোগ্য করতে পারেননি। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির উত্তরাধিকারিত্ব বহন করা এনটিপির সারদ পাওয়ার তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা ব্যানার্জি, তামিলনাড়ুর করুণা নিধির ছেলে স্টালিন, মোনায়েম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেস, বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেত্রী মায়াবতীদের কাছে বয়স ও যোগ্যতার বিচারে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারেন। তাই বলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)সহ এসব শক্তির এককথায় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির জোট গঠনের ট্রেন চলতে বিলম্ব করবে না। এক্ষেত্রে ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির উত্থানে নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কথায় অবসরে গেলেও বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এখনো সক্রিয়। এখনো তার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা উজ্জ্বলতর। কার্যত অবসরে গেছেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। প্রণব মুখার্জি নরেন্দ্র মোদির পরিশ্রমের প্রশংসা করেন। অনেকের মতে, তিনি বিরোধী পক্ষকে কার্যত এ বার্তাই দেন তোমরাও পরিশ্রম কর। তিনি তরুণ প্রজন্মের নেতা রাহুল গান্ধীরও প্রশংসা করেন যে তিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে পারেন। শেষ মুহূর্তে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রণব মুখার্জিই হতে পারেন ভারতের রাজনীতির রেকর্ড ভেঙে আসা আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী। যদিও তিনি বলেছেন রাষ্ট্রপতি থেকে বিদায় নেওয়ার পর অবসর জীবন কাটাবেন। তবুও অনেকে মনে করেন, দেশের রাজনীতি ও ঐতিহ্যের স্বার্থে সবার অনুরোধে অভিভাবকত্বের জায়গা থেকে তিনিই ডাক পেতে পারেন এবং সেটি গ্রহণ করতে পারেন। তবে এসব কিছুই চলছে জল্পনা-কল্পনা। যদিও ভারতে রাষ্ট্রপতি থেকে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ট্রেডিশন না থাকলেও কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই।

শুরুতে ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক মন্তব্যকারীর কটূক্তি নিয়ে যে বেদনার কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম আজকের বাস্তবতায় দাঁড়ালে দেখি সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানে যে চিন্তা বা চেতনার বিরুদ্ধে বাঙালির বিরক্ত জেগে উঠেছিল সেই একাত্তরের পরাজিত ধর্মান্ধ শক্তির উত্তরাধিকারিত্ব এখনো অনেকে লালন করেন। ব্যালট বিপ্লবে এরা ক্ষমতায় না আসতে পারলেও তাদের উত্থান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ধরে রাখতে না পারলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জায়গাটাকে নিয়ে এখনো লড়ছি। আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে পারিনি। কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন শেষ হয়নি। অন্যদিকে ভারত গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী, স্বাধীন করলেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও ধর্মান্ধদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় উত্থানই ঘটেনি, সমাজ জীবনেও আস্ফাালন বেড়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ প্রায় অভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে ঐতিহ্য নিয়ে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে রয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তি দুটি রাষ্ট্রের জন্মগত ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে। জনগণের সুসংগঠিত ঐক্যই এ অন্ধকার শক্তিকে পরাস্ত করতে পারে। দুই দেশেরই রাজনৈতিক নেতৃত্বে যার যার সমস্যা চিহ্নিত ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা লালন করে মোকাবিলার সময় দরজায় কড়া নাড়ছে— এটাই আমার বার বার মনে হয়েছে।

অনেকবার বলেছি একালের করপোরেট সংস্কৃতির বাইরে নিজের মতো টিকে থাকার লড়াই বড় কঠিন। আমাদের নিউজ পোর্টাল করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। তবু হাল ছাড়িনি। নিউজ পোর্টালের সাইট ব্লক করা হয়েছে। কেন হয়েছে, তা জানি না। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা ও পাঠকরা। আপাদমস্তক অনেক সংবাদকর্মীর মতো আমাদের রিপোর্টার উৎপল দাস এ মাসের ১০ তারিখ থেকে নিখোঁজ। প্রথম ভেবেছিলাম চিরচেনা অভ্যাস কিন্তু অফিস থেকে অনুপস্থিতির কারণে তার ঠিকানায় চিঠি প্রদান, তার বন্ধুবান্ধব সবার কাছে খোঁজ নিয়ে হদিস মিলছে না। এ সংবাদ জানানোর পর অস্থিরতায় পড়লাম। থানায় জিডি করতে বললাম। জিডির পর উৎপলের বাবাও এসে একটি জিডি করলেন। ১৪ দিন সে নিখোঁজ। তার মোবাইল বন্ধ। ঢাকার পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া একজন দক্ষ অভিজ্ঞ সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা। তার শরণাপন্ন হলাম। তিনি সিরিয়াস হলেন। আশাবাদী প্রাণবন্ত চঞ্চল উৎপল ফিরে আসবে।

আওয়ামী লীগ রাজনীতির সবচেয়ে পরীক্ষিত, উদার, গণতান্ত্রিক, ভদ্র, বিনয়ী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী শিলা ইসলাম ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক মন্ত্রী এম কে আনোয়ারের মৃত্যু ব্যথিত করেছে। জাঁদরেল আমলা এম কে আনোয়ার রাজনীতিতে এসে সংসদ থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রশংসিত ভূমিকা রেখেছিলেন।

সবশেষে আমাদের সরকারের কাছে জানতে ইচ্ছা করে বিনা অনুমতিতে তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজের সুটকেসের তালা ভেঙে তল্লাশি চালায় কারা! এই ঔদ্ধত্য কার?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ট্রাম্পের মুখে রুশ পতাকা ছুড়ে মারলেন বিক্ষোভকারী (ভিডিও)

October 25, 2017

এবার শৌচরত নারীর ছবি তুলে বিপাকে বিজেপি নেতা

October 25, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *