মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন

বই : মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন
লেখক : ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি
প্রকাশক : মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির
প্রকাশনী : সুবুত (SUBUT)
পৃষ্ঠা : ৪৬
মূল্য : ৪০ টাকা

বই পরিচিতি :

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে এই দ্বীন উপহার দিয়েছেন। এই দ্বীনের হিফাযতের দায়িত্ব আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্লা শানুহূ তাঁর নিজ জিম্মায় নিয়ে নিয়েছেন। তাই যুগে যুগে উম্মাহকে ছাড়াছাড়ি এবং বাড়াবাড়ি – এই দুই রোগ থেকে মুক্ত রাখার জন্য আল্লাহ সুব’হানাহু ওয়া তা’আলা প্রেরণ করেছেন তাঁর অগণিত জ্ঞানী বান্দাকে যাঁরা এই দ্বীনের ব্যাপারে ভ্রান্তির অপনোদন করেছেন এবং এই দ্বীনকে বিকৃতি থেকে মুক্ত রাখতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের যথাযোগ্য প্রতিদান দান করুন। আমাদের সালাফদের মধ্যে এমনই একজন মহান ‘আলিম হলেন ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি রাহিমাহুল্লাহ। হাম্বলি মাযহাবের ‘আলিম হওয়া সত্ত্বেও সর্বমহলের নিকট তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তাঁর উঁচু মাকামের দিকেই ইঙ্গিত করে। মাযহাব নিয়ে বাড়াবাড়ি বিশেষ করে মাযহাব অস্বীকারকারী ও মাযহাব বিরোধীতাকারীদের যুক্তি ও আপত্তিসমূহকে রদ করে ইমাম রাহিমাহুল্লাহর লিখিত ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত মূল্যবান এই রিসালাহটি পাঠ করা এই ফিতনাময় সময়ের জোর দাবি। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের একজন মহান ‘আলিমের ‘ইলমের কিছুটা পরিচয় এ বইটা থেকে উপলব্ধি করা যায়। মাযহাব নিয়ে অন্তহীন ফিতনা ও ভাইয়ে ভাইয়ে যে চরম বিরোধ তার নিরসনকল্পে ইমামের এই বইটি যেকোন সচেতন মুসলিমের পড়াটা আবশ্যক।

পাঠ পর্যালোচনা :

মাযহাব নিয়ে যে গোঁড়ামি মুসলিম সমাজে বিদ্যমান এবং সেটা নিয়ে যে তুমুল ঝগড়া বিবাদ মুসলিমদের মধ্যে শুরু হয়েছে, সেটা সম্পর্কে এমনকি কাফিররাও ওয়াকিবহাল। এই ফিতনা নানামুখী সমস্যায় আক্রান্ত ও বিভক্ত এই উম্মাহকে আরো বেশি বিভক্ত,আরো বেশি দুর্বল করে ছেড়েছে। মাযহাব মানা না মানা নিয়ে এক পক্ষের অপর পক্ষকে তুমুল আক্রমণ শানানো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই হাদীসের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয় যেখানে তিনি মুসলিমদেরকে পরস্পরের ভাই হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মাযহাব নিয়ে এই মতবিরোধ আমাদের ভ্রাতৃত্ববোধকে তছনছ করে দিচ্ছে। এর জের ধরে অবমাননা করা হচ্ছে মহান সব ‘আলিমদের যাঁরা ‘ইলমের মাপকাঠিতে ছিলেন অনন্য। আলোচ্য বইটি যদিও ইমাম রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন কিছু মানুষের কতক মাস’আলায় মাযহাব থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে কিন্তু আজকের এই সমস্যাসঙ্কুল সময়ে এর আবেদন আর ব্যাপ্তি আরো ব্যাপক হয়ে দেখা দিচ্ছে।

কুরআন ও সুন্নাহর গাঠনিক সংরক্ষণের নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোই হল ফিকহ বা মাযহাব। মাযহাব আলাদা কোন দ্বীন নয়, বরং এটা হল এই দ্বীন আল ইসলাম পালন করার সহজতম পথ ও পদ্ধতি মাত্র। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহর চার মহান ইমামের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে উম্মাহ আজ চারটি সুসংবদ্ধ, সুরক্ষিত মাযহাবের অধিকারী। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর রহমত যে আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্ আমাদের জন্য দ্বীন পালনকে সহজ করে দিয়েছেন। কিন্তু ইমামগণ যে কারণে এত কষ্ট করে গেলেন আমরা শাইত্বানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে সেই কষ্টের ওপর যেন পানি ঢেলে দিলাম। যেই মাযহাবগুলো আমাদের দ্বীন পালনকে সহজ ও আরামদায়ক করার কথা এবং একটা সময় পর্যন্ত এটা হয়েও ছিল, সেই মাযহাব নিয়েই একটা পর্যায়ে চরম মাত্রার বাড়াবাড়ি শুরু হল। কেউ মাযহাব মানাকে শিরক, হারাম বলে ভূষিত করতে শুরু করলেন, তো কেউ আবার নির্দিষ্ট একটি মাযহাব মানাকে ফরয ওয়াজিব বলে প্রচার করতে শুরু করলেন। এর সূত্র ধরে একে অপরকে ফাসিক্ক, মুনাফিক্ক ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করাও শুরু করে দিলেন। এর ফলে প্রান্তিকতা তো কমলই না, উল্টো আরো ব্যাপক হারে বেড়ে গেল।

এই বইটিতে দশটি অংশে সমগ্র আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত কলেবরেই ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথমেই প্রকাশনীর পক্ষ থেকে কিছু কথা ও ইমামের পরিচয় তুলে ধরার পর মূল বইটি শুরু হয়েছে। ইমাম প্রথমেই এই বই লেখার পেছনের প্রেক্ষাপট একেবারে অল্প কথায় ব্যক্ত করেছেন। তার পর রিসালাহ শুরু করেছেন দ্বীন আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্ কর্তৃক সংরক্ষিত এই মহাসত্যের কথা পাঠককে মনে করিয়ে দিয়ে। তারপর আলোচনা করেছেন কুরআনুল কারীমের সাত হারফের ব্যাপারে। সাত হারফ হল কুরআনুল কারীম সাতটি ভিন্ন ক্বিরাতে পাঠ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবেদনের প্রেক্ষিতে আল্লাহ এই উম্মাহর জন্য কুরআন পাঠকে সহজ করার লক্ষ্যে আরবে প্রচলিত সাতটি পঠনরীতিতে কুরআন পড়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর আমলে ইসলাম বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় সাহাবায়ে কিরাম কুরআনকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যাইদ ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর হারফ ছাড়া বাকি সব হারফে প্রচলিত কুরআন পুড়িয়ে ফেলেন যাতে উম্মাহর ঐক্য বজায় থাকে। এরপর ইমাম আলোচনা এনেছেন সুন্নাহর ব্যাপারে। সুন্নাহও যে কুরআনের মতই সংরক্ষিত এটা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন তিনি। এর পরে আলোচনা করেছেন ফিকহ সংকলন নিয়ে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার পর ইমাম মাযহাব বিরোধীদের উত্থাপিত কিছু আপত্তির ‘ইলমী জবাব দিয়েছেন। এই অংশটি পড়লে অবাক হতে হয় এই ভেবে যে ইমাম ইবনু রজব কত আগে এই রিসালাহটি লিখেছিলেন অথচ পড়লে মনে হয় সাম্প্রতিক কালের দিকে লক্ষ্য রেখেই তাঁর এই লেখা। সালাফদের লেখার বারাকাহ এমনই!

মাযহাবের ব্যাপারে সংশয় ও আপত্তির খণ্ডনের পর আলোচ্য বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করার জন্য তিনি ইমামুস সুন্নাহ আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে নিয়ে কিছু আলোচনা করেছেন। হাম্বলি মাযহাবের একজন ‘আলিম হিসেবে ইমাম আহমাদকে নিয়ে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা পেশ করেছেন তিনি। ইমাম আহমাদের ‘ইলমী অবস্থান ও তাঁর কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আলোচনার মাধ্যমে তিনি একজন ‘আলিমের অনুসরণ করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। আমল করার ক্ষেত্রে সালাফের রীতি নিয়েও নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। সবশেষে তালিবুল ‘ইলমদের প্রতি দান করেছেন অত্যন্ত মূল্যবান নাসীহাহ। এই ফিতনার যুগে প্রতিটি মুসলিমের তাঁর এই নাসীহাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তিনি তালিবুল ‘ইলমদের তাদের ‘ইলম ও অবস্থানের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন তারা যেন তর্ক বিতর্ক করে করে ধ্বংস না হয়ে যায়। অহেতুক তর্ক করা,লম্বা লম্বা কথা বলা, অনর্থক আলোচনা করা, মাস’আলা অধিক দীর্ঘ করা,ইমামদের দোষ খুঁজে বের করা,নিজেকে সালাফদের চেয়ে বড় মনে করা ইত্যাদি মারাত্মক দোষ ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকার জন্য হৃদয়গ্রাহী ভাষায় নসীহত করেছেন। তাঁর এই মূল্যবান নাসীহাহ শুধুমাত্র তালিবুল ‘ইলমদের জন্যই নয়, বরং সকল মুসলিমের জন্যই বেহদ উপকারি। আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্ যেন ইমামকে এর যোগ্য প্রতিদান দান করেন। আমীন।

“মাযহাব বিরোধিতার খণ্ডন” – সুবুতের প্রথম প্রকাশনা। অনলাইন থেকে অফলাইন জগতে পদার্পণের প্রথম পদক্ষেপেই এমন একটি বই উপহার দেওয়া তাদের প্রতি প্রত্যাশাকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক। বইয়ের প্রচ্ছদ খুব সহজ সরল কিন্তু নিঃসন্দেহে চমৎকার। শক্ত মলাট,মজবুত বাঁধাই, উন্নত মানের পৃষ্ঠা,বানানের বিশুদ্ধতা,অনুবাদের সহজিয়া ভঙ্গি,চমৎকার ফন্টের টাইপ আর সেই সাথে অসাধারণ বিষয়বস্তু নির্বাচন – সব মিলিয়ে একটি মনোমুগ্ধকর কাজ! আল্লাহ সুব’হানাহু ওয়া তা’আলা সুবুত প্রকাশনীকে কবুল করে নিন এবং তাদেরকে এরকম মূল্যবান আরো অসংখ্য বই পাঠকদের উপহার দেওয়ার তাওফীক্ক দান করুন। আমীন।

হ্যাপি থেকে আমাতুল্লাহ

November 8, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *