বিশ্বসম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে আমেরিকা ও ইসরাইল

এক অন্ধকার সময়ের ততোধিক ঘোর রাজনৈতিক অন্ধকারে ক্ষমতদাদর্পি-রক্তপিপাসু শাসকদের রক্তচক্ষু প্রত্যক্ষ করছে বিশ্বসম্প্রদায়। চারদিকে ধ্বংসযজ্ঞ, কার্পেটবোমা-ক্লাস্টারবোমায় ছিন্নভিন্ন মানবদেহের পাশে মুমুর্ষু শিশুদের কান্নায় ভারী হওয়া আকাশ-বাতাসে চক্কর দেয়া গোয়েন্দা ড্রোন থেকে তোলা চমৎকার ফুটেজগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি ও সংক্ষোভ ছড়াচ্ছে। দামেস্ক, আলেপ্পো, রাকা, মসুল, তিকরিত, বাগদাদ, কাবুল, কান্দাহার, ত্রিপোলি, বেনগাজি, সানা, এডেন, মুগাদিসু-সোমালিয়ায় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ, দখলবাজি চালিয়ে অত:পর সন্ত্রাস বিরোধি যুদ্ধে বিশ্ব মোড়লেরা ব্যর্থ, বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত হয়ে পালাবার পথ খুঁজলেও তাদের বপিত আত্মাঘাতি যুদ্ধের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একদিনের জন্য রক্তপাত বন্ধ করেনি। আত্মঘাতি বোমা প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে রক্তমাংসের হোলি খেলছে।

প্রতিটি ঘটনার পরই পশ্চিমা মেইনস্ট্রীম মিডয়াগুলোতে প্রচার হচ্ছে অমুক ইসলামি জঙ্গিগ্রæপ হামলার দায় স্বীকার করেছে। আর এসব জঙ্গিগোষ্ঠির কথিত ঘাঁটি বা আস্তানা গুড়িয়ে দিতে আমেরিকা-রাশিয়ার জঙ্গি বিমানগুলো টনে টনে বোমা ফেলে মুসলমানদের হাজার বছরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ নগর ও জনপদগুলোকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করছে। এই যুদ্ধের খাই মেটাতে আরব দেশগুলো পশ্চিমা সব অস্ত্র উৎপাদকদের কাছে ধর্না দিচ্ছে।

তেল বিক্রির হাজার হাজার কোটি ডলার দিয়ে কেনা হচ্ছে মারণাস্ত্র। তবে নিজস্ব জঙ্গিগোষ্ঠি দিয়ে ইরাক-সিরিয়ার তেলসমৃদ্ধ শহরগুলো দখল করিয়ে সেখান থেকে নামমাত্র মূল্যে তেল কিনে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজারে ধস নামিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য ১৩০ ডলার থেকে এখন পঞ্চাশ ডলারে নেমে এসেছে। পশ্চিমা দুনিয়ার ভোগাবাদি সভ্যতার চাহিদা মেটাতে ভ‚-গর্ভে লাখ লাখ বছরে জমা হওয়া ফসিল জ্বালানী আবিস্কৃত হওয়ার পর একশ বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে বসেছে। আগামী শতকের শুরুতে আমাদেরকে ফসিল জ্বালানীর বিকল্প খুঁজে বের করতেই হবে। এহেন বাস্তবতায় কাটি কোটি ব্যারেল ফসিল জ্বালানী লুটে নেয়ার মতলবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে ফায়দা হাসিল করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল।

আইএস ও বিদ্রোহীদের দখলে থাকা তেলক্ষেত্রগুলো থেকে পাচার হওয়া তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেলকোম্পানী ও ইসরাইল ভাগাভাগি করে নিয়েছে বলে জানা যায়। সিরিয়ায় রিজিম চেঞ্জ’র নামে বাশার আল আসাদের জন্য সাদ্দাম হোসেন বা গাদ্দাফির পরিনতি এবং সিরিয়াসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আরো একাধিক খন্ডিত ও ব্যর্থ রাষ্ট্রের জন্ম দেয়াই এখানে রিজিম চেঞ্জের পশ্চিমা এজেন্ডার মূল লক্ষ্য। ইরানের সাথে ৬ জাতির পরমানু সমঝোতা এবং রাশিয়া ও ইরানের হস্তক্ষেপে সিরিয়ায় ইসরাইল ও মার্কিনীদের স্বপ্নভঙ্গ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সা¤্রাজ্যবাদের পুরো গেমপ্লানই পাল্টে গেছে।

ইরাক ও সিরিয়ায় বিশৃঙ্খলার সুযোগে বিচ্ছিন্নতাবাদি কুর্দিদের সাথে গোপন সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল ইসরাইলীরা। ইরাক ও সিরিয়া ভাঙ্গার সেই বৃহৎ গেমপ্লানে সফল না হলেও তারা এখন দক্ষিন ইরাকে একটি কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ইরাকি পার্লামেন্ট ও সুপ্রীম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কুর্দিরা গতমাসে রেফারেন্ডাম করে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়। ইরাক, ইরান, তুরস্ক, ফ্রান্স এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত কুর্দি রেফারেন্ডামের বিরুদ্ধে অবস্থান ব্যক্ত করার পরও কুর্দি নেতা বারজানির খুঁটির জোর মূলত ইসরাইল। রেফারেন্ডামের পর ইসরাইল সমর্থিত কুর্দি পেশমার্গা বাহিনীর কাছ থেকে ইরাকি সেনাবাহিনী ইরবিলসহ তেলক্ষেত্রগুলোর দখল নেয়ার পর এ সপ্তাহে সউদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কুর্দি রেফারেন্ডামের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ক্ষেত্রে সউদি আরব ও ইসরাইল প্রায় অভিন্ন অবস্থানে দাড়িয়েছে। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদের কারণে কুর্দিশ স্বায়ত্বশাসনের উপর ইরাকের সরাসরি হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে কুর্দিদের তেলক্ষেত্রগুলোর উপর ইসরাইলী লুণ্ঠণ বন্ধ হয়ে গেল। এই তেলের বিনিময়ে ইসরাইল কুর্দি পেশমার্গা বাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করেছিল ইসরাইল।

সউদি আরবকে হাতে রেখে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসরাইলের অস্তিত্বকে নিষ্কণ্টক রাখা। মিশরে গণতন্ত্রের যাত্রা রুদ্ধ করে সেখানে আবারো ইসরাইলের অনুগত পশ্চিমা পুতুল সরকার কায়েম করার আগেই ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তানকে খন্ড-বিখন্ড করা সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। চুড়ান্ত পরিকল্পনায় ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীল ও পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্র ইরানকে দুর্বল ও খন্ড-বিখন্ড করার মধ্য দিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করার দ্বারপ্রান্তে পৌছে গিয়েছিল।

সিরিয়া যুদ্ধে রাশিয়া ও ইরানের হস্তক্ষেপ এবং ইরানের সাথে ৬ জাতির পরমাণু সমঝোতা চুক্তি জায়নিস্ট-নিওকন মার্কিনীদের সেই চক্রান্তের গুড়ে বালি ঢেলে দেয়। মুসলিমবিদ্বেষী ও বর্ণবাদি ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। দীর্ঘদিনের পরিকিল্পত চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর অনেকটা ডেসপারেট ইসরাইল কুর্দিদের স্বাধীনতা কার্ড খেলেও তেমন সুবিধা করতে পারছেনা। সেই ঝাল ঝাড়তে ফিলিস্তিনিদের উপর নতুন অবরোধ ও আগ্রাসন নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে ফ্রাস্ট্রেটেড ইসরাইলের ক্ষীণদৃষ্টি আঁচ করা যায়। ইঙ্গ-মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি ইসরাইল সাম্প্রতিক সময়ে রেগে গিয়ে হেরে যাওয়ার একাধিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। গাজায় ১০ বছর ধরে স্থল, নৌ ও আকাশপথের অবরোধ অব্যাহত রাখার মধ্যেও গত একদশকে অন্তত দুইবার হামাস ও হেজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের কাছে হেরে নাস্তানাবুদ হয়েছে ইসরাইল।

অন্যদিকে হাজার কোটি টাকার পশ্চিমা সমরাস্ত্র কিনে পশ্চিমা বশংবদ সামরিক জোট গঠন করে ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের দমনে স্বল্প মেয়াদি যুদ্ধের ঘোষনা দিলেও গত দুই বছরে ইয়েমেনের উপর শত শত টন বোমা ফেলেও হুথিদের পরাস্ত করা সম্ভব হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে গুথিদের পাল্টা আক্রমনে সীমান্তে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সউদি জোট বাহিনী। নিয়মিত যুদ্ধে মার্কিন ও ন্যাটো সামরিক জোটের মত পরাশক্তি বাহিনী দেড়দশক ধরে অবিরাম আগ্রাসন চালিয়েও যেমন মধ্যপ্রাচ্যে তেমন কোন ভ‚-রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারেনি, একইভাবে তারা কৌশল বদল করে মার্সেনারি বা প্রক্সি ওয়ারের মাধ্যমেও এখন আর ডিসাইসিভ বিজয় অর্জন করতে পারছেনা।

উপরন্তু জঙ্গি দমন বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে একেকটি সমৃদ্ধ জনপদকে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করে বিশ্বের সামনে নিজেদের ধ্বংসোন্মাদ কদর্য চেহারাই উন্মুক্ত করে চলেছে। বলতে গেলে এই মুহূর্তে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদি শক্তি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও ক‚টনৈতিকভাবে একটি শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত ওরা এখন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভ‚মিতে নতুন করে আরো হাজার হাজার ইহুতি বসতি স্থাপন করার ঔদ্ধত্বপূর্ণ ঘোষনা দিয়ে ভবিষ্যতে পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত করার উস্কানিমূলক সিদ্ধান্তের কথাও প্রকাশ করেছে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর উস্কানীমূলক ঘোষনাকে বিশ্বের কোন দেশ সমর্থন জানায়নি। তবে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হেজবুল্লাহ ও হামাসের পক্ষ থেকে ইসরাইলের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নতুন বিশ্বব্যবস্থার আওতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বে ও পশ্চিমা দেশগুলোর গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে জাতিসংঘসহ যে সব বিশ্বসংস্থাগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল এতদিন ধরে সে সব সংস্থা বিশ্বের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এ সব সংস্থায় আর তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য কাজ করছেনা। সংস্থাগুলোকে নিজেদের এজেন্ডামাফিক চালাতে ব্যর্থ হয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে মূলত: একা হয়ে পড়ছে আমেরিকা। গত কয়েক মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে তার নিজের প্রস্তাবিত পিপিপি বাণিজ্যচুক্তি, প্যারিস জলবায়ু জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। অত:পর ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত ৬ জাতির পারমানবিক সমঝোতা চুৃক্তি থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে মার্কিনীরা।

সর্বশেষ গত সপ্তায় ইসরাইলীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনার টেবিলে কূটনৈতিক লড়াইয়ে সুবিধা করতে ব্যর্থ হয়ে হতাশ মার্কিনী ও ইসরাইলীরা এখন বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক সভ্যতা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলার আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আগ্রাসি রাষ্ট্র ইসরাইলের অবৈধ স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিশ্বসংস্থা ও বিশ্বসম্প্রদায়ের কমন ইস্যুগুলোতে এমনকি নিজেদের পুরনো মিত্রদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পরমানু চুক্তি ইস্যুতে পশ্চিমা মিত্রদের সাথে মার্কিন প্রশাসনের সুস্পষ্ট মতপার্থক্য ও বিভাজন রেখা দেখা দিয়েছে।

একপাক্ষিক পুঁজিবাদি বিশ্বমোড়লিপনার কাছে বিশ্বসম্প্রদায় চিরদিন জিম্মি হয়ে থাকতে পারেনা। ইতিহাসের সত্যকে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা দিয়ে আড়াল করে রাখার চেষ্টা কিছুদিনের জন্য সফল হলেও অবশেষে তা একদিন মিথ্যার ধূলো ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবেই। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস, শিক্ষা ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করবে, এটাই বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রত্যাশা।

ইউনেস্কো যে সব স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সে সব স্থানের সাথে সভ্যতার ক্রমবিকাশের ভ‚-প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস জড়িত। কোন ধর্মীয় গোষ্ঠির পৌরাণিক বিশ্বাসের সাথে যদি বিদ্যমান ইতিহাস ও বাস্তবতার যোগসুত্র খুঁজে পাওয়া না যায় সেখানে ইতিহাসের পথচলা বাস্তব উপাদান থেকেই গৃহিত হয়। ইউনেস্কো যখন জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদ বা হেবরন শহরকে ফিলিস্তিনিদের ঐতিহ্যগত সম্পদ বলে ঘোষনা দেয় তখন তারা ঐতিহাসিক সত্যের উপর দাড়িয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সেখানে পৌরাণিক বিশ্বাস থেকে জায়নবাদি ইসরাইলীরা যদি সমগ্র আরব মধ্যপ্রাচ্যকে ইহুদিদের প্রোমিজডল্যান্ড বলে দাবী করতে থাকে ইতিহাসের নিরীখে সেটা ধোপে টিকেনা বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের বানীকেই গ্রহনযোগ্য ইতিহাস হিসেবে জাহির করে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের লিগ্যাসি প্রমানের জায়নবাদি তৎপরতা বিশ্বের আর কোন সম্প্রদায় মেনে নেয়নি। এটা মেনে নেয়ার বাস্তবসম্মত ঐতিহাসিক কোন কারণও নেই।

উল্লেখ্য, জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে আসার বহু আগে তা’ গ্রীক, রোমান ও বাইজান্টাইনদের দখলে ছিল। রোমানদের দ্বারা ইহুদিরা বিদাড়িত হওয়ার আগেও একাধিকবার তারা মধ্যপ্রাচ্য ও মিশর থেকে বিতাড়িত অথবা স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেছিল। ইহুদিদের দাবীকৃত প্রথম টেম্পল রোমানরা ভেঙ্গেছিল। মুসলমানরা কখনো ইহুদিদের টেম্পল ভাঙ্গেনি বা জমি দখল করেনি। বিংশ শতাব্দীর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জবাবদিহিতার যুগে পশ্চিমা পুঁজিবাদি সা¤্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হাজার বছরের ধারাবাহিক ঐতিহ্যের ধারক ফিলিস্তিনিদের ভ‚মি দখল করে জায়নবাদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা ওল্ড টেস্টামেন্টের রেফারেন্স ধরে এখানে গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে।

এটা যদি স্বপ্ন দেখার মধ্যেই সীমাব্ধ থাকত তাহলে কোন কথা ছিলনা। সেই পৌরাণিক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ওরা প্রথমে আরব মুসলমানদের বিতাড়িত করে একটি অবৈধ রাষ্ট্র কায়েম করেছে, অত:পর একটি সম্প্রসারণবাদি নীতি গ্রহন করে প্রতিবেশি আরব দেশগুলোর ভ‚মি দখলের জন্য বর্বর সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। শুরু থেকেই ইঙ্গ-মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ জায়নবাদি রাষ্ট্রের এই অপকর্মের প্রত্যক্ষ মদদদাতা। সাম্প্রতিক সময়ে আরব-ইসরাইল প্রশ্নে বারাক ওবামা প্রশাসন এবং বৃটিশরা বিশ্বসম্প্রদায়ের পদক্ষেপের সাথে মৌন সমর্থন জানালেও ওবামা পরবর্তি ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন নির্লজ্জভাবে জায়নবাদের শিখন্ডির মত আচরণ করছে। এর সর্বশেষ নজির হচ্ছে ইসরাইলের ইশারায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনেস্কো ত্যাগের ঘটনা। ইউনেস্কো বিশ্বসম্প্রদায় ও বিশ্বসভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করছে। ইতিহাসের রায় ও বাস্তব সত্য অস্বীকার বা লঙ্ঘন করা করা ইউনেস্কোর মত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হয়নি বলেই তারা জেরুজালেমের উপর ইহুদিদের দাবী নাকচ করেছে এবং ইসরাইলের অধিকৃত হেবরনকে ফিলিস্তিনি জনপদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ইসরাইলের একতরফা প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের জন্য এটা অনেক বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আর এ কারণে ইউনেস্কোর বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে গোস্বা করে ইসরাইলীরা গত বছর ইউনেস্কো ত্যাগের হুমকি দিয়েছিল। তবে ট্রাম্পের মত বশংবদ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দিয়ে তারা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই ইউনেস্কো ত্যাগের দিকে নিয়ে গেল তারপর নিজেরাও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করল। ট্রাম্পের ইউনেস্কো ত্যাগের পেছনে প্রথমত: কাজ করছে ইউনেস্কোকে নিজেদের সুবিধামত পরিচালিত করতে না পারা, দ্বিতীয়ত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউনেস্কোর প্রাপ্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার চাঁদা পরিশোধ না করার একটি উসিলা খোঁজা। মূলত: আশির দশক থেকেই ইউনেস্কো নিওকন প্রভাবিত মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তাদের জোরালোর প্রভাব কাটিয়ে বিশ্বের তথ্য মনোপলি এবং ফিলিস্তিন ভ‚খন্ডের লিগ্যাসির প্রশ্নে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ইউনেস্কো।

মার্কিনী ও ইসরাইলীদের ইউনেস্কো ত্যাগের মধ্য দিয়ে এটাই প্রমানীত যে, ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা নিজেদের দাবীর সপক্ষে যুক্তি প্রমাণে সক্ষম নয়। জায়নবাদের খপ্পরে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমে বিশ্বসম্প্রদায়ের সবচে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলো থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছে। এ প্রবণতাকে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের পতনের সূচনা লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র–তুরস্ক

October 25, 2017

কোহলির অজানা ১১ তথ্য

October 25, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *