{বুক রিভিউ } বইয়ের নামঃ সালাতের মধ্যে হাত বাঁধার বিধান

{বুক রিভিউ }
বইয়ের নামঃ সালাতের মধ্যে হাত বাঁধার বিধান
একটি হাদীসতাত্ত্বিক পর্যালোচনা

লেখকঃ ডঃ খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহিমাহুল্লাহ।

লেখক রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে এতটুকু বলবো যে, তিনি ছিলেন এ যুগের মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক, হাসি মুখের একজন আখলাক সম্পন্ন আলিম। তাঁর সম্পর্কে বলার বহু কথা আছে। যা সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তবে যেহুতু বই নিয়ে আলোচনা। তাই লেখক হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন সে দিক নিয়ে কিছু বলি। তিনি একজন বই পাগল মানুষ ছিলেন। একটু সময় পেলেই বই লেখা নিয়ে বসে যেতেন। বহু ভাষার পন্ডিত হওয়ার কারণে মুসলিম উম্মাহ তাঁর থেকে যে কী রকম খিদমাত পেয়েছে তাঁর প্রমাণ তাঁর বইগুলো। যেমন তাঁর বই আছে বাংলায়, তেমন আছে আরবীতে, তেমন আছে ইংরেজীতে। উর্দুতে বই না থাকলেও ‘আল-মাউযুআত’ বইটি নিয়ে তাঁর যে গবেষণা সেজন্য তাঁর উর্দুর উপর নির্ভর করতে হয়েছে। তাঁর বেশ কিছু অনুবাদকৃত বই আছে। তাঁর বই থেকে আদবও শিখা যায় যা সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তাঁর সম্পর্কে আরো বেশ কিছু কথা আমি বুক রিভিউয়ের ‘সার্বিক আলোচনা’ পয়েন্টে আলোচনা করেছি। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।
প্রকাশনীঃ আস সুন্নাহ পাবলিকেশন্স
মূল্যঃ ৭০ টাকা

সালাতের মধ্যে হাত বাধা বিষয়ক খুটিনাটি সকল দিকের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিয়ে এই ছোট্ট পুস্তিকাটি।

সলাতের মধ্যে রুকু, সাজদা ইত্যাদি সহকারে অগণিত বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। অথচ এসব বিষয়ে কারও মাথাব্যাথা নেই। সলাতের মধ্যে মতভেদ যুক্ত মাসয়ালার সংখ্যা মাত্র হাতে গোণা কয়েকটি। তাঁরপরও কেন জানি মুসলিম উম্মাহ মতভেদ যুক্ত মাসয়ালারগুলোর আলোচনা,পর্যালোচনা ও সমালোচনাতেই বেশি পরিতৃপ্ত হোন। বর্তমানের কিছু মুহাদ্দীস বুকে হাত বাধার হাদীসকে সহীহ বলেন। কিন্তু পূর্ববর্তী মুজতাহিদ,ফকীহ ও সালাফে সলিহীনগণ নাভীর উপরে কিংবা নিচে হাত বাধার কথা বলেছেন। আসল রহস্য কী? সেটি উদঘাটনে লেখক যে গবেষণা করেন তাঁরই ছোট্ট প্রয়াস এই বইটি। ভূমিকাতেই লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ‘এ উপলক্ষ্যে কিছু দিন হাদীসে নববী ও সাহাবী – তাবিয়ীনগণের মতামত অধ্যয়ন করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দ অনুভব করছি’। ভূমিকাতে উল্লেখিত এ অসাধারণ অনুভূতি ও গবেষণার মূল লক্ষ্য জানার পরে পাঠক বইয়ের ভিতরকার বিষয়গুলো পড়ার জন্য আগেই মনের ভিতরে প্রচন্ড আকাঙ্খা অনুভব করবেন ইনশাআল্লাহ। বইটির উদ্দেশ্য লেখক কোথায় হাত রাখবে উল্লেখ করলেও, কীভাবে রাখবে ও রুকুর পরে হাত বাধা ইত্যাদি বিষয়ও বর্ণনা করেছেন।

বইটিকে প্রথমত তিনটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে প্রথম পর্বে হাত বাধার সাধারণ নির্দেশনা, নিয়ম ও রাখার স্থান সম্পর্কিত হাদীসগুলো উলুমুল হাদীস বা হাদীস যাচাই-বাছাইয়ের মূলনীতির আলোকে আলোচনা করেছেন। দ্বিতীয় পর্বে উম্মাতের প্রথম প্রজন্মের মুহাদ্দীস ও ফকীহদের মতামত ও বুঝের আলোকে হাদীসের নির্দেশনাগুলোকে বুঝার চেষ্টা করা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে উম্মাতের মতভেদ, প্রান্তিকতা, কারণ, প্রতিকার ও এ বিষয়ে সালাফে সলিহীনের কর্মধারা আলোচনা করেছেন।

প্রথম পর্বের শুরুতেই তিনি এ হাত বাধা বিষয়ক কোন্‌ মাযহাবে বা কোন্‌ ফকীহের কী মত আছে তা উল্লেখ করেছেন।
১। হাত ঝুলিয়ে রাখা উত্তম – মালিকী মাযহাব।
২। হস্তদ্বয় গলার নিচে বা বুকের উপরিভাগে রাখা উত্তম। এ মতটি শুধুমাত্র ইবনু আব্বাস (রা) এর। পরবর্তী ফকীহদের মধ্যে কেউ এ মত গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় না।
৩। হস্তদ্বয় বুকের উপর রাখা উত্তম। আহনাফগণ বিষয়টি শাফিয়ী মাযহাবের বলে উল্লেখ করলেও এটি শাফিয়ী মাযহাবের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায় না। বরং শাফিয়ী মাযহাবের গ্রন্থগুলোতে দুটি মত পাওয়া যায়। ১। বুকের নিচে নাভীর উপরে রাখা উত্তম। ২। নাভীর নিচে রাখা উত্তম। তবে হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ মহিলাদের জন্য হস্তদ্বয় বুকে রাখার কথা বলেছেন। এ পয়েন্টের আলোচনায় পাঠকের চোখ আটকে যেতে পারে ‘ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রহ বুকে হাত বাধাকে মাকরূহ বলেছেন’ এ আলোচনায়
৪।হস্তদ্বয় বুকের নিচে নাভীর উপরে রাখা উত্তম। এটি ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদের একটি মত এবং শাফিয়ী মাযহাবের মূল মত।
৫। হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখা উত্তম। এটি হানাফী মাযহাবের মত। শাফিয়ী মাযহাবেরও এটি একটি মত। ইমাম আহমাদের প্রসিদ্ধ মত এটিই।
৬। ডান হাত বাম হাতের উপর রাখাই মূল ইবাদাত। এরপর কোথায় রাখবে বিষয়টি মুসল্লির ইচ্ছাধীন। এটিও ইমাম আহমাদের অন্য আরেকটি মত।

মতগুলো ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করার পরে হাদীসভিত্তিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। শুরুতেই মালেকী মাযহাবের হস্তদ্বয় ঝুলিয়ে রাখা মত যেহুতু অন্যদের চাইতে একটুআলাদা। তাই শুরুতেই এ বিষয়ক আলোচনা একটু লম্বা করা হয়েছে। এ আলোচনায় দেখা গেছে বেশ কয়েকজন মালিকী মাযহাবের আলিম শ্রদ্ধার সাথে ইমাম মালিকের মতকে বাদ দিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখাকে উত্তম বলেছেন।

এরপর হাত বাধার হাদীসগুলো পর্যালোচনার পূর্বে হাত বাধার হাদীসগুলোকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছেঃ
১। স্থান উল্লেখ ব্যাতিরেকে হস্তদ্বয় একত্রে রাখার নির্দেশনা।
২। হস্তদ্বয় গলার নিচে রাখার নির্দেশনা।
৩। হস্তদ্বয় বুকের উপর রাখার নির্দেশনা।
৪। হস্তদ্বয় নাভীর উপরে রাখার নির্দেশনা।
৫। হস্তদ্বয় নাভীর নিচে রাখার নির্দেশনা।

১ নং ভাগের আলোচনায় শিয়া ইমাম (!) খোমেনির আলোচনায় পাঠকগণ বেশ অবাক হতে পারেন। নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগলে যে, কত ধরণের অপব্যাক্ষার আশ্রয় মানুষ নিতে পারে সে বিষয়টি এখান থেকে জানা যাবে ইনশাআল্লাহ। পাশাপাশি এ আলোচনায় আরো দেখা যাবে যে, সার্বিক বিবেচনায় এ সম্পর্কে সহীহ, হাসান ও দ্বইফ সকল রকমেরই হাদীস রয়েছে। ২-৫ নং ভাগের আলোচনাগুলোতে খোলা মন নিয়ে দেখলে বুঝা যায় যে, প্রত্যেকটি হাদীসেই কম বেশি দূর্বলতা বিদ্যমান। হাদীস ভিত্তিক এ আলোচনায় মোট ২২ টি হাদীস আলোচিত হয়েছে। স্থান ব্যাতিরেকে নির্দেশের ১৩ টি, গলার নিচের ১ টি, বুকের উপরের ৪ টি, নাভীর উপরের ১ টি ও নাভীর নিচের ৩ টি হাদীস আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ করার মত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা হচ্ছে এই যে, বুকের উপর রাখার তিনটি হাদীসকে বর্তমান যুগের প্রয়াত প্রখ্যাত মুহাদ্দীস শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহ সার্বিক বিবেচনায় সহীহ বলতে চেয়েছেন। কিন্তু লেখক সৌদি মুহাদ্দীস শায়খ মুকবিল ও শায়খ খালিদের চমৎকার একটি গবেষণা ও পূর্ববর্তী আরো কিছু মুহাদ্দীসের কথা তুলে ধরেন। এ আলোচনার মাধ্যমে নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুল্লাহর গবেষণার ত্রুটিগুলো ধরা পড়ে। এ ছাড়াও লেখক হিজরী ১২ শতাব্দির শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল হাদী সিন্দী রহ ও শায়খ মুহাম্মাদ হায়াত সিন্দী রহ এর মত খুবই ইনসাফের সাথে নিয়ে আসেন। এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি যে, অনেক ফিকহী মাসয়ালার আলোচনায়, বিশেষত বুকে হাত বাধার মাসয়ালায় অনেককে দেখা যায় যে, হাদীস উল্লেখ ও আলিমদের মতামত উল্লেখে ইনসাফ বজায় রাখতে পারেন না। এখানে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, লেখক সত্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তবে তা কোন মতের সাথে লুকোচুরি করে নয়! আরেকটি বিষয় হচ্ছে, লেখক আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহিমাহুল্লাহর একটি চমৎকার বৈশিষ্ট হচ্ছে যে, তিনি নিজের মত উল্লেখ না করে আলিমদের মত উল্লেখ করে করে একটি বিষয় খোলাসা করার চেষ্টা করেন। এরপর নাভীর নিচে হাত বাধা সম্পর্কিত মুসান্নাফে ইবনু আবী শায়বাহর হাদীসটির কথা না বললেই নয়। এ হাদীসটির সনদের সকল রাবীগণ সিকাহ। তবে সমস্যা রয়েছে অন্য জায়গায় সেটি হচ্ছে। আল-মুসান্নাফ গ্রন্থের দুটি পান্ডুলিপিতে এ হাদীসটি রয়েছে, আবার চারটি পান্ডুলিপিতে এ হাদীসটি নেই। সার্বিক বিবেচনায় এ হাদীসটিকেও সহীহ বলা যায় না।

এরপর আমরা বইয়ের দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় আসি। এখানে পূর্বের অধ্যায়ের হাদীসের পর্যালোচনার রেশ ধরে উম্মাতের প্রথম প্রজন্মের মুহাদ্দীস ও ফকীহদের মতামত ও বুঝের আলোকে হাদীসের নির্দেশনাগুলোকে বুঝার চেষ্টা করা হয়েছে। এ অধ্যায়ে প্রথমে আলোচনা করা হয়েছে পূর্ববর্তী অধ্যায়ের হাদীসগুলোর সাংখ্যিক পরিসংখ্যান। এর ভিতরে লেখক ‘হস্তদ্বয় রাখা ও ধরা’ ও ‘হস্তদ্বয়ের অবস্থান’ এ দুটি পয়েন্টে সংক্ষিপ্ত আলোনা করেছেন। এরপর তিনি সহীহ-হাসান হাদীসগুলোর ফিকহী নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখানে ‘হস্তদ্বয় রাখার পদ্ধতি’ ও ‘হস্তদ্বয় রাখার স্থান’ এ দুটি পয়েন্ট আলোচিত হয়েছে। লেখক ‘হস্তদ্বয় রাখার স্থান’ পয়েন্টটি আবার ‘সালাতের মৌলিক বিষয় নয়’, ‘আপত্তি-সন্তুষ্টিতে সুন্নাতের ব্যতিক্রম’, ‘হস্তদ্বয়ের অবস্থান বিষয়ক কোন হাদীসই সহীহ নয়’, ‘সহীহ হাদীসের নির্দেশনায় হাত বাঁধার স্থান বিবেচ্য নয়’ ও ‘হাত বাঁধা বনাম হাত তোলা’ এ পাঁচটি পয়েন্টে আলোচনা করেছেন।

এরপর লেখক এ বইয়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় একটি দিকে মনোনিবেশ করেছেন। সেটি হচ্ছে মুহাদ্দীস ফকীহগণের বক্তব্য বিশ্লেষণ। এখানে বেশ কয়েকজন এমন আলিমের নাম আনা হয়েছে যারা মুহাদ্দীস এবং ফকীহ উভয়ই এবং এদের মধ্যে যারা সালাফে সলিহীনের অন্তর্ভূক্ত তাদের মতামত বিশেষভাবে বিবেচ্য। মতামতগুলো আনার পূর্বে তিনি ইবনু তাইমিয়াহ রহ এর বরাতে তাঁর নিজের ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রহ এর একটি অসাধারণ উক্তি নকল করেন। আমি শুধু আহমাদ রহ এর উক্তিটুকু তুলে ধরলাম। তা হচ্ছে এই যে, ”খবরদার! কোন মাসয়ালাতে এমন মত প্রকাশ করবেনা যে, যে বিষয়ে তোমার কোন ইমাম বা পূর্বসূরী নেই।” এরপর মতামতগুলোর আলোচনায় দেখা যায় যে, পূর্ববর্তী মুহাদ্দীস ফকীহ আলিমগণ সবাই নাভীর উপরে কিংবা নাভীর নিচে হাত বাধা উত্তম বলেছেন। বুকে হাত বাধার মতটি তাদের কারো থেকেই সাব্যস্ত নয়। বিশেষভাবে ইমাম তিরমিযী রহ এর বক্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, যেখানে তিনি বলেছেন যে, সাহাবীদের কেউ কেউ নাভীর উপরে, আর কেউ কেউ নিচে হাত বাধার উপরে আমল করতেন।

এ আলোচনা থেকে আরো দেখা যায় যে, যদিও আগেই আলোচনা হয়েছে যে, বুকে হাত বাধার হাদীসগুলো দূর্বল। তবুও শাফিয়ী মাযহাবের পরবর্তী আলিমগণ বুকে হাত বাধার হাদীসগুলো থেকে নাভীর উপরে বুকের নিচে বাধা বুঝেছেন। কেন বুঝেছেন তা বুঝার জন্য একটি বিষয় আগেই মাথায় রাখতে হবে যে, আরবী ‘সদর’ শব্দের অর্থ ‘গলার নিচে থেকে পেটের উন্মুক্ত স্থান পর্যন্ত’। এরপরও শাফিয়ী মাযহাবের আলিমগণ কেন শুধুমাত্র বুকের নিচে নাভীর উপরে বাধার কথা বললেন, তাঁর বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ বইয়ে উল্লেখিত হয়েছে। তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণের ভিতরে রয়েছে পূর্বে উল্লেখিত ইমাম আহমাদ রহ এর মাকরূহের মত এবং প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ ইমাম সারাখসী রহ এর এই মত যে,’নাভীর নিচে হস্তদ্বয় রাখলে ইহুদী-খৃষ্টানদের কর্মের সাদৃশ্য থেকে বেশি দূরে থাকা যায়।’ বিস্তারিত জানতে বই পড়তে হবে। এরপর এ অধ্যায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় এই যে, রুকুর পরে দাঁড়ানো অবস্থায় হাত বাধা বা না বাধা নিয়ে। এ বিষয়ে পড়তে গেলে আমরা দেখবো যে, এ ব্যাপারে বেশ ইখতিলাফ আছে। আমাকে এ বিষয়টি অবাক করেছে যে, এখান থেকে প্রথম জানলাম যে, হানাফী মাযহাবের ফকীহগণও কেউ কেউ এ সময় হাত বাধার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরপর শায়খ আব্দুল আযীয বিন বায ও শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহিমাহুমাল্লাহর এ বিষয়ক মতামত সম্পর্কিত আলোচনা বেশ ভালো লেগেছে। শায়খ ইবনু বায রহ একে সুন্নাহ সম্মত বললেও, আলবানী রহ একে বিদয়াত বলেন। এরপর ইবনু বায রহ এর উত্তম আখলাক সম্মত উত্তর আলোচিত হয়েছে। যা পাঠকের হৃদয় জুড়িয়ে দিতে পারে ইনশাআল্লাহ।

এরপর লেখক তৃতীয় পর্বঃ ‘সহীহ হাদীস বনাম উম্মাতের মতভেদ ও বিভক্তি’ এর আলোচনা শুরু করেছন। প্রথমে আলোচনা করা হয়েছে ‘প্রচলিতের প্রেম’ বিষয়ে। এখানে আলোচনা হয়েছে যে, একটি সমাজে একটি সুন্নাহর উপর আমল হচ্ছে। এখন আমারটিই শুধু সহীহ বা আমারটিই শুধু আমল করা যাবে এ বিষয়ক চিন্তা-চেতনা কেমন, তা নিয়ে। এরপর আরো আলোচনা হয়েছে ‘আমারটিই শুধু উত্তম হতে পারে’ এবং বৃহৎ কিছু স্বার্থে আমার মত উত্তম হলেও সেগুলো পরিত্যাগ করা বিষয়ক আলোচনা। এখানে ইমাম বনু তাইমিয়াহর বিখ্যাত একটি মতামত উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর আলোচনা হয়েছে শুধু প্রচলিত কর্ম সম্পর্কে জানা নয়, এর সাথে অধ্যয়নের সমন্বয়ও করতে হবে। এ আলোচনায় তাকলীদ, ইজতিহাদ ও উভয়ের সীমারেখা ইত্যাদি বিষয়ক সুন্দর আলোচনা করা হয়েছে। মাযহাবের বাহিরেও কখন আমল করা যাবে বা ভিন্ন মাযহাবের আলিমের কাছে ফাতওয়া জিজ্ঞাসা করা বিষয়ক আলোচনাগুলো এ বিষয়ে যারা জানে না তাদের ইল্‌মকে প্রসারিত করবে। এ পর্বে আরেকটি আলোচনা খুব ভালো লেগেছে, সেটি হচ্ছে যে, আমাদের দেশে হাত কোথায় বাধবো এ নিয়ে ঝগড়া! কিন্তু আফ্রিকায় ঝগড়া হচ্ছে বাধা বা না বাধা নিয়ে। কেউ কেউ একবার আফ্রিকায় হাত বাধার দাওয়াত দেয় তখন তা উভয় পক্ষে হানাহানির আকারে রূপ নিয়েছিল। এ বিষয়টি যখন ইবনু বায রহ এর নিকট পৌছালো, তখন তিনি এ বিষয়ে সুচিন্তিত মতামত দেন। তা বিস্তারিত জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।

সার্বিক আলোচনাঃ এ বইয়ে কমন কিছু গুণাগুণ আছে। বলতে গেলে আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহিমাহুল্লাহর প্রত্যেক বইয়েই তা থাকে। সেগুলো হলোঃ
১। নিজের মত তিনি সাধারণত অল্প কথায় বলে দেন। যাও বলেন সেগুলো মূলত অন্য আলিমদের আলোচনার পরে বিষয়টিকে একটি সিদ্ধান্তে আনার জন্য। মূলত তিনি পূর্বেকার আলিমদের উপর নির্ভর করেন বেশি। বিশেষত সালাফদের মতের উপর তিনি বেশ নির্ভর করেন। যা সাধারণত অন্যান্য বইয়ে পাওয়া যায় না।
২। প্রচুর সূত্র ও টীকা সংযোজন করেন। সূত্র ছাড়া তিনি মত উল্লেখ করেন না বললেই চলে।
৩। একাধিক মতের সব উল্লেখ করে এরপর ইনসাফ বজায় রাখেন। অনেক সময় একটি মত যদি বেশ বিভ্রান্তজনকও হয় তারপরও উল্লেখ করেন এবং এরপর সিদ্ধান্ত দেন।
৪। সাহিত্যের কঠিণ ভাষা ও শব্দ প্রয়োগ করেন না। সহজ-সরল ভাষা ব্যবহার করেন।
৫। আরবী ভাষায় তাঁর বেশ পান্ডিত্য থাকায় বিভিন্ন প্রাচীন লুগাত থেকেও শব্দের অর্থ বের করেন। যা অন্যান্য বইয়ে সাধারণত থাকে না।
৬। সর্বশেষে বইয়ে ব্যবহৃত গ্রন্থপঞ্জীর তালিকা দেন। যা জ্ঞানপিপাসুদের স্পৃহা বৃদ্ধি করে এবং যা লেখকের প্রচুর গবেষণা ও অধ্যয়নের দিকে ঈঙ্গিত করে।

কিছু কথা আমি ঠিক নেতিবাচক হিসেবে বলবো না, বলবো যে, সংযোজন করলে ভালো হতো। সেগুলো হচ্ছে, বুকে হাত বাধার আবু দাউদের হাদীসটি সম্পর্কে আবু দাউদ রহ চুপ ছিলেন। আমরা জানি আবু দাউদ রহ চুপ থাকলে তাঁর মতে সে হাদীস গ্রহণযোগ্য। যদিও লেখক রহিমাহুল্লাহ অন্যান্য মুহাদ্দীসদের মত এনেছেন, তারপরও এ বিষয়ক আলোচনা দিলে বেশ সুন্দর হতো। আর দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় বলবো যে, হানাফী মাযহাবের পরবর্তী আলিমগণ মহিলাদের বুকে হাত বাধার মত দেন, যা পূর্বেকার কোন ফকীহ থেকে পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ব্যাক্তিগতভাবে আমার কাম্য ছিল।

শেষে আরেকটি কথা যোগ করবো যে, যদিও আমি আলিম বা মুজতাহিদ কিছুই নয়। বুকে হাত বাধার মত সম্পর্কে কোন ফাতাওয়া দেয়ার যোগ্যতা আমার নেই। তারপরও এ কথা বলতে হয় যে, বই পড়ে যা বুঝলাম তা হচ্ছে এই যে, বুকে হাত বাধার মত সালাফদের মতামতের বাহিরে একটি বিচ্যুত মত।

সর্বশেষ বলবো, যে যুগে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রয়োজন সে যুগে এ ধরণের ছোট-খাট মাসয়ালা নিয়ে বাড়াবাড়ি যারা করেন, তাদের এ ধরণের বই পড়া উচিত। এ বইটি বেশ তথ্য সমৃদ্ধ হওয়ায় যারা দলীলের উপর নির্ভর করে চলতে চান তাদের ইল্‌মের জগতে এ বইটি প্রভাব ফেলবে বলে আশা রাখি। যারা হাত বাধা বা এ ধরণের বিষয়গুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন তাদেরকে এবং বিশেষভাবে আলিম ও ত্বলিবুল ইল্‌মদেরকে আমি এ বইটি পড়ার আহবান জানাচ্ছি।

বুক রিভিউ: কিং সলোমন’স মাইনস

October 31, 2017

দেওবন্দ কথা!

October 31, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *