পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি

লেখক মাওলানা যুবায়ের হোসাইন

প্রকাশক মাকতাবতুস সিদ্দীক

পৃষ্ঠা সংখ্যা 104

মুদ্রিত মুল্য ৳ ১১০.০০

ছাড়ে মুল্য ৳ ৬৬.০০

রেটিং

ক্যাটাগরি ইসলামি বই

এক কালে এসে এ ভূখন্ড ও এ জনগোষ্ঠী মুসলিম শাসকদের অধীনস্থ হয়েছে। অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দূরত্ব কমে আসতে শুরু করেছে। ইলমের উপায় উপকরণের আদান প্রদানের রাস্তা খুলেছে এবং ইলম চর্চার একটা আবহ তৈরি হয়ে ইলমের বাতাস বইতে শুরু করেছে। ইলমের কেন্দ্রসমূহ থেকে দ্বীনের ধারক বাহকগণের আগমন, আবার এ অঞ্চলের মুসলমানদের ইলম শেখার জন্য কেন্দ্রগুলোর দিকে সফর করা এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

#মূল্যায়ন:
এ পর্যায়ে এসে যে বাস্তবতাগুলো আমাদেরকে মেনে নিতেই হবে তা হচ্ছে, ইসলামের কেন্দ্রীয় খেলাফত তথা খেলাফতে রাশেদা, খেলাফতে বনু উমাইয়া এবং খেলাফতে আব্বাসিয়ার স্বর্ণযুগে এ অঞ্চলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় খেলাফতের সংযোগ তৈরি হয়নি। যখন সংযোগ হয়েছে তখন কেন্দ্রীয় খেলাফত ছিল বহুধা বিভক্ত। খেলাফত তখন এমন ব্যক্তিদের তত্তাবধানে চলছিল যারা দ্বীন ও দ্বীনী ইলমের খেদমত করেছেন বলা চললেও তাদেরকে দ্বীন ও ইলমে দ্বীনের মাপকাঠি বলা চলে না। 
উপরন্তু যেসব মুসলিম শাসক আমাদের ভাগ্যে জুটেছিল তারা কেন্দ্রীয় খেলাফতের প্রতিনিধি ছিলেন না। কেন্দ্রীয় খেলাফতের রাষ্ট্রযন্ত্র এক পর্যায়ে দ্বীনের সঠিক মাপকাঠি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়লেও দ্বীনের ধারক বাহক ওলামায়ে কেরাম তখনও দ্বীনের সঠিক মাপকাঠি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েননি। কিন্তু আমাদের মুসলিম শাসকবর্গ কেন্দ্রীয় খেলাফতের প্রতিনিধি না হওয়ার কারণে দ্বীন ও ইলমের রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। রাষ্ট্রীয় তত্বাবধান থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল এবং মুসলিম বিশ্বের সকল অঙ্গনের দ্বীনের প্রহরী ওলামায়ে কেরাম থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিল।
আমাদের মুসলিম শাসকবর্গ ছিলেন স্বায়ত্ব শাসন প্রতিষ্ঠাকারী কোন ক্ষমতার অধীনে, বা কেন্দ্রীয় খেলাফতের সঙ্গে বিদ্রোহকারী কোন শাসকের অধীনে অথবা ভিন দেশী ইসলামের শত্রুর ঘরে জন্ম নেয়া কোন মুসলমান শাসকের অধীনে। যে শাসকবর্গের কাছে দ্বীন ও ইলম উত্তরাধিকারের সঠিক পদ্ধতিতে পৌঁছেনি। 
এ শাসকবর্গ মুসলমান ও ইসলামের জন্য বহু অবদান রেখেছেন, শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন -এসব কিছু মেনে নেয়ার পরও এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, দ্বীনের বিষয়ে তাদের নিজস্ব কিছু বুঝ ছিল, জন্মসূত্র ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে যা থেকে মুক্ত হওয়া তাদের জন্য স্বাভাবিকভাবে সম্ভব ছিল না বা সম্ভব হলেও বাস্তবে তা হয়ে ওঠেনি। 
যারা শিয়া মতবাদ থেকে জন্ম নিয়েছেন তারা এ মতবাদের মৌলিক বিশ্বাসগুলো থেকে নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টা করেননি, আবার কেউ করলেও পারেননি। যারা শুধুই ক্ষমতাপ্রেমী-স্বৈরাচারী ক্ষমতাবানদের ঘর থেকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন তারা তাদের হাজারো মহা গুণের সমাহার সত্তেও দ্বীনের ও দ্বীনী ইলমের সঠিক মুখপাত্র হওয়ার যোগ্য হননি। যার ফলে এ সকল মুসলিম শাসক ইসলামী শাসনের সঙ্গে তাদের নিজস্ব আকীদা, রুচি, দুর্বলতা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্বার্থগুলোকে জুড়ে দিয়েছেন। 
ওলামায়ে কেরামের উপস্থিতি ছিল, কিন্তু তাদের ইলম এতটা প্রভাব বিস্তারকারী ছিল না যা শাসকের ভুল গতি-পথকে রোধ করতে পারে। দ্বীনের মূল অবয়বকে স্বচ্ছ রাখার জন্য যে অস্বাভাবিক সাহসিকতা প্রদর্শনের প্রয়োজন ছিল, তা প্রদর্শন করা হয়নি। যার দরুন الناس علی دین ملوكهم (রাষ্ট্র প্রধানের রীতি-নীতিই মানুষ গ্রহণ করে) -এরই অনুশীলন হয়েছে অনেক বেশি। দ্বীনের সঠিক বুঝের মধ্যে ঘাটতি রয়ে গেছে অনেক। ইলমের সঠিক চর্চা ও তার সঠিক প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই বাধার মুখে পড়েছে। 
দেখুন, কুরআনের ধারাবাহিক সনদ রয়েছে, হাদীসের ধারাবাহিক সনদ রয়েছে, ফিকহের ধারাবাহিক সনদ রয়েছে, আজো পর্যন্ত বলবৎ আছে। এ
সনদের কোথাও বিচ্ছিন্নতা গ্রহণযোগ্য নয়। এরকমভাবে দ্বীনের সহীহ ও সঠিক বুঝবৃক্ষেরও একটি সনদ রয়েছে যে সনদের সঙ্গে আমরা আমাদেরকে-ভারত উপমহাদেশকে যুক্ত করতে পারিনি। দীর্ঘকালের বিচ্ছিন্নতা এবং পরবর্তীতে সেতু বন্ধনের দুর্বলতা আমাদেরকে শতাব্দীর পর শতাব্দী দূরে রাখতেই সক্ষম হয়েছে।

#প্রবাহ_শুরু_হয়েছে
এরপরও মুসলিম শাসন, শিক্ষার জন্য সফর, দ্বীনের দাঈগণের আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনা, দ্বীন ও শরীয়তের মৌলিক গ্রন্থাবলীর আমদানি, আঞ্চলিক দ্বীনী চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন শিরোনামে গ্রন্থাবলী প্রণয়নের মাধ্যমে ঈমানের হাওয়া গতিশীল হয়েছে। তবে ঈমানের দাওয়াতের বিস্তৃতি ও গ্রহণযোগ্যতার সাথে ঈমানের শিক্ষা ও ইলমে দ্বীন চর্চার যে আনুপাতিক হার বজায় থাকার দরকার ছিল তার শত ভাগের এক ভাগও থাকেনি। 
-"কথাটি আমি আবারও বলছি, ঈমানের দাওয়াতের বিস্তৃতি ও গ্রহণযোগ্যতার সাথে ঈমানের শিক্ষা ও ইলমে দ্বীন চর্চার যে আনুপাতিক হার বজায় থাকার দরকার ছিল তার শত ভাগের এক ভাগও থাকেনি। আর তা সম্ভবও নয়। কারণ দ্বীন সম্প্রসারণের স্বাভাবিক ও ‘মাসূর’- অনুসৃত পদ্ধতি ছিল পর্যায়ক্রমে দাওয়াত, জিহাদ, বিজয়, শাসন ও প্রশাসন -যা একটি ভূখন্ডের সকল নাগরিককে ছুঁয়ে যায় এবং কেউ নিজেকে আড়াল করে রাখতে পারে না, আড়াল করে রাখার প্রয়োজনবোধ করে না; বরং দ্বীনী ও ইলমী বিষয়ে প্রতিযোগিতাপ্রবণ হয়ে ওঠে"। 
আমাদের ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন, প্রচার ও শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে পাতা উল্টালে এ স্বাভাবিক ও মাসূর-অনুসৃত পদ্ধতিটি পাওয়া যায় না। তাই বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম ভূখন্ডগুলোর সঙ্গে এ উপমহাদেশ ও এর মত ভূখন্ডগুলোকে তুলনা করা চলে না।
এ সকল বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েও দাবি করা যায় যে, অনেক দেরীতে হলেও এ উপমহাদেশে ইলমের চর্চা হয়েছে। দ্বীনী ইলমের প্রায় সকল

বিভাগে কাজ করার মত এবং সকল বিষয়ে গবেষণা করার মত যোগ্য ব্যক্তিবর্গ তৈরি হয়েছেন। বড় বড় ইলমের শহর গড়ে উঠেছে। আস্থা রাখা যায় এমন গবেষণাকেন্দ্রসমূহ গড়ে উঠেছে। গবেষণাধর্মী রচনাবলী তৈরি হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য হারেই তা জনসমক্ষে এসেছে। গোটা মুসলিম বিশ্বকে খোরাক দিতে পারে এমন রচনাসমগ্রও তৈরি হয়েছে। ঈর্ষার পাত্র হওয়ার মত অবদান মুসলমানের সামনে এসেছে। এ সত্য আমরা স্বীকার করি, গর্ব করি এবং পুরা মুসলিম বিশ্বকেই তা স্বীকার করতে হবে।

আপনি লগড ইন নাই, দয়া করে লগ ইন করুন

ক্যাটাগরি বই