সউদী যুবরাজ দেশকে অগ্রগতির দিকে নিচ্ছেন না নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন

সউদী আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, তিনি তার দেশটিতে মৌলিক পরিবর্তন চান। কিন্তু অনভিজ্ঞ ও আবেগ প্রবণ তরুণ যুবরাজ খুব দ্রুতই নিজেকে তার মাথার উপর বিপদ দেখতে পেতে পারেন, বলেন ডয়েচে ভেলের (ডি ডব্লিউ) নাদার আল সরাফ। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যুবরাজের এ পদক্ষেপ দেশকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন না নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন? যুবরাজ যে প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন তা হবে মধ্যপ্রাচ্যের এ যাবতকালের দেখা বৃহত্তম প্রকল্পগুলোর একটি। এটি হবে একটি প্রযুক্তি পার্ক ও নয়া নগরী যার ভবিষ্যত নাম হবে ‘নিওম।’

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদে যার ঘোষণা দিয়েছেন তা যেন সবার সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে ঃ একটি নতুন, অত্যাধুনিক নগরী, দেশের উত্তরপশ্চিমে মরুভূমির বালিতে নির্মিত এবং যেখানে যত না মানুষ থাকবে তার চেয়ে বেশী থাকবে রোবোট। এ নগরী নির্মাণের প্রদর্শিত ব্যয় ৫০০ বিলিয়ন ডলার (৪২৬ বিলিয়ন ইউরো)। যুবরাজ এ নগরীর জন্য প্রচলিত বিনিয়োগকারী খুঁজছেন না, তার বলে তিনি চাইছেন সে সব স্বপ্নদর্শীদের যারা সত্যিকার অর্থে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চায়। রিয়াদে সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাবান মানুষ বলে যাকে মনে করা হয় সেই ৩২ বছর বয়স্ক যুবরাজ সালমান অতিরক্ষণশীল সমাজকে আধুনিকায়নের অভিযাত্রায় অটল, দেশকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ভাবেও তিনি পাল্টে দিতে চাইছেন। নিওম পরিকল্পনা যেমন দৃশ্যমান করতে চাইছেন তিনি তেমনি আরেকটি ঘোষণাও তিনি দিয়েছেন একই সময়ে যা আরো

বিস্ফোরণোন্মুখী। যুবরাজ সালমান বলেছেন যে সউদী আরব ইসলামের আরো উদার পন্থায় ফিরে যাবে – সে দেশ সকল ধর্মের জন্য অধিকতর উন্মুক্ত হবে।

বিস্ময়কর নতুন সুর
এটা একটি দেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন প্রেক্ষিত যে দেশটি দীর্ঘকাল সাংস্কৃতিকভাবে অবশিষ্ট বিশ^ থেকে বিচ্ছিন্ন। দু’শতকেরও বেশী সময় ধরে সউদী আরব ওয়াহাবিবাদের উৎসভূমি যা কিনা ইসলামের অতিরক্ষণশীল ব্যাখ্যা প্রদান করে। সউদী আরব বহু দশক ধরে বিশ^ব্যাপী এ মতাদর্শ রফতানি করে আসছে। কিন্তু দেশটিতে এখন পরিবর্তন ঘটছেঃ যেমন নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার দেয়া হচ্ছে। তাচাড়া যুবরাজ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য লোহিত সাগরের তীরে একটি বিলাসবহুল পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করতে যাচ্ছেন যেখানে নারীদের বিকিনি পরার সুযোগ দেয়া হবে ্এবং বার ও রেস্তেরাঁগুলো মদ পরিবেশন করবে। এ সব বিষয় আগে অচিন্তনীয় ছিল।

নাদার বলছেন সউদী আরবকে নতুন, আরো আধুনিক করার প্রিন্স মোহাম্মদের পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, এমনকি সমালোচনাও হচ্ছে তা নিয়ে। সমালোচকরা একে বলছেন দক্ষ বিপণন কৌশল যার লক্ষ্য হচ্ছে আরো বিনিয়োগকারী আকর্ষণ। অন্যরা বলছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে যুবরাজের লড়াইয়ের পরিকল্পনা আসলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের উপর একটি আবরণ – নিজেকে ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের থেকে আড়ালে রাখাা। অতি স¤প্রতি সরকার বিরোধী বেশ কয়েকজন ধর্মীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রিন্সের সমালোচনা করা হচ্ছে। দেশকে প্রকৃত রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন সংস্কারের বাস্তবায়ন। কিন্তু সউদী আরবে এ ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সউদী আরবে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার এক সুদূর পরাহত বিষয়। প্রিন্সের প্রস্তাবিত সংস্কারের উদ্যোগ সেখানে আরেকটি সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এটা সউদী রাজপরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতার সর্বদা নিশ্চয়তা প্রদানকারী কট্টরপন্থী ও রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতাদের বিরোধিতা সৃষ্টি করার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। একটি বিষয় সউদী আরবের অতিরক্ষণশীলদের ভীষণ ভাবে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে। তা হল স¤প্রতি ধর্মীয় পুলিশের প্রভাব খর্ব করা। এ ধর্মীয় পুলিশ এতদিন কার্যত ব্যাপক ক্ষমতা সম্পন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে ভ‚মিকা পালন করেছে।

মনোভাব বদলানো যায় না
চূড়ান্তভাবে সউদী সমাজ হচ্ছে চরম রক্ষণশীল। যদি উচ্চ পর্যায় থেকে দেশকে দ্রুত উন্মুক্ত করে দেয়া আদেশ আসে তাহলে সম্ভাব্য সামাজিক অভ্যুত্থান যুবরাজ সালমানের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি তার নিওম শহরে রোবোট জনসংখ্যার সমাবেশ ঘটানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন। কিন্তু জনগণ তো রোবোট নয়। একটি সুইচ টিপে জনগণের মনোভাব পরিবর্তন করা যায় না। ইরানি বিপ্লবকে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এ অঞ্চলে সকল উগ্রবাদের উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যা তার মনোভাব সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। তিনি আসলেই সউদী আরবকে একটি সহিষ্ণু ও উন্মুক্ত দেশ হিসেবে রূপান্তর করতে দৃঢ়সংকল্প নাকি নাকি প্রধান শত্রু ইরানকে একটি ধাক্কা দিতে এ তার কথার ফুলঝুরি মাত্র!

বহু পর্যবেক্ষকই তরুণ যুবরাজকে, যাকে তার পিতা ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছেন, একজন অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্বতারোহী হিসেবে দেখছেন যিনি মারাত্মক ভুল করে বসতে পারেন যেমন তিনি করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার অল্প কিছুদিন পরই ২০১৫ সালে ইয়েমেনের হুছিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এ এমন এক যুদ্ধ যা আরব বিশে^র দরিদ্রতম দেশটিতে সামরিক অভিযানের নামে আশা পুনরুদ্ধারের বদলে এক ভয়াবহ দুর্দশার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।
অতিরিক্ত আত্মবিশাস

যুবরাজের সর্বশেষ অ্যাডভেঞ্চার পাল্টা ফল দিতে পারে। দেশকে আধুনিক করে গড়ে তোলা কিছু বড় ভবন প্রকল্পের চেয়ে আরো অনেক বেশী কিছু যা সমাপ্ত হতে নিশ্চিত ভাবে দু’ বছরেরও বেশী সময় লাগবে। তেলের উপর সউদী নির্ভরতা হ্রাসের চেষ্টা সঠিক পদক্ষেপ, কিন্তু দেশের নেতারা এ নিয়ে প্রায় ৪০ বছর ধরে কথা বলছেন এবং সকলেই তা ঘটার অপেক্ষায় আছেন। এখন এটা অস্পষ্ট যে তেলের দামের নিম্নগতি যদি অব্যাহত থাকে এবং সউদী আরবের বাজেটে যদি বিশাল গর্ত আরো বড় হতে থাকে তাহলে যুবরাজ তার প্রকল্পের অর্থ সংস্থান করতে পারবেন কিনা।

এটাও রহস্য হয়ে আছে যে যুবরাজ তাৎক্ষণিক ভাবে কি করে সউদী আরবে উগ্রবাদী চিন্তা ধ্বংস করেন। এ ব্যাপারে তার সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা নেই। এ ধরনের জঙ্গি ভাষা শুধু রাজনৈতিক ভাবে হাস্যকরই নয়, এক বড় রকমের ঔদ্ধত্যও বটে যা বিশ^ রাজনীতির সাথে খাপ খায় না।

ইনকিলাব

পপ সঙ্গীত তারকা মাইকেল জ্যাকসনের ভাই জার্মেইন জ্যাকসন যা বললেন

October 28, 2017

চালের মূল্য আরো বৃদ্ধির শঙ্কা

October 28, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *