ঐক্যের ডাক সাবেকদের

মানুষের পৃথিবীতে বিভাজন নতুন নয়। সেই আদিকাল থেকে গোত্র, বর্ণ কিংবা লৈঙ্গিক পরিচয় বিচারে মানুষ বিভাজন রেখা টেনেছে। কিন্তু এর বিপরীতে আবার প্রবৃত্তিগত ঐক্যের আকাঙ্ক্ষাও মানুষের মধ্যে অক্ষুণ্ন থেকেছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় প্রত্যক্ষ উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বকাঠামোয় আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের পথে ঐক্যের কিছু সাধারণ ক্ষেত্র খুঁজে বের করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ ঐক্য ধারণাও যে সীমাবদ্ধ, তা প্রতিটি সীমান্ত দেয়ালের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান। মন্দের ভালো হলেও কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভাজনের রাজনীতি এখনকার বাস্তবতায় আর প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর থেকে এ অপ্রাসঙ্গিক কাজটিই করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার বিপরীতে একটি শক্তিশালী বার্তা নিয়ে সাবেক পাঁচ জীবিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন সম্প্রতি।

আমেরিকার উপকূলে এ বছর একের পর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ে ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দাঁড়াতে ২১ অক্টোবর টেক্সাসে আয়োজন করা হয় এক কনসার্টের, যেখানে মঞ্চ ভাগ করে নেন আমেরিকার পাঁচ সাবেক জীবিত প্রেসিডেন্টের সবাই। আমেরিকায় কোনো অনুষ্ঠানমঞ্চে একসঙ্গে সব সাবেক প্রেসিডেন্টের জড়ো হওয়া বিরল এক ঘটনা। ঘূর্ণিঝড়-দুর্গতদের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এ কনসার্ট সেই বিরল ঘটনারই জন্ম দিল। টেক্সাসের এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের রিড অ্যারেনায় ২১ অক্টোবর আয়োজিত ‘ডিপ ফ্রম হার্ট: দ্য ওয়ান আমেরিকা আপিল’ শীর্ষক কনসার্টের মঞ্চে দাঁড়ালেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জিমি কার্টার। আর কনসার্ট থেকে ৩১ মিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহ বলছে, এ বিরল উদ্যোগ যথেষ্টই সফল।

গত সেপ্টেম্বরে হারভে আঘাত হানার পর থেকেই পাঁচ সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘ওয়ান আমেরিকা আপিল’ স্লোগান সামনে রেখে তহবিল সংগ্রহে নামেন। দৃশ্যত ঘূর্ণিঝড়-দুর্গতদের সাহায্যার্থে এই ঐক্য হলেও ট্রাম্প শাসিত বর্তমান আমেরিকান বাস্তবতায় এটি আরও গূঢ় অর্থ বহন করে। বিশেষত শুরু থেকেই, অভিবাসী-আমেরিকান, শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ এমন নানা অভিধায় ট্রাম্প যে বিভাজনের রাজনীতি চালু করেছেন, তার বিপরীতে সাবেক প্রেসিডেন্টদের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তার সঙ্গে এই যৌথ উপস্থিতির আগের সপ্তাহে এ নিয়ে দুই সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জর্জ ডব্লিউ বুশের পরোক্ষে সমালোচনার কথা মনে রাখলে তা আরও তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়।

রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও ১৯ অক্টোবর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জর্জ ডব্লিউ বুশ একই বিন্দুতে মিলে সমালোচনা করেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। রিচমন্ডে দেওয়া বক্তব্যে বারাক ওবামা বলেন, ‘শত বছর আগের বিভাজনের রাজনীতি এখন আর চলতে পারে না। আমরা এখন এমন রাজনীতি দেখছি, যাতে মনে হচ্ছে, রাজনীতি ৫০ বছর আগে ফিরে গেছে। কিন্তু এটা একুশ শতক, উনিশ শতক নয়।’

অন্যদিকে একই দিনে আরেক অনুষ্ঠানে জর্জ ডব্লিউ বুশ ধর্মান্ধতা ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য বর্জনের আহ্বান জানান। ‘জনজীবনে কুসংস্কার ও ফাঁকা আস্ফালনের’ সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় গোঁড়ামি বেড়ে গেছে। একে বিভিন্নভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে ধর্মান্ধতাকে। যেকোনো ধরনের ধর্মান্ধতা বা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য আমেরিকার ঐতিহ্যের জন্য হুমকি। আমরা দেখেছি কীভাবে জাতীয়তাবাদ আঞ্চলিকতায় রূপান্তরিত হয় এবং ভুলে গেছি আমেরিকার উন্নতির ক্ষেত্রে অভিবাসন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করলেও ঐতিহ্য ভেঙে দুই সাবেক প্রেসিডেন্টই যে বর্তমান প্রেসিডেন্টের সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন সেদিন, তা আর উল্লেখ না করলেও চলে। অবশ্য এটা অনেকটা অবধারিতই ছিল। একই সঙ্গে অবধারিত ছিল যেকোনো উপলক্ষ সামনে রেখে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট রাজনীতির বিভাজন রেখা ভেঙে সাবেক প্রেসিডেন্টদের একই মঞ্চ থেকে ঐক্যের ডাক দেওয়াটা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত আমেরিকা তাদের সামনে সে সুযোগ নিয়ে এসেছিল, যা তাঁরা দক্ষতার সঙ্গেই কাজে লাগিয়েছেন।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই বিভিন্ন বিভাজনমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। কি নারী, কি অভিবাসী, কি অশ্বেতাঙ্গ-সব ক্ষেত্রেই তিনি সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা টেনেছেন। সম্প্রতি তাঁর মন্ত্রিসভা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে তাঁর প্রশাসনের হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের বর্ণ ও লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে। গত কয়েকটি মার্কিন প্রশাসনে এত কমসংখ্যক নারী ও অশ্বেতাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব আর দেখা যায়নি।

অভিযোগটি গুরুতর নিঃসন্দেহে। কিন্তু ট্রাম্প কার্যত এই অভিযোগকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছেন না, বরং শার্লটভিলের ঘটনায় প্রকারান্তরে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের পক্ষাবলম্বন করে তিনি বর্ণবাদী তৎপরতাকে উসকে দিয়েছেন। আর অভিবাসী ইস্যুতে তাঁর অবস্থান তো মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতিতেই স্পষ্ট। পরবর্তীকালে ছয় মুসলিম দেশের ওপর যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা শরণার্থী প্রবেশে যে নিষেধাজ্ঞা, তা শুধু এর সম্প্রসারণ। মার্কিন ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্টকে নিজ দেশের মধ্যে এভাবে বিভাজন রেখা টানতে দেখা যায়নি। আর এসবই তিনি করছেন ‘মহান আমেরিকা’ গড়ার অজুহাত খাড়া করে, যার সামনে বর্ণবাদ ও দাস ব্যবসার জন্য অভিযুক্ত কনফেডারেট ভাস্কর্যগুলো দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র আদর্শ হিসেবে।

মূলত নিজ প্রশাসনের অদক্ষতা ঢাকতে ট্রাম্প এসব বিভাজনের খেলা খেলছেন, যা একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়ে তাঁকে কালিক নিষ্কৃতি দেবে বলে তিনি মনে করছেন। তাঁর এ নীতি যে নিজের প্রশাসনের অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়, তা উচ্চ পদ থেকে এরই মধ্যে পদত্যাগ করা কর্মকর্তাদের তালিকাই প্রমাণ করে। কিন্তু তারপরও তিনি এ বিভাজনের পথ থেকে সরেননি, সরবেন এমন কোনো ইঙ্গিতও তাঁর কাজে দেখা যায় না। অবশ্য মৌখিকভাবে বহুবারই ঐক্যের কথা বলেছেন তিনি। যেমনটা বলেছেন ২১ অক্টোবরও। পাঁচ সাবেক প্রেসিডেন্টের এক মঞ্চে দাঁড়ানোর দিনে ট্রাম্প নিজেও একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যেখানে তিনি এই উদ্যোগকে ‘অসাধারণ’ আখ্যা দিয়েছেন।

ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও দাবানলের মুখে আমেরিকানরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সাহসী আমেরিকানের পাশে দাঁড়াতে আমার পূর্বসূরিরা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অসাধারণ। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামাকে তাঁদের এ সহযোগিতার জন্য আমি ও মেলানিয়া গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই অসাধারণ উদ্যোগ শুধু এ কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ঈশ্বরের রাজত্বে পারস্পরিক নিবেদন ও অভিন্ন মূল্যবোধের সমন্বয়ে সত্যিই আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ একক জাতিসত্তা।’

নিজের এ বক্তব্যকে সত্য মেনে ও আত্মস্থ করে কার্যত তা প্রমাণে উদ্যোগ নিলেই ভালো করবেন ট্রাম্প। কারণ, এরই মধ্যে বীতশ্রদ্ধ অনেকে তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলেছে। বর্তমান প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ১৯ অক্টোবর ওবামা যেমনটা বলেছিলেন, ‘বিভাজনকে পুঁজি করে নির্বাচনে জিতে জনগণকে শাসন করা সম্ভব নয়।’ পূর্বসূরির এ বক্তব্যের সারাৎসার ট্রাম্প যত দ্রুত বুঝবেন, ততই মঙ্গল-কি আমেরিকা, কি বিশ্বের।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা, মেসিদের কী হবে?

October 28, 2017

এক সকালেই বিল গেটসকে হারিয়ে শীর্ষ ধনী তিনি

October 28, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *