প্রিয়তমা– সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর

রিভিউ লেখক : সাকিব মুস্তানসির

বইয়ের নামঃ প্রিয়তমা

লেখকঃ সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর Salahuddin Jahangir
প্রকাশকঃ নবপ্রকাশ
মূল্যঃ ৫২০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩৫০
আমাদেরবই.কমে পাচ্ছেন ২৫০ টাকায়
প্রচ্ছদ সুচীশৈলিঃ রাবেয়া আফরোজা

বিষয়ঃ আল্লাহর রাসুল সা. এর সম্মানিত প্রিয়তমা রাদিয়াল্লাহু আনহাদের সাথে রাসুলুল্লাহর দাম্পত্যজীবনের পূর্ণ ছায়াছবি ।

[রিভউ]
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে হয়েছিল ইয়াহুদী গোত্রপতি আবুল আকিকের সাথে। খায়বার যুদ্ধ আসন্ন তাই পিতা তাড়াহুড়ো করেই এ বিয়ের আয়োজন করেন। বিয়ের রাতে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখেন সাফিয়্যা! উনি দেখেন আকাশের একটা উজ্জ্বল তারকা খসে পরছে, একসময় তা এসে উনার কোলে জায়গানিল। স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন, স্বামীর ঘুম ভাঙিয়ে খুলে বললেন স্বপ্নের কথা। স্বামী প্রবর রেগেই আগুন, কী! আমার ঘরে বসে আরবের রাণী হওয়ার স্বপ্ন দেখো! সজোরে থাপ্পড় কষলেন। সাফিয়্যার গালে কালশিটে দাগ পড়ে গেলো। এর অল্প দিন পরেই খায়বার বিজয় হয় মুসলমানদের হাতে। পিতা ও স্বামী হারিয়ে অনাথ হয়ে পরেন তিনি, বন্দি হয়ে আসেন মুসলমানদের হাতে। আল্লাহর রাসুল সা. তাকে সম্মানিত করেন উম্মাহাতুল মুমিনিনের মর্যাদা দিয়ে। স্বপ্ন পুড়ন হয় সাফিয়্যার। আরবের রাণীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হোন। হোন রাসুলের প্রিয়তমায়। এমন অসংখ্য জানা অজানা প্রেমময় উপাখ্যান সন্নিবেশিত হয়েছে ‘ প্রিয়তমা’য়।

রাসুল সা. এর স্বভাবজাত অভিজাত্য, ব্যক্তিত্ব আর নবুয়ত, ৩৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে ১১ জন স্ত্রীর সান্নিধ্য কাটিয়েছেন। প্রত্যেক উম্মাহাতুল মুমিনিন ছিলেন স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কেউ ছিলেন আল্লাহর রাসুলের থেকে বয়সে বেশ বড়, কেউ কাছাকাছি বয়সের আবার কেউ বেশ ছোট। কতক ছিলেন আরবের ধনী পরিবারের দুলালী আবার কতক ছিলেন দরিদ্র কুটিরের ফুল। নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতির ছিলেন যেমন তেমনই ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাষার, ভিন্ন সংস্কৃতির। এতো ভিন্নতা বৈরিতা নিয়ে আল্লাহর রাসুলের দাম্পত্যজীবন কেমন ছিল অন্য সবার মতো আমারো জিজ্ঞাসা ছিল অনেকদিনের। আম্মিজান খাদিজা আর আম্মিজান আয়েশা রা. সম্পর্কেই অল্প বিস্তর জানাশোনা অধিকাংশ মানুষের অথচ উনারা ছাড়া আরো ৯ জন আম্মি সম্পর্কে আমরা কতটাই জানি! প্রিয়তমা পাঠের আগে অনেক কিছুই জানতামনা তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি।

উম্মাহাতুল মুমিনিনরা ছিলেন আল্লাহর রাসুলের প্রিয়তমা। আল্লাহর রাসুল দিনের দুই তৃতীয়াংশ সময় কোন না কোন স্ত্রীর ঘরে কাটাতেন। উনার জীবনের এই দীর্ঘ সময় আমাদের জন্য অজানাই ছিল প্রায়! যা ছিল তাও ছড়ানো ছিটানো ফলে দীর্ঘ পাঠের মাধ্যমেই সে সময়গুলো সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারতাম ফলে অধিকাংশের এই অংশটা সম্পর্কে আবছা আবছা ধারণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতো। লেখক সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর দীর্ঘ পরিশ্রম ও সাধনা করে আমাদের জন্য উপহার দিয়েছেন ‘প্রিয়তমা’। আল্লাহর রাসুলের প্রিয়তমাদের এক মলাটের ভেতরে সন্নিবেশিত করেছেন। ইতিহাস ঘেটে ঘেটে কষ্টিপাথরে যাচাই বাছাই করে অলংকৃত করেছেন রাসুলের প্রিয়তমাদের।

সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর একজন প্রথিতযশা গল্পকার। কোরান হাদিসের গল্প উনার লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠে যার প্রমাণ অতীতে একাধিকার দিয়েছেন। প্রিয়তমা উনার শ্রেষ্ঠ কর্ম। ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য দিয়েই সাজিয়েছেন প্রিয়তমাকে অথচ দীর্ঘ এই বই পাঠে কখনো মনে হয়নি কোন ইতিহাসের বই পড়ছি। গল্পের ছাচে ফেলে চিত্রিত করা বইটির প্রতিটা লাইন পরের লাইন পড়ায় আগ্রহ জাগিয়ে দেয় ফলে অজান্তেই কখনযে রাসুলের উঠোনে আশ্রয় নেয় পাঠক! চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠে আরবভূমি। এইতো নবীর ঘর, এইতো নবীর প্রিয়তমারা। ছোট ছোট প্রতিটি গল্প, বিবিদের সাথে রাসুলের প্রেমময় আলাপচারীতা, মজাদার মান অভিমান, রাগ অনুরাগ,খুনসুটি, ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সব মিলেমিশে একটা মধুময় আবহ তৈরি হতে বাধ্য পাঠকের মনে।

কোন অধ্যায় রেখে কোন অধ্যায় পড়বো! সকলেই প্রিয়তমা! সকলেই নবীর প্রেয়শী। সকলেই আমার শ্রদ্ধাভাজন আম্মিজান রা.।

‘প্রিয়তমা’ ইতিহাস আশ্রিত বই তাই লেখক তার সাধ্যমত প্রতিটা তথ্য বিভিন্ন সোর্স থেকে যাচাই করেছেন। বইয়ের বিষয় বস্তু আর লেখনীর ধারাবাহিতা গতানুগতিক সিরাতের স্টাইল থেকে ভিন্ন হওয়ায় সিরাত ও ভাষা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বারবার যাচাই করিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। যে সকল তথ্যে একাধিক মত রয়েছে ও গভীর বিশ্লেষনের দাবী রাখে সেসকল বিষয় সযতনে এড়িয়ে গেছেন।

প্রিয়তমা ছিল লেখকের জন্য একটা ড্রিম প্রজেক্ট! বইয়ের প্রতিটা বিষয়েই আলাদা যত্ন আলাদা ভালোবাসা দিব্যলোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠে। গতানুগতিক প্রচ্ছদকে এড়িয়ে সোনালি মখমলে সবুজ সূতয় লেখকের প্রিয়তমার নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে ‘ প্রিয়তমা’ র প্রচ্ছদ। মজবুত বাধাই আর ঝকঝকে ছাপা সব মিলিয়েই ‘প্রিয়তমা’ পাঠকের প্রিয়তমায় পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক দাবী করেছেন যে সকল অর্বাচীন উম্মাহাতুল মুমিনিনদের জড়িয়ে আল্লাহর রাসুলের উপর নানা অপবাদ দেয়, কুৎসা গেয়ে বেড়ায় ‘ প্রিয়তমা ‘ হবে তাদের জন্য উত্তম জবাব।আমি বলব প্রিয়তমা বাংলাভাষী নবী প্রেমীদের জন্য একটা মস্তবড় হাতিয়ার। নিজের চিন্তা চেতনা , অস্পষ্টতা, বিশ্বাস ভালবাসা , জ্ঞান সব কিছুই নতুন করে ঝালিয়ে নিতে পারবে ।

সামাজিক অস্থিরতা আমাদের পারিবারিক জীবনকেও করে তুলেছে এলোমেলো। স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যকলহ, মানসিক টানাপোড়ন, পরস্পর বিশ্বাসহীনতা, তালাক- ডিভোর্স আর সংসার ভাঙার করুণ সুরে ছেয়ে গেছে চারপাশ। অথচ একটা সুখি পরিবার গঠনের সব উপাদান রয়েছে আল্লাহর রাসুলের দাম্পত্যজীবনে যা কখনো চেখে দেখা হয়নি, গ্রহণ করা হয়নি শিক্ষা। অথচ আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। সুখি সমৃদ্ধ প্রেমময় দাম্পত্যজীবন গড়তে ‘প্রিয়তমা’ টনিক হিসেবে কাজ করবে।

রেটিং – ৪.৭৫/৫ ( নিয়ম থাকলে ৫ ই দিতাম)

আল্লাহ রাসুলের ‘প্রিয়তমা’দের উপর শান্তি বর্ষিত করুন। আমিন।

দেওবন্দ কথা!

November 1, 2017

বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক ওমর খৈয়াম এর জীবনী

November 1, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *