আতঙ্কে আকিয়াবের মুসলমানেরা

একদিকে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলছেন, অন্য দিকে রোহিঙ্গাদের আরাকান ছেড়ে চলে যেতে চাপ দিচ্ছে প্রশাসন। সেখানে এখনো রোহিঙ্গাদের ওপর বিচ্ছিন্নভাবে হামলা করছে সেনাবাহিনী ও তাদের লেলিয়ে দেয়া উগ্রপন্থী রাখাইন ও মগরা। শনিবার ভোরে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পয়েন্ট দিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ও আকিয়াবের বিভিন্ন সীমান্ত বাণিজ্য ব্যবসায়ীদের সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এ দিকে গত শুক্রবার উখিয়ার আনজুমান পাড়া সীমান্তের ওপারে কুয়ানসিবং এলাকা থেকে অজ্ঞাত এক রোহিঙ্গা নারীর গলিত লাশ উদ্ধার করেছেন স্বজনেরা। সেনা সদস্যরা ওই নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। সেনা সদস্য, উগ্রপন্থী রাখাইন ও মগরা রোহিঙ্গাদের গরু-ছাগল, মহিষ লুট করছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১২ সালের আকিয়াবের দাঙ্গা-পরবর্তী আরাকানের প্রাণকেন্দ্র ম্রেবুন শহরের যেসব রোহিঙ্গাকে সরকার বাস্তুচ্যুত করে আইডিপি ক্যাম্পে বন্দী করে রেখেছে এখন তাদের দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে চাপ প্রয়োগ করছে প্রশাসন। একই সাথে ক্যাম্প ত্যাগের আগে মিয়ানমারের ভাষায় লিখিত একটি ফরম পূরণ করতে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করা হচ্ছে। ফরমটিতে বিনা প্ররোচনায় ও স্বেচ্ছায় ক্যাম্প ত্যাগ করার কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। এই ক্যাম্পের সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে যেমন বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না, তেমনি বিদেশী কোনো দাতব্য সংস্থাকেও ক্যাম্পে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে খাদ্য সঙ্কটে পড়েছেন ক্যাম্পটির রোহিঙ্গারা।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের (আরআই) ১০ জনের একটি দল বৃহস্পতিবার আইডিপি ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে গেলে বাধা দেয় স্থানীয় রাখাইনরা। এ সময় প্রশাসনের লোকজন উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। পরে ফিরে যেতে বাধ্য হন এনজিও কর্মীরা।

এ পরিস্থিতিতে সু চির সরকার বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু তাতে ভরসা রাখতে পারছেন না পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। আস্থা রাখতে না পারায় বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গার ঢল থামছে না। প্রতিদিনই হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছেন। অপেক্ষায় আছেন আরো কয়েক হাজার। শনিবার ভোরে ও শুক্রবার রাতেও রোহিঙ্গারা বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন। রোহিঙ্গাবাহী ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো নিরাপদে ভিড়ছে সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী সৈকতে।

সম্প্রতি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, রাখাইনে সহিংসতা এখনো বন্ধ হয়নি। গত শুক্রবার রাতে হারিয়াখালী সীমান্ত দিয়ে আসা মংডু গোদাম পাড়ার বাসিন্দা রোহিঙ্গা আবুল হোসেন বলেন, আরাকানের কিছু গ্রামে সেনারা হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে না এ কথা সত্য কিন্তু এসব গ্রামের রোহিঙ্গাদের বাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছে না এবং দোকানপাটও বন্ধ রাখা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাখাইনে তীব্র খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

বুচিডংয়ের সিন্দিপ্রাং থেকে আসা বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গা নারী সোলেমা খাতুন বলেন, সেনা ও মগরা আমার স্বামীকে পুড়িয়ে মেরেছে এবং চার সন্তানকে গুলি করে হত্যা করেছে। পাঁচ স্বজন হারানোর শোক বুকে চেপে সেখানে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেনা ও মগরা এখনো নির্যাতন করছে। তাই বড় ছেলের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি, এখানে ভাত না পাই তবু প্রাণে বাঁচা যায়।

আরেক রোহিঙ্গা নারী মাজুমা খাতুন বলেন, সেনারা আমাদের হুগগাটা (চেয়ারম্যান)-দের ডেকে নিয়ে প্রতি গ্রাম থেকে সুন্দরী যুবতীদের ক্যাম্পে পাঠানোর নির্দেশ দিচ্ছে। না পাঠালে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে বলে হুমকি দিচ্ছে। এ ভয়ে আমরা পালিয়ে এসেছি।

রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে আরাকানের নাইক্ষ্যংদিয়া, ঢংখালী ও কুইন্না পাড়া সীমান্তে এখনো হাজার হাজার রোহিঙ্গা তাঁবু করে অপেক্ষায় রয়েছেন। সীমান্ত পরিস্থিতি খানিকটা প্রতিকূল হওয়ায় তারা সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা টিলারসনের

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ভারত সফরকালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশটির নেতাদের সাথে কথা বলেছেন। শুক্রবার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস জি ওয়েলস সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তিনি এ সফরে টিলারসনের সঙ্গী ছিলেন। পিটিআই এ খবর দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ওয়েলস জানান, টিলারসনের সফরকালে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী বিশাল স্রোতের সম্ভাব্য অস্থিতিশীল ফলাফল নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আমরা ভাগাভাগি করে নিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে রাখাইনের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মিয়ানমার সরকারের দায়িত্ব।

এ দিকে শুক্রবার কয়েকজন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে টিলারসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সময় তারা মিয়ানমারকে আবারো ধর্মীয় স্বাধীনতা ইস্যুতে ‘বিশেষভাবে উদ্বেগজনক রাষ্ট্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানান। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে তারা বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী শত শত রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা ও অসংখ্য মানুষকে বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থীর জীবনযাপনে বাধ্য করেছে। একটা মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যাকে জাতিসঙ্ঘ জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, আমরা মিয়ানমারকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ইস্যুতে ‘বিশেষভাবে উদ্বেগজনক রাষ্ট্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার পক্ষপাতী। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণে আপনার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। চিঠিতে স্বাক্ষর করা সিনেটররা হলেন নিউ জার্সির বব মেনেন্ডেজ, ফ্লোরিডার মার্কো রুবিও, ডেলাওয়্যারের ক্রিস কুন্স, ইন্ডিয়ানার টড ইয়াং, ওরেগনের জেফ মার্কলে ও ওকলাহোমার জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড।

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা হবে : মার্কিন রাষ্ট্রদূত

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা হবে উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, বাংলাদেশের মতো আমরাও মনে করি সমস্যাটির সমাধান মিয়ানমারেই রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকার ও সামরিক কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ ব্যাপারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন মিয়ানমার সশস্ত্রবাহিনীর প্রধানের সাথে কথা বলেছেন।
রাষ্ট্রদূত জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চায় রোহিঙ্গারা মর্যাদার সাথে তাদের জন্মভূমি রাখাইন রাজ্যে বাস করুক। গতকাল রাজধানীতে যক্ষ্মাসংক্রান্ত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সই হওয়া ১৯৯২ সালের যৌথ ঘোষণার আলোকে সংশোধিত চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে পারে। অবশ্য ১৯৯২ সালের পর থেকে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তবু আলোচনা শুরুর জন্য যৌথ ঘোষণাটি একটি ভালো ভিত্তি। দুই প্রতিবেশী দেশ আলোচনা করে প্রত্যাবাসনের শর্তগুলো চূড়ান্ত করবে।

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বার্নিকাট বলেন, চলতি মাসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মন্ত্রীপর্যায়ের সফর বিনিময় হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দুই দেশ যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে কাজ করছে।
গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক টিন্ট সোয়ের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য চুক্তির একটি খসড়া হস্তান্তর করে। ১৯৯২ সালের যৌথ ঘোষণাকে ভিত্তি ধরে কিছু সংশোধনী এনে এই খসড়া তৈরি করা হয়েছে। খসড়া চুক্তির ব্যাপারে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি।

সংশোধনীর মাধ্যমে মূলত রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। কেননা ২৫ আগস্টের পর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত প্রায় অর্ধেক গ্রাম জ্বাালিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কারণে তাদের অনেক কাগজপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকেই শুধু প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার জন্য জাতিসঙ্ঘ সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা চেয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে মিয়ানমারের।

আজকের তুরস্ক ও প্রেসিডেন্ট এরদোগান

October 29, 2017

জেনে রাখুন: রোহিঙ্গা ইতিহাস নিয়ে সাতটি বিচিত্র তথ্য

October 29, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *