শেকড় সন্ধানী উপন্যাসিক শফীউদ্দীন সরদার ও কিছু স্মৃতি

আবু আশফাকঃ আধুনকি বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের ময়দানে প্রায় একক সৈনিক, কর্মবীর তিনি। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠার সকল গুণ থাকলেও শুধুমাত্র ইসলামী ভাবধারার লেখনির কারণে তিনি আমাদের তথাকথিত সাহিত্যিকদের কাছে অপাক্তেয়। মিডিয়া অনেক লেখককে জনপ্রিয় করে তোলে, কিন্তু স্ব-কীর্তিতে জনপ্রিয় হওয়া সাহিত্যিকের অভাব যে খালি চোখেও দেখা যায় তা বলাই বাহুল্য। যারা কোনো মিডিয়া বা পৃষ্ঠপোষকতার কল্যাণে বড় লেখক না হয়ে স্ব-কীর্তি আর খুরধার লেখনি দিয়ে নিজেকে সাহিত্যের বিদগ্ধ একদল পাঠকের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন- এমনই একজন ঐতিহাসিক উপন্যাসিক শফীউদ্দীন সরদার।

যারা তার উপন্যাস পড়েছেন তাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মতো কিছু নেই। কারণ তার লেখনির প্রতিটা ছত্রে ছত্রেই পরিচয় ভাস্বর হয়ে আছে।

বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে যারা মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ হুমায়ূন আহমেদের ‘মাতাল হাওয়া’ , ‘বাদশাহ নামদার’ ও এখনো প্রকাশের অপোয় ‘দেয়াল’ কিংবা ছোটদের জন্য ‘সূর্যের দিন’ আনিসুল হকের ‘মা’ ও ‘যারা ভোর এনেছিল’ হরিপদ দত্তের ‘মোহাজের’ পড়েছেন, তারা শফীউদ্দীন সরদারের উপন্যাস পড়লেই বুঝতে পারবেন তার স্বকীয়তা।

শফীউদ্দীন সরদারের জন্ম ১৯৩৫ সালে নাটোর জেলার হাবিলা নামক গ্রামে। বর্তমান বাসাও নাটোর শহরের শুকুলপট্টিতে। তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক, অবসর প্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট। সর্বোপরি তিনি এখন আমাদের কাছে একজন সফল ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক। ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এই লেখক পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন নব্বই দশকের শেষের দিকে। দৈনিক ইনকিলাবে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’ নামক উপন্যাসের মাধ্যমে। যেটি বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে মদীনা পাবলিকেশন্স হতে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই পাঠক, সমালোচক ও সুধীজনের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। বইয়ের বর্ণনার ভাষাশৈলী, ঘটনার ধারাবাহিকতা, সংঘটিত সময়ের জীবন-যাত্রার যথার্থ উপস্থাপন, পাত্র-পাত্রীর সংলাপে পরিমিতবোধ ইতিহাসের যথার্থ উপাদান প্রভৃতি মিলিয়ে পাঠকের বিশ্বাস হয় এজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখকের আগমনের। আর লেখকও পাঠকের বিশ্বাসের প্রতি আস্থা রেখে উপহার দিতে থাকেন একের পর এক সুখপাঠ্য ঐতিহাসিক উপন্যাসের।

এরপর এই একই পত্রিকায় লেখকের আরো দুইটি উপন্যাস ধরাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। যথারীতি আগেরটির মতই জনপ্রিয়তা পায়। উপন্যাস দুটি হল, বার পাইকার দূর্গ ও যায় বেলা অবেলায়। এছাড়াও লেখকের ‘সূর্যাস্ত’ উপন্যাসটিও অধুনা লুপ্তপ্রায় সাপ্তাহিক মুসলিম জাহানে প্রকাশিত হওয়ায় দেশের মাদ্রাসা শিতি পাঠকের কাছে দ্রুতই তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। এরই ফলে এই পত্রিকার প্রতিটি ঈদ সংখ্যায় লেখকের উপন্যাস কমন আইটেম হয়ে যায়। অনেকগুলো উপন্যাস আমরা এই সাপ্তাহিকটির কল্যাণে পাঠ করতে পারি।

ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এই লেখক পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন নব্বই দশকের শেষের দিকে। দৈনিক ইনকিলাবে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’ নামক উপন্যাসের মাধ্যমে। যেটি বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে মদীনা পাবলিকেশন্স হতে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই পাঠক, সমালোচক ও সুধীজনের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়

লেখকের কলম থেকে আজ পর্যন্ত আমরা পেয়েছি প্রায় অর্ধশত বই। এর মধ্যে ছাব্বিশটিই ঐতিহাসিক উপন্যাস। এই ছাব্বিশটি উপন্যাসের ইতিহাসের বিস্তৃতি হল ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির আগমন পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময় পর্যন্ত। আর এই একটি জায়গায় লেখকের অনন্যতা। কারণ বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শাখায় আর আগে কারও নামের পাশে এতগুলো ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার কৃতিত্ব নেই। নেই প্রায় আট’শ বছর বিস্তৃত সময়কে কেন্দ্র করে এত দীর্ঘ কোন সিরিজ লেখার কষ্টসাধ্য সাধনার কৃতিত্বও। আর এই বিশাল কর্মটি করতে লেখকের সাহিত্য সাধনার সময়টাও একটা বড় বিষ্ময়। মাত্র বিশ বছর সাহিত্য সাধনায় তিনি এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি সম্পাদন করেন। কতটুকো ডেডিকেটেড থাকলে এ বিশাল সাহিত্য সম্ভার নির্মাণ করা সম্ভব এটা একজন সাহিত্যকর্মী মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন।

শফীউদ্দীন সরদারের ছাব্বিশটি উপন্যাসের বিষয় আর সময়কাল নিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠবে। লেখক ঐতিহাসিক উপন্যাসের এই দীর্ঘ সিরিজটি শুরু করেছেন ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’ নামক উপন্যাসের মাধ্যমে যা আগেই বলা হয়েছে। আর এটি শেষ করেছনে দখল নামক বইটির মাধ্যমে। প্রকাশনার আগ-পিছ হলেও ইতিহাসের পরম্পরায় এটিই এই সিরিজের শেষ উপন্যাস এখন পর্যন্ত। এটা লেখকেরও ভাষ্যও।

লেখকের ঐতিহাসিক উপন্যাসের নাম ও বিষয় নিম্নরূপ :
০১. বখতিয়রের তলোয়ার : ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয়।
০২. গৌড় থেকে সোনার গাঁ : বাংলায় স্বধীন সালতানাতের প্রতিষ্ঠা।
০৩. যায় বেলা অবেলায় : গিয়াস উদ্দীন আযম শাহ্র রাজত্বকাল।
০৪. বিদ্রোহী জাতক : রাজা গণেশের রাজত্বকাল।
০৫. বার পাইকার দূর্গ : সুলতান বারবাক শাহ্ ও দরবেশ ইসমাঈল গাজীর সময়কাল।
০৬. রাজ বিহঙ্গ : সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ্ এর রাজত্বকাল।
০৭. শেষ প্রহরী : দাউদ খান কররানী ও কালাপাহাড় এর সময়কাল। (এই বইটি কলকাতা থেকেও প্রকাশিত।)
০৮. প্রেম ও পূর্ণিমা : সুবাদার শায়েস্তা খানের সময়কাল।
০৯. বিপন্ন প্রহর : নবাব মুশিদ কুলি খান ও সরফরাজ খান এর রাজত্বকাল।
১০. সূর্যাস্ত : পলাশীতে স্বাধীন বাংলার স্বাধীনতার সূর্যাস্ত।
১১. পথ হারা পাখি : ফকির মজনু শাহ্।
১২. বৈরী বসতি : সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, তিতুমীর প্রমুখ।
১৩. বখতিয়ারের তিন ইয়ার : বখতিয়ার খিলজীর সাথে আসা তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর জীবন।
১৪. দাবানল : সিপাহী বিদ্রোহের শুরু ও শেষ।
১৫. রোহিনী নদীর তীরে : সতীদাহ প্রথার উচ্ছেদে আকবরের বাধা দান বিষয়ক।
১৬. ঈমানদার : দাক্ষিণাত্যের একজন প্রভাবশালী মুসলমান।
১৭. ঠিকানা : ১৯৪৭ এর দেশবিভাগ।
১৮. ঝড়মুখী ঘর : দেশ বিভাগ পরবর্তী সময় থেকে ভাষা আন্দোলন ও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম।
১৯. অবৈধ অরণ্য : স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর সময়।
২০. দখল : ১৯৭১ পরবর্তী সময় থেকে আশির দশক শুরু পর্যন্ত।
২১. দীপান্তরের বৃত্তান্ত : আন্দামানের বন্দীদের নিয়ে।
২২. অন্তরে প্রান্তরে :
২৩. রাজনন্দিনী : সামাজিক ঐতিহাসিক।
২৪. রুপনগরের বন্দী :
২৫. লা ওয়ারিশ : লেখকের আত্মজৈবনিক।
২৬. বার ভূঁইয়ার উপাখ্যান : বাংলার বার ভূঁইয়া।

এছাড়াও লেখকের অপূর্ব অপেরা, চলনবিলের পদাবলী ইত্যাদি নামে কয়েকটি সামাজিক উপন্যাস রয়েছে।

উৎসঃ আওয়ার ইসলাম

সাহিত্যের গায়ে রাজনীতির পোশাক পরাইনি : আল মাহমুদ

October 10, 2017

‘ব্লু হোয়েল’: পরিচিতি, প্রতিকার-প্রতিরোধ ও সচেতনতা

October 10, 2017

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *