দেওবন্দ কথা!

মুহাম্মদ নাজমুল ইসলাম

দেওবন্দ। বিশ্বের একমাত্র নিখুঁত এরাবিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ইলমে হাদীস ও ইলমে তাফসীরের মাকবূল এবং অনন্য দরসগাহ, আউলিয়ায়ে কেরাম এবং মাশায়িখে হিন্দের একমাত্র রুহানি দিক্ষাগার। হিন্দের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্র সৈনিকদের একমাত্র অবস্থান কেন্দ্রই হলো ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’।
যে বিদ্যাপীঠকে ‘আযহারে হিন্দ’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে বলা হয় উলামা ও ফুযালাদের ইখলাস কা তাজমাহাল। এখানেই শেষ না… তা এমন একটি বৃক্ষ, যেটাকে আল্লাহ প্রেমিকরা তারই ইশারা ও ইলহামের মাধ্যমেই তার উপর পূর্ণ ভরসা রেখেই একনিষ্ঠতা ও লিল্লাহিয়্যাতকে পূঁজি করে রোপণ করেছেন। যার শাখা-প্রশাখা আজ সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বের রন্দ্রে রন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। এবং পুরো জাতিকে বিলিয়ে দিচ্ছে তার সুবাস। আলোকিত করছে তার আলোয়। তা এমন একটি চিন্তা-চেতনার জ্ঞান সমুদ্র, যা নবুয়াতের বক্ষ থেকে প্রবাহ হয়ে সাহাবাদের বক্ষ বেয়ে হিন্দুস্তান এসে আল্লামা শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি’র বক্ষ ঘেসে মাওলানা কাসিম নানুতবি রাহ., মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি রাহ., মাওলানা ইয়াকূব নানুতবি রাহ.’র মাধ্যমে দেওবন্দের পুষ্পবাগানে এসে স্তম্ভিত হয়। যার নদী-নালা হিন্দের সীমা অতিক্রম করে আজ বিশ্বের মানচিত্রে বিস্তৃত হয়ে আছে। আর সমগ্র বিশ্বের ইলম পিপাসুরা তার অথবা তার থেকে সৃষ্ট পেয়ালা থেকে তাদের ইলমের পিপাসা নিবারণ করছে। যা আজও বিরাজমান। তাইতো এ প্রতিষ্ঠানকে একপলক দেখতে বিভিন্ন রঙের মানুষ ছুটে আসে বিশ্বের দিকদিগন্ত থেকে। ছুটিতে, উৎসবে বা কোনো এক ফাঁকে অবসর হয়ে নিজেদেরকে আনন্দ দিতে দেশ-বিদেশের মুসলিম-অমুসলিম, বাদশা-ফকির, দ্বীনদার-বেদীন, পুরুষ-মহিলা, বুড়ো-যুবক সঙ্গে শিশু পর্যটকরা দল বেধে অথবা একা একা ছুটে আসতে থাকে এ মাদরে ইলমিতে। এসে ঘুরে ঘুরে দেখে অনেক কিছু। মনকাড়া ডিজাইনের ভবনসমূহ, মসজিদ, ছাত্রাবাসসহ আরো অনেক কিছু। সঙ্গে সঙ্গে সর্বপরি মহাথির উলামা হজরাত এবং ইলম পিপাসুদের সুন্নাতি লেবাস, অমায়িক চরিত্র, আদবী কথাবার্তা শুনে নিজেরা এ অনুভূতি প্রকাশ করতে বাধ্য হয় যে, “এখন পর্যন্ত (দেওবন্দ সম্পরর্কে) যা শুনেছিলাম, তা কোনো উপন্যাস না, এবং এখন পর্যন্ত যা দেখলাম তা কোনো স্বপ্ন না”। এভাবেই অনেক গুণীজন এবং সাহিত্যিকের কলাম, প্রবন্ধ, ফিচার, গল্প-উপন্যাস আর অনুভূতিতে চিত্রায়ন হয়েছে ‘দারুল উলূম দেওবন্দের’ স্মৃতিকথা।

নামাজের পর…

এইতো সেদিনের কথা।
নামাজের সময় একদম নিকটবর্তী। যাচ্ছিলাম মসজিদে রশীদ অভিমুখে। যাচ্ছি। তো সামনে একটু আগাতেই চোখ পড়ে বিশাল এক কাফেলার (প্রায় ৮০জন) প্রতি। কাছে গেলাম। কাছে যেতে না যেতেই দেখলাম এক বৃদ্ধ চাচ্চু দৌড়ে হাপিয়ে হাপিয়ে আমার কাছে আসলেন। মুখজুড়ে ছিলো হারানো কোনো জিনিস ফিরে পাওয়ার ছাপ। আমিতো পুরোই অবাক হয়ে গেলাম। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো, কোনো বিপদের সাহায্য নিতে আসছেন!
হাপাতে হাপাতে কাছে আসলেন।
জিজ্ঞেস করলাম:
-চাচ্ছু! কি হয়েছে? আপনাকে এতো পেরেশানি দেখছি যে?
অশ্রুস্বজল চোখ আর চেহারায় ফুটো ফুটো হাসি নিয়ে বললেন: আজ আমার লালিত স্বপ্নটা পূরণ হলো…
-আমি তো আরো অবাক!
বললাম: কি বলতে চাচ্ছেন? ঘটনা কি বলুন?

বললেন: আমি ওয়েস্টবেঙ্গল থেকে ফ্যামিলিসহ “দারুল উলূম দেওবন্দ” কে শুধু এক পলক দেখার জন্য আসলাম”। যে স্বপ্ন ছিলো সেই ছোট বয়সে, আজ তা পুরন হলো।
-আপনি কি দারুল উলূমের ছাত্র?
-জি
-বাবাজি! দোয়ার দরখাস্ত।আমার এবং আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন?
-আহ!

সেদিন শুধুই অপলক তাকিয়ে তাকিয়ে চাচ্চুর লালিত স্বপ্নপূরনের বিবরণগুলো শুনছিলাম। এখনেই শেষ না। বলছিলাম, ১৩৭৭ হিজরী’র কথা। তৎকালিক আফগানিস্তান’র বাদশা মুহাম্মদ জাহির শাহ দারুল উলূম দেওবন্দ আগমণ করেন। আগমন উপলক্ষে তার সম্মানার্থে দারুল উলূম দেওবন্দে এক জলসার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় প্রায় বিশ হাজার লোকের সমাগম ঘটে। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো দেওবন্দ এলাকা। মুহাতারাম বাদশা জাহির প্রথমে একে একে দারুল উলূমের সকল আঙিনা ঘুরে দেখেন। একদম শিক্ষাভবন থেকে নিয়ে মাতবাখ, ওজুখানা, গোসলখানা, লাইব্রেরি, মসজিদ ইত্যাদি। দেখে তার চক্ষু শীতল করেন। তারপর হাজির হোন মাজলিসে। শুরু করেন তার অনুভূতিঘেরা বক্তৃতা।

শুরুতেই হামদ ও সালাত পাঠ করেন। তারপর বলেন, ‘আমি আজ আমার স্বপ্নপুরি দারুল উলূম দেওবন্দে আসতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এবং পাশাপাশি আমি আজ অনেক আনন্দিতও। দারুল উলূম দেওবন্দের সুঘ্রাণ আফগানের প্রতিটি বালুকণায় মিশে আছে। এখানের উলামা তালাবার প্রতি আফগানীদের রয়েছে অকুন্ঠ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমি মন থেকে আপনাদের শ্রদ্ধা করি। ভালোবাসি। কাছে টানি। আর আফগানে একথাই শুধু প্রসিদ্ধ না যে, দারুল উলূম একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; বরং এটাই সবাই বলতে বাধ্য যে, দারুল উলূমই হলো আফগানের জমিতে ইলম সরবরাহের উৎস। এখান থেকেই শিক্ষালাভ করে বহু হক্কানী আলেমেদ্বীন আফগান গিয়ে ইলমের আলোকরশ্মী জ্বালাচ্ছেন। যা আজ অবধি চলমান। তাদের ছোঁয়ায় হাজারো মানুষ সঠিক দিশা পাচ্ছে। আফগানের আকাশে বাতাসে “ক্বালাল্লাহ ক্বালা রাসূলুল্লাহ সা’র সুর ভাসছে।মানুষের মাঝে ইলমী জযবা তৈরী হচ্ছে। তাই উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ না শুধু বরং চিরকৃতজ্ঞ”। এই ছিলো তার লালিত স্বপ্নপুরিতে দাঁড়িয়ে অনুভূতি ঘেরা কিছু কথা।

কিন্তু এখানেই শেষ না। এবার জানালেন তার ইচ্ছার কথা। স্বপ্নের কথা। ভালোবাসার কথা। তা কি? তিনি দারুল উলূম একটা গেইট করে দেবেন। কতৃপক্ষ যেন মনযূর করে। তাকে সে সুযোগটা করে দেয়া হয়। যাতে অন্তত দারুল উলূমের একটা ইটে হলেও তার দানের অংশীদারিত্ব থাকে। মনযূরি হলো। শুরু হলো গেইট নির্মাণের কাজ। তিনতলা বিশিষ্ট একটা নান্দনিক গেইট করলেন। মনকাড়া। অসাধারণ। চোখজুড়ানো। মনমাতানো। যেটা আজ তার নামকরনেই স্মৃতিস্বরূপ “বাবু জাহির” হিসেবেই প্রসিদ্ধ।

বাবু জাহির, দেওবন্দ।

প্রতিটা তলায় রয়েছে পাঁচ-ছজন বিশিষ্ট থাকার রুম। বর্তমানে দারুল উলূমের উলূমুল হাদিস বিভাগ রয়েছে এ গেইটেরই তৃতীয় তলায়। পাশাপাশি থাকছে প্রায় শ’খানেক ছাত্রের ছাত্রাবাস। এই ছিলো এক প্রকৃত বাদশাহ’র বাদশাহি। চিন্তা আর চেতনা। স্বপ্ন আর ইচ্ছা। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। আশা আর আকাঙ্ক্ষা। অতীত আর ভবিষ্যৎ।

মনে পড়ে গেলো আরেকটি ঘটনা। একবার ইউ,পি (উত্তরা প্রদেশ) সংসদে উত্তাপিত বাজেটের উপর বক্তৃতা করতে গিয়ে মি. বালিওয়াল আক্ষেপের সুরে বললেন: আমাদের স্কুল থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্রগুলো নিষ্কর্মাই-ই হয়। আর এ বিষয়টি যখন তারা নিজেরা বুঝতে পারে তখন তারা সোসাইট (আত্মহত্যা) করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না। কারণ, তাকে জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে কিচ্ছুই শিখানো হয় নি। সে জীবনের মূল্য কি বুঝব? তার কাছে তো জীবনের কোনো মূল্যই থাকে না। কিন্তু এর বিপরীতে আমার নির্বাচনী এলাকা হলো “দেওবন্দ শহর”। সেখানে”দারুল উলূম দেওবন্দ” নামে একটা দ্বীনি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার ছাত্ররা একদম নরমাল খাবার খেয়ে এবং নরমাল কাপড় পরিধান করে দিনাতিপাত করে জ্ঞানর্জন করে। এবং যখন তারা শিক্ষার্জন থেকে ফারেগ হয় তখন তারা দেশের একজন দরদী নেতা হয়ে যায়। সরকারের উপর তো বুঝা হয়-ই না। বরং নিজেই অন্যদের অভিবাক হয়ে যায়। একজন বিধর্মা নেতার এরকম কথা শুনে আনন্দের শেষ থাকে না। মন খুলে বলতে মন চায় দারুল উলূম! তুমি আজীবন তোমার আলোয় আলোকিত করো দিকহারা এ জাতিকে।

লেখক,
শিক্ষার্থী: দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত।

{বুক রিভিউ } বইয়ের নামঃ সালাতের মধ্যে হাত বাঁধার বিধান

October 31, 2017

প্রিয়তমা– সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর

October 31, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *