ব্রিটেনে প্রবাসী আলেমদের ধর্মীয় কার্যক্রম

ব্রিটেনে আসার পর থেকে নিজের কানে অনেক প্রবীণ মুরব্বিকে বলতে শুনেছি, ‘এ দেশে পাড়ি দেওয়ার পর বহু বছর এভাবে কেটেছে যে জুমাবার, রমজান, ঈদ ইত্যাদি ইসলামী আচার-অনুষ্ঠানের কোনো খোঁজ-খবর আমাদের ছিল না! নামাজ পড়ানোর মতো লোক পাওয়া যেত না। শিশুদের কলেমা-নামাজ শেখানোর জন্যও কেউ ছিল না।
কিন্তু আস্তে আস্তে যখন আলেমরা আসতে শুরু করলেন, তখন থেকে এ দেশে মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। আমাদের ও নতুন প্রজন্মের ঈমান-আমল রক্ষা করার ব্যবস্থা হয়। ’

গত ১১ আগস্ট ২০১৭ লন্ডনের এক প্রগ্রামে পাকিস্তানের প্রধান মুফতি আল্লামা রাফি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে মন্তব্য করেন, ‘দুনিয়ার বহু দেশে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। সাউথ আফ্রিকা ও ব্রিটেনের মতো আর কোনো অমুসলিম দেশে এত ব্যাপক দ্বিনের কাজ হতে আমি দেখিনি। ’ কানাডা প্রবাসী কিছু ভাই গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে লন্ডন এসে এখানকার সার্বিক পরিস্থিতি দেখে অভিব্যক্তি পেশ করেন—‘এ তো মনে হয় আমরা কোনো মুসলিম দেশে বেড়াতে এসেছি। এখানে আপনারা যে পরিবেশ তৈরি করেছেন, অপ্রিয় হলেও সত্য, আজকাল অনেক মুসলিম দেশেও এমন পরিবেশ পাওয়া দুষ্কর। এখানকার নারীরা যেভাবে হিজাব ও নিকাব পরে ঘর থেকে বের হন, দেখে ভিন্ন রকম এক অনুভূতির সৃষ্টি হলো। ’ ফ্রান্স, ইতালি বা ইউরোপের অন্যান্য দেশে অবস্থানরত প্রচুর মুসলমান আজকাল ব্রিটেনে পাড়ি জমাচ্ছেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলেন, ‘ওসব দেশে শিশুদের ইসলামী শিক্ষার তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই।

আলহামদুলিল্লাহ! বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষত ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে আসা আলেমরা দ্বিন প্রচার ও সংরক্ষণের কাজে অসাধারণ ভূমিকা রেখে চলছেন। বর্তমানে ব্রিটেনে প্রায় দুই হাজার মসজিদ রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলেমদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে। এ জন্য বেশির ভাগ মসজিদের পরিচালনা কমিটিতে আলেমদের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়। আর মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিনদের দ্বিনি কাজের ফিরিস্তি তো অনেক দীর্ঘ। ইমামতির পাশাপাশি এখানকার প্রায় প্রতিটি মসজিদে সাধারণ মুসল্লিদের জন্য রয়েছে প্রাত্যহিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি। যেমন—তাফসিরুল কোরআন, দরসে হাদিস, দরসে ফিকহ প্রভৃতি। তা ছাড়া আলেমদের উদ্যোগে বিভিন্ন সময় আয়োজিত বিষয়ভিত্তিক সেমিনার বা আলোচনা সভার কথাগুলো তো বলাই বাহুল্য।

বিবিসি নিউজের তথ্যানুযায়ী ব্রিটেনে দুই হাজারেরও বেশি মাদরাসা রয়েছে। তবে সব মাদরাসা ফুল টাইম নয়। কিছু মাদরাসা আছে স্কুল শেষে বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত শিশুদের ইসলামী শিক্ষার জন্য। এগুলো ‘ইভনিং মাদরাসা’ নামে পরিচিত। কিছু আছে সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিন—শনি ও রবিবারের জন্য। এগুলো ‘উইকেন্ড মাদরাসা’ হিসেবে প্রসিদ্ধ। সাধারণত এ দুই ধরনের মাদরাসায় শুধু প্রয়োজনীয় দ্বিনি শিক্ষা দেওয়া হয়। তবে কিছু আছে ব্যতিক্রম। কোনো কোনো ইভনিং মাদরাসায় হাদিস পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আর আমাদের উপমহাদেশের দেওবন্দি বা কওমি শিক্ষাধারার অনুসরণেও এখানে বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী লন্ডন ছাড়া ব্রিটেনের অন্যান্য শহর যেমন—বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ব্লাকবোর্ন, ব্যারি, ডিউজব্যারি, লেস্টার, কেন্ট ইত্যাদি অঞ্চলে একাধিক দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা গড়ে উঠেছে। এসব মাদরাসা থেকে প্রতিবছর শতাধিক আলেম বের হচ্ছেন। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ইউনিভার্সিটিতেও পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মসজিদ-মাদরাসায় চাকরি করা ছাড়াও অন্যান্য সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ করছেন। সে জন্য কর্মসংস্থানের যেমন কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে না, তেমনই ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে সমাজে ভালো একটি মেসেজ প্রচারিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, ছেলেদের যেমন মাদরাসা রয়েছে, তেমনি মেয়েদের জন্যও একাধিক পৃথক দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা রয়েছে। সেগুলোও ব্রিটেনে নিয়মিত সুনাম কুড়িয়ে যাচ্ছে।

আরো খুশির সংবাদ হলো, আলেমসমাজ এ দেশে অনেক ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, ব্রিটেনে ১২৬টি ইসলামিক স্কুল রয়েছে। তার মধ্যে শুধু আটটি স্কুল সরকারি সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। সবগুলো ইসলামিক স্কুল আলেমদের কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত না হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যকই তাঁদের দ্বারা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। মজার ব্যাপার হলো, ফলাফলের বিবেচনায় কোনো কোনো বছর সাধারণ স্কুলের চেয়ে ইসলামিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে। এতে অনেক চমক সৃষ্টি হচ্ছে।

আলেমসমাজ মসজিদ, মাদরাসা ও ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের উপযোগী প্রচুর বই-পুস্তকও ইংরেজি ভাষায় রচনা করে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ‘সাফার একাডেমি’ কর্তৃক প্রণীত সিলেবাস, ‘আন নাসিহাহ’ ও ‘আজহার একাডেমি’র বইগুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছে। বিজ্ঞ আলেমদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এখানকার শিক্ষা সমাপনকারী তরুণ আলেমরা এসব বই রচনা ও সংকলনের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে আরবি, উর্দু, বাংলা ভাষায় রচিত মূল্যবান বহু ধর্মীয় গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের কাজও পুরোদমে চলছে।

১৯৮৫ সালে ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পৃথক ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ চালু হয় আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে। তিনিই ছিলেন ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান।

অমুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় ব্রিটেনে মুসলমানদের জন্য হালাল-হারাম তফাত করা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষত গোশত ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে। ব্যক্তিগত বা সীমিত পরিসরে এ বিষয়ে কিছু কাজ হলেও সামগ্রিকভাবে কোনো উদ্যোগ প্রথমে নেওয়া হয়নি। অবশেষে ২০০৩ সালে গুজরাটি আলেম শায়খ মুহাম্মদ বিন খলিফার তত্ত্বাবধানে হেইচ এমসি বা হালাল মনিটরিং কমিটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বহু আলেম কাজ করছেন। তাঁরা গোটা ব্রিটেনে মুসলমানদের জন্য হালাল-হারাম নির্ণয় ও দোকানপাটে হালাল গোশত নিশ্চিতকরণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে এর চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শায়খ ইউনুস দুধওয়ালা।

আধুনিক বিশ্বে ইলেকট্রনিক মিডিয়া হলো ইসলাম প্রচারের ফলপ্রসূ একটি মাধ্যম। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের আলেমসমাজ কিছুদূর এগোতে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে আলেমদের নিয়মিত অনেক প্রগ্রাম সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। মাওলানা ইমাম কাসিম হাফিজাহুল্লাহর ‘ইকরা টিভি’ মিডিয়া জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটি সম্পূর্ণ ইসলামিক একটি চ্যানেল। এখানে শুধু ইসলামিক প্রগ্রাম সম্প্রচার করা হয়। তাঁর এই টিভির পৃথক দুটি চ্যানেল ও স্টুডিও রয়েছে। স্কাই চ্যানেল ৮১৯ হলো ইকরা টিভি উর্দু ও ৮২৫ হলো ইকরা টিভি বাংলা।

বলা বাহুল্য, দ্বিনি কাজের পাশাপাশি আলেমরা মানবতাবাদী অনেক কাজেও অংশগ্রহণ করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গরিব-দুঃখী, অসহায়, নিরাশ্রয়, শরণার্থীদের জন্য আর্থিকভাবে সহায়তা করার স্বার্থে একাধিক চ্যারিটি বা দাতা সংস্থা আলেমদের হাত ধরে জন্ম লাভ করেছে। এ ক্ষেত্রে ‘আল খায়র ফাউন্ডেশন’, ‘ইউনিটি ওয়েলফেয়ার’, ‘উম্মাহ ওয়েলফেয়ার’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

ব্রিটেনে ইসলাম প্রচার ও সংরক্ষণের মহান দায়িত্ব আদায়ে তাবলিগ জামাতের অবদান অনস্বীকার্য। হাফেজ পাটেল সাহেব (রহ.)-এর অবিরাম প্রচেষ্টার ফলে ব্রিটেনের ডিউজব্যারিতে তাবলিগের সুবিশাল মারকাজ নির্মিত হয়। মারকাজের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত মানসম্মত একটি মাদরাসাও পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে এখানকার অমুসলিম জনগণের কাছেও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য নিয়মতান্ত্রিক কাজ চলছে। আলহামদুলিল্লাহ! অনেক মানুষ ইসলামের সত্যতা ও সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পেরে মুসলমান হচ্ছেন। এসংক্রান্ত বহু সংবাদ মিডিয়ায়ও প্রচারিত হয়ে থাকে।

সারকথা, আলেমসমাজের বহুমুখী ধর্মীয় কর্মতৎপরতার ফলে ব্রিটেনের মতো বহুজাতিক পরিবেশে মুসলমানরা নিজ পরিচয় আঁকড়ে ধরে রাখতে পারছে। আন্তর্জাতিকভাবে গোটা মুসলিম বিশ্বে এই কর্মযজ্ঞ প্রভাব ফেলবে বলে আমরা মনে করি। অবশ্য এমন অবাধ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই ধারা অব্যাহত থাকুক, সেই প্রত্যাশা।

বৈশ্বিক চাপে একটুও বদলায়নি মিয়ানমার

October 29, 2017

খালেদা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন: কাদের

October 29, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *