আরজ আলী সমীপে

লেখক আরিফ আজাদ

প্রকাশক সমকালীন প্রকাশন

আইএসবিএন 9789843439567

পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫২

মুদ্রিত মুল্য ৳ ২৫০.০০

ছাড়ে মুল্য ৳ ১৮৫.০০(-26% Off)

রেটিং

ক্যাটাগরি নাস্তিক্যবাদ, সংশয়বাদ ও অজ্ঞেয়বাদ , বেস্ট সেলার বুকস , ইসলামি আদর্শ ও মতবাদ

আরজ আলী ‘পরলোকের স্বরূপ কী’ এবং ‘স্বর্গ নরক কোথায়?’ শিরোনামে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এই শিরোনামের প্রশ্নে উনার মূল বক্তব্য এরকম, - মানুষ যেহেতু জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে গেছে, পদার্থের অণু হতে পরমাণু পর্যন্ত ভেঙে এখন তার শক্তি পরীক্ষা করতে পারছে, সেহেতু, পরকাল বা পরজগত যদি থেকেই থাকে, তাহলে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিকগন পরকালকে দেখতে পায় না কেনো?
উনি আরো বলেছেন, - পরকাল যদি থেকেই থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই যেকোন এক সৌরজগতের অধীন। এখন , পরকালের বর্ণনা থেকে যেহেতু জানা যায় যে কিয়ামতের ময়দানে সূর্যের প্রখর তাপে পাপীদের মস্তিস্ক বিগলিত হবে, তাহলে পরকালেও একটি বা একাধিক সূর্য থাকবে। যদি সূর্য থেকে থাকে, তাহলে সেই সূর্য কী ঘুরবে? সেখানেও কী দিনরাত্রি হবে?

আরজ আলীর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে হয়, মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে কতোটুকু এগিয়েছে ঠিক বলতে পারিনা, তবে বিজ্ঞানের দিক থেকে যে খুব একটা মানুষ এগুতে পারেনি এখনো, বিজ্ঞান এখন সেটা অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করে।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কার হওয়ার পরে এই সত্য আরো সহজ হয়ে ফুটে উঠেছে। এতোদিন মানুষ ভাবতো, তারা মনে হয় মহাবিশ্বের সকল রহস্য জেনে বসে আছে। 
বিশাল মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে এমন কোন জায়গা হয়তো নেই যেখানে বিজ্ঞানীদের টর্চ লাইটের আলো কিংবা হাবলের টেলিস্কোপ গিয়ে হানা দিয়ে আসেনি।
প্রকৃতির এমন কোন রহস্য হয়তোবা নেই যেটার পেছনের রহস্য মানুষ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়নি। এরকম অবস্থায় বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে থাকা মানুষকে বিশাল একটি শোকের সংবাদ শোনালো আমেরিকা ভিত্তিক বিজ্ঞানী সংস্থা ‘নাসা’। 
তারা জানাচ্ছে, এই সুবিশাল মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ আদতে খুব অল্পই জানতে পেরেছে। সমগ্র মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের জানার পরিমাণ অত্যন্ত ক্ষুদ্র। নাসা জানাচ্ছে, এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষ এখন পর্যন্ত কেবল মাত্র ৫% জানতে পেরেছে। বাকী ৯৫% সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানেনা, কিছুই না।
আরজ আলী যখন বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে হাবলের টেলিস্কোপ দিয়ে কোন এক সৌরজগতে জান্নাত-জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ খুঁজতে ব্যস্ত, তখন বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি নিতান্তই সীমিত।
তারা জানাচ্ছে, এতো এতো প্রযুক্তি, এতো এতো উন্নত বিজ্ঞান, কলা কৌশল প্রয়োগ করেও আমরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৫% মহাবিশ্বকে জানতে পেরেছি। বাকী ৯৫% সম্পর্কে আমরা নাকী কিছুই জানি না। আমাদের মহাবিশ্ব, আমাদের পৃথিবী, আমাদের চারপাশের জগত, পদার্থের অণু, পরমাণু ইত্যাদি সবকিছু মিলে মাত্র ৫% । বাকী ৯৫% তাহলে কী? এই বাকী ৯৫% হলো অদৃশ্য বস্তু। আমাদের বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘ডার্ক ম্যাটার’। এই ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা সম্প্রতিই জানতে পেরেছি, কিন্তু এখানে কী আছে, এখানে আসলে কী হয়, এটা কোন জগত, এটা যদি কোন জগত হয়ে থাকে তাহলে সেই জগতের রহস্য কী কোনকিছুই আমাদের কাছে ক্লিয়ার নয়। 
এই ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে NASA বলছে, - ‘More is unknown than is known. No one expected this, no one knew how to explain it. But something was causing it. It is a complete mystery. But it is an important mystery’

অর্থাৎ, সেই জগতটা কেমন, সেখানে কী হয় তা নিয়ে আমাদের কোন ধারনা নেই। পুরো মহাবিশ্ব সম্পর্কে মাত্র ৫% জ্ঞান নিয়ে, বাকী ৯৫% এর ডার্ক ম্যাটারের জগত নিয়ে আরজ আলীরা যদি ‘জান্নাত – জাহান্নাম নাই। থাকলে দেখিনা কেনো’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে, তখন সত্যিকার অর্থেই হাসি পায় বৈকি!

তাছাড়া, আরজ আলীরা ধরেই নিয়েছেন যে, জান্নাত-জাহান্নাম, পরকাল বলে কিছু থেকে থাকলে প্রকৃতি তা আমাদের সামনে মেলে ধরবে , আর আমরা বিজ্ঞানের রঙীন চশমা চোখে লাগিয়ে তা দিব্যি দেখে ফেলতে পারবো। 
কিন্তু, বিজ্ঞান কী আমাদের প্রকৃতির সব রহস্য জানাতে পারবে? এর সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে- ‘না’।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স এসে বিজ্ঞানের এই ধ্রুব সত্যটা আমাদের সকলের কাছে পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। 
বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তি, বিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্যার উনার ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ বইয়ের শুরুতেই এই সত্যটা অকপটে স্বীকার করেছেন। 
তিনি তাঁর বইয়ের দশম পৃষ্টায় লিখেছেন, - ‘কাজেই যারা বিজ্ঞান চর্চা করে তারা ধরেই নিয়েছে আমরা যখন বিজ্ঞান দিয়ে পুরো প্রকৃতিটাকে বুঝে ফেলবো, তখন আমরা সবসময় সবকিছু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। যদি কখনো দেখি কোনো একটা কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছিনা, তখন বুঝতে হবে এর পেছনের বিজ্ঞানটা তখনো জানা হয়নি। যখন জানা হবে তখন সেটা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবো। এককথায়, বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বা ভবিষ্যদ্বাণী সবসময়েই নিঁখুত এবং এবং সুনিশ্চিত। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বিজ্ঞানের এই ধারণাটাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, প্রকৃতি আসলে কখনোই সবকিছু জানতে দেবেনা। সে তার ভিতরের কিছু কিছু জিনিস মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। মানুষ কখনোই সেটা জানতে পারবেনা। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এটা কিন্তু বিজ্ঞানের অক্ষমতা বা অসম্পূর্ণতা নয়। এটাই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা একটা পর্যায়ে গিয়ে কখনোই আর জোর গলায় বলবেন না ‘হবে’ , তারা মাথা নেড়ে বলবেন,- ‘হতে পারে’।

জাফর ইকবাল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দোহাই দিয়ে বলছেন, - “বিজ্ঞান দিয়ে কখনোই আমরা প্রকৃতির সকল রহস্য উদঘাটন করতে পারবো না। কিছু কিছু রহস্য আমাদের কাছ থেকে লুকানোই থেকে যাবে”।

এই যখন বিজ্ঞানের হাল, তখন সেই বিজ্ঞানের ঘাঁড়ে সওয়ার হয়ে বৈজ্ঞানিক ফিতা দিয়ে বাস্তব দুনিয়া রেখে ‘পরাবাস্তব’ দুনিয়ার জান্নাত – জাহান্নামের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ্য মাপতে নামাটা নিতান্তই নিম্নবুদ্ধির পরিচায়ক নয় কী?

তাছাড়া, বিজ্ঞান যে ‘পরকাল’ সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই দিচ্ছেনা তাও কিন্তু নয়। সাইন্টিফিক ওয়ার্ল্ডে এখন ‘Afterlife’ নিয়ে ব্যাপক কাজ হচ্ছে। 
অনেক বিজ্ঞানী এখন এই ‘Afterlife’ তথা ‘পরকাল’ নিয়ে গবেষণা করছেন। এক্ষেত্রে মেডিকেল সাইন্সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি পাওয়া ‘Near Death Experience’ ফিল্ডের কথা উল্লেখ করা যায়।
Near Death Experience কী? Near Death Experience হচ্ছে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গিয়ে সেখান থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার উপর একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা।
একসিডেন্ট , হার্ট এ্যাটাক বা অন্য কোন কারণে যখন মানুষের হার্ট এবং ব্রেইন উভয়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন মেডিকেলীয় ভাষায় সেটাকে ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ বলা হয়। ডাক্তারগণ ঘোষণা করেন যে ব্যক্তিটা মৃত। ‘ক্লিনিক্যালি ডেথ’ ঘোষণা করার পরেও অনেক সময় কিছু কিছু লোক আল্লাহর ইচ্ছাতে প্রাণ ফিরে পায়। তারা বেঁচে উঠে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গায় এরকম অহরহ ঘটনা ঘটে থাকে। ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষিত হবার পরও মৃত ব্যক্তির প্রাণ ফিরে পাওয়া। 
এরকম ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে বেঁচে আসা লোকদের নিয়ে কাজ করে ‘Near Death Experience Research Foundation’ । এই ফাউন্ডেশনের কাজ হলো বিশ্বের যে প্রান্তেই এরকম ‘ক্লিনিক্যাল ডেথ’ মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তথ্য সংগ্রহ করা।
এখন পর্যন্ত এই ফাউন্ডেশন প্রায় পাঁচ হাজার ক্লিনিক্যালি ডেথ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করেছে। 
পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় সবার এক্সপেরিয়েন্স এক্ষেত্রে একরকম হয়।
ক্লিনিক্যালি ডেথ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মানুষজন জানায়, তাদের হার্ট, ব্রেইন নিষ্ক্রিয় দেখে তাদের যখন ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষণা করা হয়, তারপরও তারা তাদের চারপাশের সবকিছু দেখতে, শুনতে ও বুঝতে পারে। তারা বিচিত্র কিছু আলো দেখতে পায়। কারো কারো অভিজ্ঞতা এক গভীর নিকষ অন্ধকারের মধ্যে তাদের ছুটতে হচ্ছে, আবার কারো কারো অভিজ্ঞতা তারা ধবধবে সাদা , শুভ্র আলোর ঝলকানি দেখতে পায়।
তারা জানায়, এই অবস্থায় তারা (মেইনলি তাদের আত্মা) বাঁধাহীনভাবে চলাফেরা করতে পারে।
এমনকি, তখন তারা তাদের জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে।

এই পাঁচ হাজার লোকের এরকম Near Death Experience কে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে বিজ্ঞানী Jeffrey Long একটি বই লিখেন। বইটির নাম- ‘Evidence Of The Afterlife’…
মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে গবেষণা করছে এরকম আরো অনেক বিজ্ঞানী আছে, যেমন- Dr. Marry Neal, Dr. Kevin Nelson, DR. Sam Parnia, DR. Jeffrey Long, Dr. Mario Beauregard, Dr. Peter Fenwick সহ অনেকে। এই Near Death Experience নিয়ে বিভিন্ন সাইন্টিফিক জার্নালে আর্টিকেল লেখা হচ্ছে, বই লেখা হচ্ছে, প্রামাণ্যচিত্র বানানো হচ্ছে।

আফসোস করতে হয়, বিজ্ঞানের ফিতা দিয়ে পরকালের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ্য মাপতে চাওয়া আরজ আলীরা যদি আজকের দিনে বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো দেখতে পেতেন যে, পরকালও বিজ্ঞানের গবেষণার অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। যে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে তারা বালুর মধ্যে মুখ গুঁজে পরকালকে অস্বীকার করতো, সেই বিজ্ঞানই যে একসময় তাদের দিকে বুমেরাং হয়ে ফেরত আসবে তা যদি তারা জানতো!!

 

আপনি লগড ইন নাই, দয়া করে লগ ইন করুন