দূষিত হচ্ছে ধানমণ্ডি লেক

ঢাকার রায়ের বাজারের বাসিন্দা বেসরকারি আইটি ফার্মে চাকরিজীবী। শুক্রবার বন্ধের দিন তিনি সপরিবারে চলে আসেন ধানমণ্ডি লেক এলাকায়।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় তাঁর ভালোই কাটে এই লেকের ধারে এসে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ আগে তিনি লেকের ভেতরেই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। ছিনতাইকারীরা চাকু ঠেকিয়ে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে গেছেন মানিব্যাগ-এটিএম কার্ড, হাতঘড়ি ও একটি মোবাইল সেট। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তাঁকে এটিএম কার্ড ও সিমের জন্য অনেক বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। তাঁর ভাষ্য, নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁরা আছেন তাঁরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করায় এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এ রকম ঘটনা ঘটলে লোকজন তো কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাবে না। ধানমণ্ডি লেকে আসা আরো কয়েকজন দর্শনার্থী জানালেন এ রকম কথা। তাঁদের অভিযোগ যথাযথ তদারকি আর যত্ন না নেওয়ায় লেকটির সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বেশিদিন চলতে থাকলে লোকজন আর লেকমুখী হবে না।

সরেজমিনে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর রোডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে লেকের ধার ঘেঁষে বসেছে একাধিক দোকান। কোনোটি চায়ের দোকান, কোনোটি সিগারেটের, কোনোটি ভ্রাম্যমাণ ফাস্ট ফুড আবার কোনোটিতে বিক্রি হচ্ছে পিঠা। এসব দোকানের বর্জ্য-ময়লা নষ্ট করছে লেকের পরিবেশ। লেকের পানিতে ফেলা হচ্ছে চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, বিস্কুটের খোলস। এ ছাড়া লোক সমাগম কমে এলে দোকানিরা কৌশলে ময়লা ফেলেন লেকের পানিতে।

ওই রোডে চা বিক্রেতা মো. হালিম বলেন, ‘এখানকার আনসার সহায়তা করেন। তাঁরা সহযোগিতা করেন বলেই তো ব্যবসা চালাতে পারছি। ’ লেকের পানি দূষণ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লেকের পরিবেশ যাতে ঠিক থাকে এ জন্য আমরা সবাই সচেতন! তবে কেউ কেউ গোপনে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। নিষেধ করার পরও কোনো কাজ হয় না। যাঁরা এখানে আছেন তাঁদের আরো সতর্ক হতে হবে। ’

লেকের ভেতরে ও চারপাশে হাঁটার জন্য পথ রয়েছে। এই ওয়াকওয়ের ধারে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় তা সরাসরি লেকের পানিতে গিয়ে মেশে। কয়েকজন দর্শনার্থীর অভিযোগ, স্থানীয় বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনাও এখানে ফেলা হয়।

ধানমণ্ডি ৮ নম্বরের বাসিন্দা ইমাম হোসেন বলেন, ‘লেকের আশপাশে ফাস্ট ফুডের অনেক দোকান গজিয়ে উঠেছে। এসব রেস্টুরেন্টের আবর্জনা অনেক সময় পানিতে ফেলা হয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘যাঁরা লেক পরিদর্শনে আসেন তাঁরা পানির আকর্ষণেই আসেন! কিন্তু লেকের পানিতে যদি ক্রমেই দূষণ বাড়তে থাকে, তাহলে তা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ কাড়তে পারবে না। ’

লেকের পানিতে ঘোরাফেরা করার জন্য রয়েছে ডিঙি বোট। ডিঙি বোটের টিকিট মাস্টার আজমত আলী বলেন, ‘পানিতে বড় কোনো ময়লা দেখলে আমরা সেটা সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করে ফেলি। কিন্তু ছোট ছোট ময়লা থাকলে সেগুলো পানিতে মিশে যায়। ’

ধানমণ্ডি লেকের দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি রবীন্দ্র সরোবর। গোলাকার এই সরোবরে মাঝেমধ্যে নাটক প্রদর্শনী, আবৃত্তিসহ নানা রকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশও নষ্ট হয়েছে পানের পিক, সিগারেটের খোসা, আর বাদামের খোসায়। দেখে মনে হবে, বছরের পর বছর সরোবর প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করা হয় না। রবীন্দ্র সরোবরের আশপাশে জমেছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়।

নাট্যকর্মী আজিজ গায়েন বলেন, ‘আমরা মাঝেমধ্যে এখানে আসি। বিভিন্ন অনুষ্ঠান থাকে। যখন কোনো অনুষ্ঠান হয় যার যার দায়িত্বে সরোবর প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করে নেয়। লেকের কর্মীরা তা পরিষ্কার করেন না। ’

লেকে প্রতিদিন সকালে হাঁটতে আসেন স্থানীয় প্রবীণ মিজানুর রহমান। লেকের সার্বিক পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনায় লেকের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি হলেও আশপাশের ময়লা লেকে জমা হয়। এ বিষয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। ’

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘এখানে চুরিচামারি হয়, ছিনতাইকারীর আনাগোনা আছে। নিরাপত্তায় যাঁরা আছেন তাঁরা সজাগ থাকলেই এগুলো হয় না। আর শষ্যের মধ্যে যদি ভূত থাকে—তাহলেই তো হয়েছে! তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আন্তরিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে। লেকের এলাকায় একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা যাবে। ’

সরেজমিনে লেকের উত্তর-পশ্চিমাংশে গিয়ে ঘুরে দেখা যায়, লেকের পানিতে ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে ভাঙা ইট আর মাটি ফেলে লেকের প্রস্তকে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। সেখানে দিনের পর দিন পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। এ ছাড়া লেকের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় দল বেঁধে বখাটেরা আড্ডা দেয়। ডিঙি বোট এলাকায় ব্রিজের সিঁড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উঠতি বয়সী কয়েকজন বখাটে তরুণ নারী পথচারীদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করছে। কেউ কেউ শিস বাজাচ্ছে। লেকের অপর অংশে সাম্পান রেস্টুরেন্ট এলাকায়ও দেখা যায় কয়েকজন বখাটের জটলা।

এদের বিষয়ে ইউল্যাব ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী নুজরাত সামিয়া কেয়া বলেন, ‘লেকে অনেক মেয়ে ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়। কিন্তু কেউ তাদের কিছু বলতে পারে না। অনেক সময় প্রতিবাদ করলে হিতে বিপরীত হয়। ’ জানা যায়. ধানমণ্ডি লেকে মোট ১০ জন কর্মী রয়েছে। তাঁদের কাজ হলো লেকের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখা ও নজরদারি করা। এর মধ্যে ছয়জন নারী, চারজন পুরুষ। আলাপকালে নিরাপত্তাকর্মী মর্জিনা বলেন, ‘আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। কোথাও কোনো সমস্যা চোখে পড়লে আমরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করি। ’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুরুষ কর্মী বলেন, ‘আমাদের এখানে লোকজন কম। একদিক সামাল দিই তো আরেক দিকে ঝামেলা বাধে। অল্প লোক দিয়ে এত বড় লেক পাহারা দেওয়া সম্ভব না। সরকার যদি লেকের গুরুত্ব না বোঝে, তাহলে পাবলিক এটার মূল্য কী বুঝবে?’

চীনকে দমাতে একজোট হচ্ছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র!

October 26, 2017

বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে বোল্ট!

October 26, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *