বৈশ্বিক চাপে একটুও বদলায়নি মিয়ানমার

মাত্র দুই মাসের নিধনযজ্ঞে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়নের পর এবার সেখান থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। ঠিক কতজন সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে সে বিষয়ে মিয়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে মিয়ানমারের ইরাবতী পত্রিকা জানায়, দুই শ সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে সেখানে এখনো মোতায়েন আছে অন্তত এক শ সেনা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে ফোন করে রাখাইন পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ ও কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী কিছু সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। রেক্স

টিলারসন মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীকে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা থামাতে সরকারকে সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি রাখাইন রাজ্যে গণমাধ্যম ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তদন্তে জাতিসংঘকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শুরুর দুই মাস চার দিন পর সেখান থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাটি আসে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের ফেসবুক পেজে। সেখানে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) একটি সামরিক ব্যারাকসহ ৩০টি সীমান্তচৌকিতে হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরসার বিরূদ্ধে নির্মূল অভিযান শুরু করে। ৫ সেপ্টেম্বরের পর অভিযান কমানো হয় বলে দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগস্টের মধ্যে মংডু জেলা সংঘাতমুক্ত হয়েছিল। মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সেখান থেকে সরিয়ে এনে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিতুয়েতে সহযোগী বাহিনীর ভূমিকায় রাখা হয়েছে। ঠিক কতসংখ্যক সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে সে বিষয়ে বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি।
তবে বিবৃতির পাশাপাশি ফেসবুক পেজে চারটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নৌবাহিনীর একটি জাহাজে করে এবং সামরিক ট্রাকে করে সেনা সদস্যদের সিতুয়েতে আসার ছবি রয়েছে।

তবে মিয়ানমারের এসব উদ্যোগ এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাসে আর আস্থা রাখছে না বাংলাদেশ। মিয়ানমারের এসব উদ্যোগকে লোক-দেখানো ও সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশি কর্মকর্তারা। পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর যে আর আস্থা রাখতে পারছে না তা এরই মধ্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের কোনো ফাঁদে বাংলাদেশ পা দেবে না। তিনি মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির আহ্বান জানান।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন বলেছেন, খুব শিগগির এই সংকটের সমাধান হবে না। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ থেকে পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে চায়। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ এই ইস্যুতে চীনের সমর্থন পায়নি।

চীন চায় মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করুক। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ বুঝতে পারছে যে দ্বিপক্ষীয়ভাবে এই সংকটের সমাধান আসবে না। এ জন্য বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে আসছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার যে ছলচাতুরী করছে এবং তাদের আশ্বাসে যে আস্থা রাখা যায় না তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নেপিডো সফরে। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগে দুই দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বিশদ আলোচনা শেষে ১০ দফা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে একমত হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও তা গৃহীত হয়। ওই সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে। কিন্তু মিয়ানমার বাংলাদেশের অজ্ঞাতে ও সম্মতি ছাড়াই কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে একতরফাভাবে ‘যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করে। অর্থাৎ আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে তারা আন্তরিক নয়।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ (তৎকালীন বেঙ্গল থেকে যাওয়া) বলবে না—বাংলাদেশের কাছে এমন অঙ্গীকার করলেও বিভিন্ন সময় দেশটির সামরিক ও বেসামরিক নেতারা এটি মানছেন না। গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নেপিডো সফরের সময়ও মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ বলে অভিহিত করলে বাংলাদেশ পাল্টা যুক্তি দেয়।

বাংলাদেশি এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ বরাবরই মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সমস্যা দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে চেয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার বৈঠকে বসে বলে এক কথা, আর বৈঠক থেকে বের হওয়ার পরপরই বলে অন্য কথা।

ওই কূটনীতিক বলেন, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ও অক্টোবর মাসে ভারতের গোয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবারই রোহিঙ্গা সমস্যার কথা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। অং সান সু চি বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় নতুন এসেছেন। সমস্যা সমাধানে তাঁর আরো সময় প্রয়োজন।

মিয়ানমারের ওই বক্তব্য প্রসঙ্গে ওই কূটনীতিক হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ অনেক সময় দিয়েছে। আর সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বিষয়টিকে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, জাতিসংঘের কাছে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ মনে করে, জাতিসংঘই মিয়ানমারকে ‘শায়েস্তা’ করতে পারে।

জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর সু চির গত কয়েক বছরে অন্তত পাঁচবার দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রতিবারই রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ তুলেছে বাংলাদেশ। সমস্যা সমাধান ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক অন্তত পাঁচবার মিয়ানমার সফর করেছেন। এর মধ্যে গত বছরের জুন মাসে তিনি প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা দূত হিসেবে মিয়ানমার গেছেন। এসব সফরে মিয়ানমার ইতিবাচক কথা বললেও পরে তা রাখেনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের বৈঠকে মিয়ানমার এর আগে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে ‘যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল। কিন্তু বৈঠকের পর তা বাস্তবায়নে আর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো পথে হেঁটেছে। এবারও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে ‘যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের কথা বলেছে। মিয়ানমার এটি আদৌ করবে কি না সে বিষয়ে জোরালো সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপজ্জনক ভিলিয়ার্সকে থামালেন সাইফ উদ্দিন

October 29, 2017

ব্রিটেনে প্রবাসী আলেমদের ধর্মীয় কার্যক্রম

October 29, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *