তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে– আবু তাহের মিছবাহ্

বই পরিচিতি
——————–
বই : তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে
লেখক : আবু তাহের মিছবাহ্
প্রকাশনী : দারুলকলম
হাদিয়া : ১৫০/০০ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩০৭

ইতিহাসের বই পড়তে কার না মন চায় ? বিরক্ত লাগে ,মন বসেনা । একের পর এক তারিখ, মাস,সন মনে রাখা কঠিন ও দুষ্কর । তবুও ইতিহাস আমাদের পড়তে হয় ,জানতে হয় । কারণ ইতিহাসে সোনালী পাতায় লুকিয়ে আছে আমাদের গৌরবময় অতীত ।যে গৌরবময় ইতিহাস কলমের কালো কালি দিয়ে নয়,বুকের লাল রক্ত রঞ্জিত করে অর্জিত হয়েছে । যা আমাদের সুন্দর ও সোনালী ভবিষ্যতের স্তম্ভ । এই স্তম্ভের গাঁথুনির মজবুতির উপর আমাদের ‘ ভবিষ্যৎ রাজপ্রাসাদ’দাঁড়ানো । তাই এ গৌরবময় ইতিহাস জানতে হাতে তুলে নিয়েছিলাম ‘তুরস্কে তুর্কিস্তানের সন্ধানে’। মূলত এটি আবু তাহের মিছবাহ্ দা. এর ইস্তাম্বুলের তিন দিনের সফরনামা ।লেখক কেন লেখলেন এ সফরনামা ? লেখকের লেখায় দেখুন সে রেখা । ‘তো ইস্তাম্বুলের সফরনামা কেন লিখলাম ? এর কোন কৈফিয়ত যদি দিতেই হয় তাহলে বলবো , সেই গৌরবময় অতীতের কারণে এবং সেই হারিয়ে যাওয়া মানচিত্রের কারণে ইস্তাম্বুলের প্রতি যে দরদ-ব্যথা ও দহন –যন্ত্রণা পোষণ করি , এই দু’দিনের সফরে তা যেন একেবারে তাজা হয়ে উঠেছিলো । তখন মনে হলো তাতে একটু শীতল প্রলেপের প্রয়োজন । এ সফরনামা মূলত সেই শীতল প্রলেপ । তাছাড়া ইস্তাম্বুলের ঐ স্বল্প সময়ের দুর্লভ সান্নিধ্য কিছু সুখের , কিছু আনন্দের এবং কিছু সৌভাগ্য ও সম্ভাবনার তরঙ্গদোলাও হৃদয়ের গভীরে সৃষ্টি করেছিলো । ইচ্ছে হলো,প্রিয় পাঠক ,তুমিও যেন তোমার কোমল হৃদয়ে সেই তরঙ্গদোলা অনুভব করো ;কিছু বর্ণের , কিছু শব্দের আলোকস্পর্শে হেরার রাজতোরণ – অভিমুখে পথচলার প্রেরণায় তুমিও যেন উদ্দীপ্ত হও। ইস্তাম্বুলকে আবার আমরা দেখতে চাই তার অতীতের গৌরব ও মর্যাদার আসনে ,মহান তুর্কীজাতীকে আমরা আবার পেতে চাই ঐ সাহসী চেতনা ও জিহাদি প্রেরণার ধারকরুপে , একদিন যা তাদেরকে দান করেছিলো কুস্ত্তনতুনিয়্যাহ বিজয়ের গৌরব । আবার আমরা ফিরে পেতে চাই সেই প্রাচীন মানচিত্রের মালিকানা যার নাম ছিলো তুর্কিস্তান ।

প্রাণের এ আকুতি ও মিনতি , হে প্রিয় পাঠক, তোমার মধ্যোও যেন জাগ্রত হয়, লালিত হয়,পরিপুষ্ট হয় এবং প্রস্ফুটিত হয় সেজন্যই ‘তুর্কিস্তানের সন্ধানে’ আমার এ ‘শব্দসঙ্গীত’!’ এটি শুধু তুর্কিস্তানের মুসাফিরদের পথের দিশারী নয়, এটি বাংলা সাহিত্যিকদের জন্যও ‘আদবী খোরাক’। এ বইটি তিনি সাজিয়েছেন ইস্তাম্বুলের সোনালী অতীত দ্বারা । যেই ইস্তাম্বুল ছিলো সুদীর্ঘ পাঁচশ বছর ইসলামী খেলাফতের রাজধানী । যেই ইস্তাম্বুল জয় করেছিলেন ২৪ বছরের যুবক মুহাম্মদ আল –ফাতিহ । যার সম্পর্কে রসুল সা. সুসংবাদ দিয়েছিলেন, ‘অবশ্য তোমরা কুস্ত্তনতুনিয়্যাহ জয় করবে , তো কতনা উত্তম ঐ অভিযানের আমীর এবং কত না উত্তম এই বাহিনী !’ । যেই ইস্তাম্বুলের পবিত্র মাটিতে শুয়ে আছেন রসূল সা.এর মেযবান আইয়ূব আনসারী রা।. যেই ইস্তাম্বুল সম্পর্কে ফ্রান্সের বহু যুদ্ধজয়ী নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, ‘সারা পৃথিবী যদি একটি মাত্র সাম্রাজ্য হয় তাহলে তার রাজধানী হিসেবে ইস্তাম্বুলই হবে সবচে উপযুক্ত শহর’। লেখক এখানে তুলে ধরেছেন, উছমানী খেলাফতের গোড়াপত্তনের ইতিহাস । ‘এশিয়ার তুর্কীজাতির একটি শাখা ছিলো ওগোজ । এই মুসলিম গোত্রটি বিশ্বত্রাস চেঙ্গিজখানের হামলায় বিপর্যস্ত অবস্থায় জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলো ।

এ গোত্রেরই জনৈক ব্যক্তি তুগ্রুল কিছু অনুচরসহ ভাগ্যের সন্ধানে বের হয়ে আঙ্কারার নিকটবর্তী স্থানে এসে উপনীত হন । এসময় তিনি দেখতে পান, একদল তুর্কী সৈন্য ও খৃষ্টান বাহিনীর মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ চলছে, আর মুসলিম বাহিনী পরাজয়ের সম্মুখীন । দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি হিসেবে , সর্বোপরি ঈমান ও বিশ্বাসের দাবীতে তুগ্রুল তার দলসহ তুর্কী সৈন্যদের পক্ষে যোগদান করেন এবং প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেন । সৈন্যদলটি ছিলো সেলজুকি সুলতান কায়কোবাদের বাহিনীভুক্ত । সুলতান পুরস্কার স্বরূপ তুগ্রুলকে সুগুত নামক বিরাট একটি জনপদ জায়গীররূপে দান করেন । এখানেই ১২৫৮ সালে তুগ্রুলের পুত্র ওছমান জন্মগ্রহণ করেন’। পিতার মৃত্যুর পর ওছমান সুগুত-এর শাসনভার গ্রহণ করেন এবং আশ-পাশের জনপদে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন ।সাহসে, প্রজ্ঞায়,দয়া ও কোমলতায় এবং ন্যায়পরতা ও অড়াম্বর জীবন যাপনে সে যুগে তাঁর কোন তুলনা ছিলোনা । এই ন্যায়পরায়ণ শাসক ওছমানের হাতেই মূলত তুর্কীদের নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় বলে সেটাকে বলা হতো ‘উসমানি সালতানাত’ ইউরোপরা যাকে বলে ‘অটোম্যান এ্যম্পায়ার’। বাদ যায় নি ১০৭১ খৃষ্টাব্দে সংঘঠিত ঐতিহাসিক মানযিকার্ট যুদ্ধের কথা ।বর্তমান তুরস্কের পূর্বাংশের একটি অঞ্চল মানযিকার্ট । ঐখানে তুর্কীস্তানের মহান সেলজুকি সুলতান আলেপ্ আরসেলান মাত্র বিশহাজার যোদ্ধা নিয়ে বাইজান্টান সম্রাট রোমানূসকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন । যার সৈন্যসংখ্যা ছিলো দু’লাখেরও বেশী ।একেপি’র চতুর্থ সাধারণ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে ,তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়েব এরদোগান তুরস্কের তরুণসমাজের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছিলেন – insaallah we will build 2023 , you will build 2071 (ইনশাআল্লাহ আমরা গড়ে তুলব ২০২৩,আর তোমরা গড়ে তুলবে ২০৭১ ) এ বার্তা দ্বারা তিনি উছমানী খেলাফতের বিলুপ্তি ও মানযিকার্ট যুদ্ধের জয়ের ইতিহাসের দিকে ইশারা করেছেন । লেখক এ বইয়ে আরো যোগ করেছেন ,ইস্তাম্বুলের সবচে বড় মসজিদ ,সুলতান সোলাইমানের মসজিদের ইতিহাস । যেটি ১৫৪৯ সালে নির্মিত হয় । মসজিদের মূল ছালাত কক্ষটি দৈর্ঘ্যে ৬৯ মিটার এবং প্রস্থে ৬৩ মিটার । এ মসজিদের স্থপতি হলেন,উস্তাদ যীনান । যিনি ছিলেন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ স্থপতি, এখনো তাকে মনে করা হয় স্থাপত্যবিদ্যার পথিকৃৎ । তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের একটি প্রমাণ এই যে, আধুনিক যুগের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তার সময়ে তিনি বসফরাস নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণের কথা চিন্তা করতে পেরেছেন । তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে একশ ছত্রিশটি মসজিদ, তিনটি হাসপাতাল, চৌদ্দটি বড় সেতু, পঁয়ত্রিশটি প্রাসাদসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নকশা তৈরি করেছেন । সবচেয়ে মূল্যবান মনে হল আমার ‘তোপকাপ প্রাসাদ’এরইতিহাস ।

যেখানে বসেই ১৪৭৮ সাল থেকে ১৮৫৩ অর্থাৎ ভারত বর্ষে মহান সিপাহি বিপ্লবের চারবছর আগ পর্যন্ত সুলতান মুহাম্মদ,সুলতান সেলিম,সুলতান সোলাইমান কানুনী রাজকার্য পরিচালনা করতেন । বর্তমানে তোপকাপে প্রাসাদ একটি দুর্লভ ও মূল্যবান ঐতিহাসিক দ্রব্যসামগ্রীর দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ জাদুঘর বলে স্বীকৃত । যার এক কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে পেয়ারা নবী সা.এর কিছু তাবাররুক যেমন জুব্বা মোবারক, দান্দান মোবারক, দাড়ি মোবারক, দু’টি তরবারি,একটি ঝাণ্ডা যা বদরের গাযওয়ার ব্যবহৃত হয়েছে বলে কথিত । আর মিসরের মাকাওকিসের নামে প্রেরিত তাঁর মোহরাঙ্কিত চিঠি মোবারক । তোপকাপে জাদুঘর ঘুরে দেখার পর যে গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মন্তব্য করেছেন ত্বাকী উসমানী দা.তিনি বলেন, ‘এ জাদুঘর কোন সন্দেহ নাই,ঐতিহাসিক ও পর্যটকদের জন্য অতি চিত্তাকর্ষক এক ‘তামাশাস্থল’কিন্তু এর চেয়ে বড় সত্য এইযে তা বিরাট শিক্ষাগ্রহণেরও কেন্দ্র’ । নাহ! পাঠক বন্ধুরা আমি তোমাদের আনন্দকে মাটি করে দিতে চাই না । সবকিছু যদি আমি লিখি ,সব মজা যদি আমি ভোগ করি ,তাহলে তোমার জন্য আর মজাই বা কী রইল ? আমি তো তোমাকে মিষ্টি মুখ করালাম এখন যদি তুমি নিজেই মিষ্টির স্বাদ নিতে পার তাহলে, নিজেই ছুটবে মিষ্টির হাঁড়ির পিছনে । একটু স্বাদ নিয়ে দেখবে কি পাঠক বন্ধুরা ?সবাইকে আমন্ত্রণ রইল ।
লেখক পরিচিতি
————————-

আবু তাহের মিছবাহ্ একজন নীরব সাহিত্য সাধক ,একজন সফল মানুষ গড়ার কারিগর । যিনি ‘শব্দের কৃষাণী’উপেক্ষা করে ছুটে চলেন ‘শব্দের রাণী’ এর সন্ধানে ।যিনি শব্দের পর শব্দ গেঁথে তৈরি করেন ‘লেখা-মালা’ যেমনিভাবে একজন মালী ফুলের পর ফুল গেঁথে তৈরি করেন ‘পুষ্প-মালা’।যিনি লেখার মাঝে ফুটিয়ে তোলেন সময়ের বাস্তব চিত্র । যার লেখার মাঝে খোঁজে পায় সবাই আত্ম-খোরাক । যিনি নতুন প্রজন্মের তরুণদের সাহিত্য গুরু ।যিনি হাজারো হৃদয় প্রাসাদের সিংহাসনে আসীন।যিনি ছোট-বড় সকলের ভালবাসার পাত্র। যিনি একটি ‘পুষ্প –উদ্যান’এর দরদী মালী যে উদ্যানে , তিনি দীর্ঘ দিনের চেষ্টা সাধনার পর ফুটিয়েছেন অসংখ্য সুভাসিত ফুল । যে ফুলগুলো থেকে অসংখ্য ভ্রুমরা ইলমে নববীর মধু আহরণ করে বিতরণ করে চলেছেন । যদি সত্য বলি যার পরিপূর্ণ পরিচয় দেওয়া আমার কলমের কালিতে ,মুখের বুলিতে অসম্ভব ।

বিদেশে যেসব স্কলারশিপ সহজে পেতে পারেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা

November 4, 2017

হুসাইন (রাযি আল্লাহ আনহু)-এর মূল হত্যাকারী কে? ড. ইবরাহীম আলী শুউত্ব

November 4, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *