খালেদা বললেন, হামলায় আমি থামব না


চট্টগ্রাম ছেড়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে খালেদার গাড়িবহরকে স্বাগত জানায় দলীয় নেতাকর্মীসহ উত্সুক জনতা। গতকাল সকালে ফিশারিঘাট এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, হামলা-মামলার শিকার হলেও তিনি জনগণের দাবি পূরণে কাজ করে যাবেন। গত শনিবার ফেনীতে নিজ গাড়িবহরে হামলার পর এমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।

শনিবার হামলার পরপরই বেগম জিয়াকে ঘটনার খবর দেওয়া হলে তিনি ওই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গতকাল রবিবার সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও নিরাপদেই গাড়িবহর কক্সবাজার পৌঁছে। আজ খালেদা জিয়া কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র দেখবেন ও ত্রাণ বিতরণ করবেন।

দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি জেনেছেন, শনিবার গাড়িবহরে হামলার খবর খালেদা জিয়া গাড়িতে থাকতেই পেয়েছেন। তখন তিনি ফেনী সার্কিট হাউসের খুব কাছে ছিলেন। সেখানে পৌঁছে এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন এবং বিস্মিত হয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। উপস্থিত নেতাদের তিনি বলেন, ‘সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তো বলা হয়েছিল তারা এ সফরে সব ধরনের সহায়তা করবে। এ হামলা কী তার নমুনা। আমি জানি তারা আমার কর্মসূচি নির্বিঘ্নে করতে দেবে না।

তাই বলে আমি পিছপা হব, এমনটাও নয়। জনগণের দাবি পূরণে আমি কাজ করে যাচ্ছি, যাব। ’ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেছেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার কথা শুনে বেগম জিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘হামলার খবর শোনার পর বেগম জিয়া দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ’

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় খালেদা জিয়া কক্সবাজার পৌঁছেন; সার্কিট হাউসে পৌঁছেন রাত ৮টায়। সার্কিট হাউসে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, সাবেক সংসদ সদস্য লুত্ফর রহমান কাজল, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ, কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্নাসহ জেলা নেতারা বিএনপি প্রধানকে অভ্যর্থনা জানান। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস ছেড়েছিল। কক্সবাজারমুখী ১৭০ কিলোমিটার পথে কর্ণফুলী ব্রিজ, বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, রামু প্রভৃতি স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে তাদের নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানায়। বিএনপি চেয়ারপারসন গাড়ির ভেতর থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন।

কর্ণফুলী সেতুর কাছে দক্ষিণ জেলা সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, কর্ণফুলী ব্রিজ সংলগ্ন পুরাতন ফিশারিজ মার্কেট সড়কে চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, ফিরিঙ্গি বাজারে স্থানীয় নেতা শামসুল আলম ও এরশাদ উল্লাহ এবং বোয়ালখালীতে সাবেক সংসদ সদস্য সারোয়ার জামাল নিজাম, সাতকানিয়ায় মজিবুর রহমান (চেয়ারম্যান), শেখ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, মোস্তফা আমিন, চন্দনাইশে মহসিন জিল্লুর, মঞ্জুর আলম তালুকদার, মিজানুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে নেতাকর্মী-সমর্থকরা শোডাউন করে। ফলে গাড়িবহরকে এগোতে বেশ বেগ পেতে হয়। পটিয়ায় দুটি হাতি সাজিয়ে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানান চট্টগ্রাম জেলা দক্ষিণের সহসভাপতি এনামুল হক এনামসহ নেতাকর্মীরা। পটিয়া বাজারে ছিলেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল ও তাঁর কর্মী-সমর্থকরা। সাতকানিয়ার কেরানী হাটের আগে সা চিং পুরো জেরি এবং চকরিয়ার লামাবাজারে ম্যা মা চিং ও জাবেদ রেজার নেতৃত্বে বান্দরবানের নৃগোষ্ঠীর অনেক নেতাকর্মী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানায়।

এদিকে দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার ঠাকুরদীঘি এলাকায় পৌঁছলে বেগম জিয়াকে বহনকারী গাড়ির চাকা ফেটে যায়। চাকা বদলিয়ে আধাঘণ্টা পর ফের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। আজ খালেদা জিয়া উখিয়ার বালুখালী, বোয়ালমারা ও জামতলী এলাকায় রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণ বিতরণ এবং ড্যাব স্থাপিত মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন বলে জানা যায়। বিএনপির পক্ষ থেকে আজ ৪৫ ট্রাক খাদ্যসহ ত্রাণসামগ্রী সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম।

‘হামলাকারীরা চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ : আহত সাংবাদিকদের হোটেলে দেখতে গিয়ে গতকাল সকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হামলাকারীরা সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ অথবা যুবলীগের ক্যাডার। ’ গণমাধ্যমে আসা ছবি ও ভিডিওর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের আইডেনটিটি এসে গেছে। তারা চিহ্নিত। সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করা। আপনাদের (গণমাধ্যম) ওপর আক্রমণ, ম্যাডামের ওপর আক্রমণ হলো, আমার ওপরও আক্রমণ হয়েছিল—তাহলে তো আর কিছুই বাকি থাকল না। ’ পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোটামুটি ভালো কাজ করেছে। কিন্তু যখন হামলা হলো তারা দাঁড়িয়ে ছিল। ’ এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, ত্রাণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়া কক্সবাজার যাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ বলেছে, নিজের কোন্দলে এই আক্রমণ হয়েছে—এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, ‘আপনি সত্যকে যদি অস্বীকার করেন এটা হচ্ছে ক্রাইম। ডিফেন্ড করার অর্থ হচ্ছে যে তারা সন্ত্রাসকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, সন্ত্রাসকে লালন করছে। ’

শনিবার ঢাকা থেকে সড়কপথে চট্টগ্রামে আসেন খালেদা জিয়া। পথে ফেনীতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা হয়। এ সময় ৩০টির মতো গাড়ি ভাঙচুর এবং কয়েকজন সাংবাদিককে মারধর করা হয়।

‘কাদের দায়ী’—রিজভী : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, বিএনপি নেত্রীর গাড়িবহরে হামলার নেপথ্য নায়ক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বিশৃঙ্খলা তৈরির লক্ষ্যেই খালেদা সড়কপথে গেছেন—আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার এমন মন্তব্যের বিষয়ে রিজভী বলেন, ‘সড়কপথ সবচেয়ে নিরাপদ পথ। সড়কপথে ওবায়দুল কাদের সাহেবরা যান না? তাঁর নেত্রী যান না? হাজার হাজার দৃষ্টান্ত আছে। ’ তিনি বলেন, ‘পথ দিয়েই মানুষ যায়। খাল-বিল দিয়ে যায় না। ’ আওয়ামী লীগকে ‘গভীর ষড়যন্ত্রকারী’ উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘জনদৃষ্টিকে অন্যদিকে সরানোর জন্য এসব (সড়কপথ) কথা বলা হচ্ছে। ’

বিভিন্ন মহলের নিন্দা : গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আ স ম রব, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এ ধরনের হামলা অপরাজনীতি, গণতান্ত্রিক আচরণবিরোধী এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে এক ধরনের অশনিসংকেত। হামলার ঘটনাকে আমলে নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতিও তাঁরা আহ্বান জানান।

এদিকে পৃথক বিবৃতিতে এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। অলি আহমেদ বলেন, এ হামলা প্রমাণ করে দেশে স্বৈরতন্ত্র চলছে। ঘটনাটিকে গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে কাদের সিদ্দিকী অবিলম্বে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। এদিকে জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা পৃথক বিবৃতিতে হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের শাস্তি দাবি করেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গাজী মাজহারুল আনোয়ার, চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জল, ড. মামুন আহমেদ, চিত্রনায়ক হেলাল খান বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

‘ভাইরাস’ দেখছেন সাকিব

October 30, 2017

রিয়ালকে হারিয়েই ‘স্বাধীনতা’র প্রথম স্বাদ কাতালানদের!

October 30, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *