রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিন

রাখাইন রাজ্যে আন্ত সম্প্রদায় সহিংসতা ও সামরিক বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ বন্ধ করে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। গত সোমবার রাতে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ইতালির স্থায়ী প্রতিনিধি সিবাসতিয়ানো কার্ডি পরিষদের পক্ষে বিবৃতিটি পড়ে শোনান। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তার দেশের নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার না করলেও বিবৃতিতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন জানায়, নিরাপত্তা পরিষদের এ বিবৃতি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিষয়ে এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি পরিষদে গৃহীত দলিল হিসেবে লিখিত থাকবে।

চীনের আপত্তিতে নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব আনতে পারছে না—আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এমন তথ্যের মধ্যেই চীনসহ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী-অস্থায়ী সব সদস্যের সম্মতিতে ওই বিবৃতি গৃহীত হয়েছে। এতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে তিনি এই সংকট উত্তরণে একজন বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগ করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখেন। সংকট নিরসনে তাঁর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখতেও মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতি গ্রহণের ৩০ দিন পর মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে বিবৃতি দিতেও জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত বর্ণনাতীত সহিংসতার নিন্দা জানানো হয়েছে এবং সেখান থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত মিয়ানমারের নাগরিকদের মানবিক সহায়তা দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে নাখোশ হয়েছে মিয়ানমার। জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাও দো সুয়ান এ বিবৃতিকে ‘অযৌক্তিক চাপ’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর উদ্বেগ জানান। সংকট নিরসনে এ বিবৃতি সহায়ক হবে না উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ২৫ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার মধ্য দিয়ে এ ট্র্যাজেডির শুরু এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিদেশি জঙ্গিও লড়াই করছে। মিয়ানমারের প্রতিনিধি বলেন, ওই ট্র্যাজেডি মোকাবেলায় মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং দুটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে বিবৃতির কিছু অংশ মিয়ানমার প্রত্যাখ্যান করলেও সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজতে অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে। হাও দো সুয়ান বলেন, মিয়ানমার সরকার রাখাইনে শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা অব্যাহত রাখবে।

মিয়ানমার সংকট সমাধানে সর্বসম্মতিক্রমে ‘প্রেসিডেনশিয়াল বিবৃতি’ গ্রহণ করায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন নিরাপত্তা পরিষদকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘সংকট সমাধানের জন্য আমরা সব সময়ই প্রস্তুত রয়েছি এবং আমাদের যা করণীয় তা করে যাচ্ছি। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বলতে চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদ যতক্ষণ পর্যন্ত এ বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব গ্রহণ না করবে ততক্ষণ দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ’

রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতেও মিয়ানমার বিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণে সব সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, এ প্রস্তাব মিয়ানমার সংকট সমাধানে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের দ্বিবিধ ভূমিকার ক্ষেত্রে পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, যা জাতিসংঘ মহাসচিবের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাকে আরো শক্তিশালী করবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সংকটের শিকড় মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারে নিহিত। ’

মাসুদ বিন মোমেন বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন। প্রথমত, উত্তর রাখাইন প্রদেশে বাধাহীনভাবে মানবিক সহায়তা দেওয়া, যাতে যে রোহিঙ্গা জনগণ সেখানে রয়েছে তাদের আর পালাতে না হয়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপকে প্রত্যাবাসন বিষয়ে অবশ্যই দৃশ্যমান, ফলপ্রসূ ও টেকসই কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং রাখাইনে মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজকে এ বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদের এক হাজার ৩৬২ শব্দের বিবৃতির শুরুতেই মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গত ২৫ আগস্ট আরসার হামলার তীব্র নিন্দা এবং আরসার দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়। পরের অনুচ্ছেদেই রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্ট থেকে ব্যাপক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ বলেছে, সহিংসতায় ছয় লাখ সাত হাজার ব্যক্তির গণবাস্তুচ্যুতি ঘটেছে এবং তাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের।

নিরাপত্তা পরিষদ রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারাসহ সব মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের খবরে বিশেষ করে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হামলার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে বল প্রয়োগ ও দমন-পীড়ন, হত্যা, যৌন সহিংসতা এবং বাড়িঘর ও সম্পত্তি ধ্বংসের শিকার হয়েছে বলে পরিষদ উল্লেখ করেছে।

পরিষদ রাখাইনে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত কাঠামো বাস্তবায়নে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমারের জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের—এ কথা গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করে পরিষদ মিয়ানমারে গণতন্ত্রায়ণে নিরাপত্তা ও সামাজিক খাত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ।

রাখাইনে মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য মিয়ানমারের ‘ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ কাঠামো’ গড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। একই সঙ্গে ওই কাঠামো যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে সহায়ক হয় এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর পূর্ণ প্রবেশাধিকার থাকে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পরিষদ সংশ্লিষ্ট সরকার ও সব মানবিক অংশীদারকে নারীদের বিশেষ করে যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের প্রয়োজনের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে রাখাইন রাজ্য বিষয়ক পরামর্শক কমিশনের সুপারিশগুলোর প্রতি মিয়ানমার সরকারের প্রকাশ্য সমর্থনকে নিরাপত্তা পরিষদ স্বাগত জানিয়েছে। এ ছাড়া পরিষদ ধর্ম বা গোষ্ঠী-নির্বিশেষে সবার নাগরিকত্ব, সেবা পাওয়ার সমান সুযোগ, চলাফেরার সুবিধাসহ কোনো ধরনের বৈষম্য না করে সবার মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাখাইনে সংকটের মূল কারণগুলো মিয়ানমার সরকারকে সমাধান করতে বলেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ওপরও জোর দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। পরিষদ মিয়ানমারকে জাতিসংঘের সব সংস্থার, বিশেষ করে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কাজে সহযোগিতা করতে এবং দেশটিতে এ হাইকমিশনারের অফিস খোলার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে আহ্বান জানিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদ বিবৃতিতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকে দ্রুত রাখাইন রাজ্যসহ সারা দেশে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদের একটি উন্মুক্ত সেশনে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতি দেন। ওই সেশনে মিয়ানমার প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। এরপর ১৩ অক্টোবর মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ‘আরিয়া ফর্মুলা’ মিটিংয়ে বসে নিরাপত্তা পরিষদ। ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ইকোসক চেম্বারে ‘রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের মানবিক সহযোগিতা বিষয়ে’ জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণ বিষয়ক সমন্বয়কারী এবং জাতিসংঘের আন্ডারসেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ব্রিফিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের আয়োজনে এবং গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল ও মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংগঠন ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’-এর সহযোগিতায় ‘রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা : শুধু নিন্দা জ্ঞাপনই নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ’ শীর্ষক একটি সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।

মহাসচিবের বিশেষ দূত বাংলাদেশে : কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সংঘাতময় পরিস্থিতিতে যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত প্রমিলা পাট্টিনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত রবিবার থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করে রোহিঙ্গাদের খোঁজখবর নিচ্ছে। এদিকে শিশু ও সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি ভার্জিনিয়া গাম্বা চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গা শিশুদের পরিস্থিতির খোঁজ নেবেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ছয় লাখ রোহিঙ্গার প্রাণ বাঁচিয়েছে

November 8, 2017

হ্যাপি থেকে আমাতুল্লাহ

November 8, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *