তরুণদের জন্য সময়ের সেরা পেশা ফ্রিল্যান্সিং

ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কাজ করছে ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট। কেবল বাজার উপযোগী কারিকুলাম, দক্ষ প্রশিক্ষক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণেই শেষ নয়, দায়িত্ব নিয়ে সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তোলাই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির ব্রত। পথচলার দীর্ঘ ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ২০ হাজারেরও বেশি তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করেছে। যাদের অধিকাংশই আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে আউটসোর্সিং করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া লোকাল বাজারেও তাদের ভালো দখল রয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে যায়যায়দিনের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ও আইটি খাতে উদ্যোক্তা গড়ার কারিগর মো. মনির হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বেলাল মুনতাসির।বেলাল মুনতাসির

যাযাদি : পেশা হিসেবে আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং কতটা সম্ভাবনাময়?

মনির হোসেন : গত কয়েকবছরে এ খাতে আমরা বেশ সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি। বিশ্বে ফ্রিল্যান্সিংখাতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট এই তথ্য প্রকাশ করে। তাই সম্ভাবনাময় ও আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং পেশায় অনেকে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। অনেকেই খুব ভালো করছেন। আমি মনে করি, ফ্রিল্যান্সিং তরুণদের জন্য এখন সময়ের সেরা পেশা।
যাযাদি : কেন সেরা পেশা বলছেন?

মনির হোসেন : দেখুন, প্রথমেই আমাদের দেশের অবস্থান বুঝতে হবে। এখানে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত পরিবারের। তারা ভালো চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করে। পরিবারের উপর আর্থিক চাপ কমানোও তাদের বড় লক্ষ্য থাকে। তাই পড়াশোনা অবস্থায়ই তাদের আয়ের জন্য কিছু করতে হয়। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন, কি কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। এ সময় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আয়ের উৎস হিসেবে টিউশনিকে বেছে নেয়। তবে এটা অস্থায়ী এবং পরবর্তী সময়ে তার ক্যারিয়ারে কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু যারা ফ্রিল্যান্সিং করছেন, একই সঙ্গে তারা বেশ ভালো আয়ও করছেন। পরবর্তীতে এটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে দাঁড় করানোর সুযোগ পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে নিজের দক্ষতা তৈরি করতে পারছেন, যা মার্কেটপ্লেসে প্রচুর ডিমান্ডেবল। ফলে কী দাঁড়াচ্ছে? সে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠছেন। অল্প বয়স থেকেই নিজের ক্যারিয়ার নিজেই গড়তে পারছেন। পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তাহলে তরুণদের জন্য এটা সেরা বলব না কেন? এছাড়া যারা বেসরকারি চাকরি করেন কিংবা ক্যারিয়ারের মাঝপথে যাদের স্বপ্ন থেমে গেছে, প্রত্যেকেরই নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে এখানে। তবে সবচেয়ে বেশি সুযোগ নারীদের। সংসারের কাজে ব্যস্তরাও ফ্রিল্যান্সিং করতে পারেন। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা ও চেষ্টা।

যাযাদি : এ ক্ষেত্রে কোন খাতগুলো অধিক সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন?
মনির হোসেন : অনেক সেক্টর আছে। যেমন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং সাপোর্ট, রাইটিং অ্যান্ড ট্রান্সলেশন, ক্ল্যারিক্যাল অ্যান্ড ডেটা এন্ট্রি, প্রফেশনাল সার্ভিস ইত্যাদি। গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসে ক্লিপিংপাথ ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনাও অনেক বেশি। যেখানে প্রতিনিয়ত দক্ষ ইমেজ এডিটরের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়াও গ্রাফিক ডিজাইনার, ওয়েব ডিজাইনার, ওয়েব ডেভেলপার, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার, ডিজিটাল মার্কেটার, কন্টেন্ট মার্কেটার ও আর্কিটেকচারাল ভিজ্যুয়ালাইজারের রয়েছে যথেষ্ট চাহিদা।

যাযাদি : ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রসারে ক্রিয়েটিভ আইটি কি ভূমিকা রাখছে?
মনির হোসেন : আমি নিজে উদ্যোক্তা হবার আগে একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার ছিলাম। জানি, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয়তা। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- Jack of all trades, Master of none- অর্থাৎ আপনি অনেক কিছুই পারেন, জানেন, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো কাজে এক্সপার্ট নন। অথচ ইন্ডাষ্ট্রি খুঁজছে এক্সপার্ট কাউকে। লোকাল ও ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটপ্লেসও শুধু এক্সপার্টদের সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী। দক্ষ কাজের চাহিদা সব জায়গায় রয়েছে। আউটসোর্সিং করতে হলে দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যখন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের জন্য মার্কেট রিসার্চ ও অ্যানালিসিস করি, তখন দেখতে পাই, কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রিধারী অনেকে যথেষ্ট পড়াশোনা করেও ইন্ডাস্ট্রি ডিমান্ডেড কাজে দক্ষ নয়। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে, আমাদের কোর্স মডিউল এমনভাবে সাজাবো যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাদের পছন্দসই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় থেকেই আয় করা শুরু করে। এক্ষেত্রে আমরা বেসিক থেকে অ্যাডভান্সড লেভেল পর্যন্ত কোর্স ডিজাইন করি। শুরুটা করি গ্রাফিক ডিজাইন দিয়ে। আমি নিজেও যেহেতু গ্রাফিক ডিজাইনার, তাই কোর্স মডিউল এমনভাবে সাজাই, যেন কোনো শিক্ষার্থীর বুঝতে কোনো রকম অসুবিধা না হয়। মার্কেটে কী ধরনের ডিজাইন ট্রেন্ড চলছে, কোন ডিজাইন জনপ্রিয়, কালার কনসেপ্ট সবই আমরা হাতে কলমে ও প্রোজেক্ট বেজড শেখাই। এ ছাড়াও শেখাই ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন স্টাইল ও টিম ম্যানেজমেন্ট। শুধু গ্রাফিক্স ডিজাইনই নয়, একে একে আমরা শুরু করি ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, এসইও, ডিজিটাল মার্কেটিং, ইন্টেরিয়র ডিজাইনসহ অন্যান্য কোর্স। প্রতিটি কোর্সেই আমরা প্রতি মুহূর্তে ডেভেলপমেন্ট আনার চেষ্টা করি, যাতে শিক্ষার্থীরা আপডেট থাকতে পারেন।

এবার প্রশ্নের উত্তরে আসি- দেশে প্রশংসা করার মতো অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা স্বল্পকালীন ও দীর্ঘকালীন আইটি কোর্স করিয়ে থাকে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ থাকে না বললেই চলে। কিন্তু ক্রিয়েটিভ আইটি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রশিক্ষণার্থীদের হাত ছেড়ে দেয় না। প্রতি মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও গাইড লাইন দিয়ে থাকে। একজন শিক্ষার্থী যতক্ষণ পর্যন্ত না মার্কেটপ্লেসে তার অবস্থান সৃষ্টি করছে। আয় না করছে। ক্রিয়েটিভ আইটি ততক্ষণ পর্যন্ত সেই শিক্ষার্থীকে সেবা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে। ব্যক্তিগত লাভে নয়, কারো অবস্থার পরিবর্তনে আমরা বিশ্বাসী। কোনো শিক্ষার্থীর সময় শ্রম ও অর্থের যেন বিন্দুমাত্র অপচয় না হয় সেদিকটি নিশ্চিত করার দায়িত্ববোধ থেকে আমরা কাজ করি।
যাযাদি : ক্রিয়েটিভ আইটির উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো কি?

মনির হোসেন : ক্রিয়েটিভ আইটি পরিশ্রম, আন্তরিকতা, আধুনিক কারিকুলাম এবং দক্ষ-অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের সমন্বয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন ডিপার্টমেন্টের একাডেমিক পার্টনার হবার গৌরব অর্জন করেছে। এ ছাড়াও আমরা সরকারি গ্রাফিক আর্ট ইনস্টিটিউটের একাডেমিক পার্টনার, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত আরপিএল(Recognition Prior Learning Centre- RPL) সেন্টার, সরকারের আইসিটি ডিভিশন ও হাইটেক পার্কের ট্রেনিং পার্টনার। ১০টি সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট পার্টনার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জব পোর্টাল এভারজবস আমাদের শিক্ষার্থীদের জব প্লেসমেন্ট পার্টনার হয়েছে। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা এভারজবসের মাধ্যমে চাকরির আবেদন করলে প্রাধান্য পায়। এ ছাড়াও আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই পার্টনার। এতে আমাদের কোন শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা হতে চাইলে তাকে ঋণ নিতেও আমরা সহায়তা করতে পারি।
যাযাদি : অনেকে অভিযোগ করেন- দেশে দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া মার্কেটপ্লেসে কাজ করতে গিয়েও তারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

মনির হোসেন : সত্যি কথা বলতে এই অভিযোগের যথার্থতা রয়েছে। আসলে দেশে ভালো প্রফেশনাল প্ল্যাটফর্মের অভাব আছে। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে- সফল ফ্রিল্যান্সাররা নিজেদের কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, কাউকে কোনো কিছু শেখাবার সময় তাদের হয় না। এমনকি একদিনের বা কয়েক ঘণ্টার ওয়ার্কশপে তাদের এত বেশি পেমেন্ট করতে হয়, যা অনেকের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন কিছু করার উদ্যেগ নিয়েছি। যেহেতু আমি নিজেই ফ্রিল্যান্সার এবং প্রশিক্ষক, তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই আমি নিজের হাতে বেশ কিছু দক্ষ প্রশিক্ষক গড়ে তুলেছি। তারা নিজেরা মার্কেটপ্লেসে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাজের নতুন নতুন কলা কৌশল শেখাচ্ছেন। এই শিক্ষকদের যথেষ্ট পেমেন্ট করতে হয়। তবু শিক্ষার্থীদের প্রফেশনাল হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ কোয়ালিটি নিশ্চিত করাই আমাদের কাছে মূখ্য।

যাযাদি : সম্প্রতি যাত্রা হলো ক্রিয়েটিভ ই-স্কুলের। এর উদ্দেশ্য কি এবং অনলাইন শিক্ষায় এটি কেমন অবদান রাখবে?
মনির হোসেন : বিশ্বকে হাতের মধ্যে এনে দিয়েছে ইন্টারনেট। তাই দূরত্ব এড়িয়ে দেশে ও প্রবাসে যারা চাইছেন প্রফেশনাল আইটি ট্রেনিং করতে, তাদের স্কিল ডেভেলপ করতেই আমাদের এই উদ্যোগ। আর অনলাইন কিন্তু শেখার অনেক ভালো মাধ্যম। সমস্যা হচ্ছে- অনলাইনে ভালো মানের পর্যাপ্ত বাংলা টিউটোরিয়াল নেই। সে কারণে অনেক শিক্ষার্থী তার সমস্যার সঠিক সমাধান খুঁজে পায় না। অনেক সময় ক্লায়েন্টের কাজ বুঝতেও সমস্যা হয়। এই সমস্যা দূর করতে সঠিক গাইডলাইন ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রয়োজন। তাই, ঠিক যেভাবে আমরা আমাদের ইনস্টিটিউটে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি, সেই একই প্রশিক্ষণ ক্রিয়েটিভ ই-স্কুলেও দিচ্ছি। অনেকের দাবি ছিল আমরা যেন শাখা খুলি। কিন্তু সব শাখাকে নিয়ন্ত্রণ করা ও কোয়ালিটি বজায় রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সময়ের প্রয়োজনেই আমাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। তবে অনলাইন হোক কিংবা অফলাইন হোক, প্রশিক্ষণ ও কোয়ালিটির ব্যাপারে আমরা কোন কম্প্রোমাইজ করি না।

যাযাদি : ক্রিয়েটিভ আইটি নিয়ে আপনার স্বপ্ন কি?
মনির হোসেন : ক্রিয়েটিভ আইটি শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের সেরা প্রফেশনাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠবে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, সেটাই আমার স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
যাযাদি : নতুনদের জন্য কি পরামর্শ দিবেন?
মনির হোসেন : নতুনদের জন্য আমার একটাই পরামর্শ। ছোট স্বপ্ন দেখুন এবং তা আগে পূরণ করুন। ছোট ছোট স্বপ্ন বড় সাফল্যের জায়গা সৃষ্টি করে। আর নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রম করার মানসিকতা নিয়ে দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট হোন। যে কাজটি করুন তাতে নিজের সেরাটি দেয়ার চেষ্টা করুন, সাফল্য আসবেই।
যাযাদি : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মনির হোসেন : যায়যায়দিনকেও ধন্যবাদ।

কাশ্মির ইস্যুতে সংলাপে বসবে ভারত

October 25, 2017

টিপু সুলতান ছিলেন মুক্তির নায়ক- ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ

October 25, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *