খারেজি (উৎপত্তি, চিন্তাধারা ও ক্রমবিকাশ)

লেখক ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি

অনুবাদক ড. মোঃ আব্দুল মান্নান

প্রকাশক কালান্তর প্রকাশনী(সিলেট)

পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৩৬

মুদ্রিত মুল্য ৳ ১৮০.০০

ছাড়ে মুল্য ৳ ১৩৫.০০(-25% Off)

রেটিং

ক্যাটাগরি নতুন বই

কুরআনুল কারিম ও হাদিসে নববির নির্দেশ উপেক্ষা করে, নিজের মতামতকে প্রধান্য দিয়ে সাহাবায়েকেরাম রাদি.-গণের জীবদ্দশায়ও বিভিন্ন দলের উদ্ভব ঘটেছে। আজও ইসলামের নামে বিভিন্ন দলের সৃষ্টি হচ্ছে। এই সমস্ত ভ্রান্ত ফেরকা ও মতবাদ সম্পর্কে ধারনা না থাকলে, এই ফিতনার যুগে ঈমান বাঁচানো সম্ভর নয়।

ইসলামের প্রথম যুগে বেদআ'তিরা যেসকল ফেরকার তৈরি করেছিল তাদের সামনে মূলধারার মুসলীম মনীষাগণ যারা “আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত” নামে পরিচিত তাদের অবস্থান সব সময়ই পরিষ্কার ছিল। তারা বেদাআ'তি ফেরকার আকিদা ও আমলের ভ্রান্তি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে উম্মাহের সামনে তুলে ধরে সতর্ক করেছেন। তাদের এই প্রচেষ্টার ফলে আজও ইসলাম তার স্বমহীমায় টিকে আছে।

ইসলামের তৃতীয় খলিফাতুল মুসলিমীন উসমান রাদি. শাহাদাতের পর ফেরকা তৈরির যে সুচনা হয়, তা স্বপ্রতাপে চলে আসছিল, খলীফা মামুন ইবনে হারুনুর রশিদের যুগ পর্যন্ত। যিনি ১৯৮ হিজরি থেকে ২১৮ হিজরি পর্যন্ত খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে ছিলেন। তার যুগে এই সকল বেদাআ'ত ফেরকার অবস্থান আরও দৃঢ় হয়। কারণ তিনি যখন ইলমে কালাম বা দর্শন ও তর্কশাস্ত্র চর্চার পথ সুগম করে দেন, তখন বেদআ'তি ফেরকার পালে হাওয়া লাগে। লাগামহীন ভাবে ইসলামে নামে ভ্রান্ত আকিদাসমুহ যুন্তি-তর্ক দ্বারা প্রতিষ্টা করার চেষ্টা করা হয়। ইলমে কালাম বা দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের বিরুদ্ধে সলফে সালেহীন বিশেষ করে ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, কাজি ইউসুফ, ইমাম মুহম্মদ, ইমাম সুফিয়ান সাওরি রাহি. প্রমুখদের থেকে বক্তব্য পাওয়া যায়। ইবনে তাইমিয়া ইলমে কালামের কিছু বিষয় ভ্রান্ত বলে প্রত্যাখান করেছেন। 
[ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ]

ইমাম আবু হানিফা রহ. তার পুত্র হাম্মাদ ও তার ছাত্র আবু ইউসুফ রহ. সবাই ইলমে কালাম চর্চার বিপক্ষে ছিলেন। [ফিকহুল আকবার, অনুবাদ ও ব্যাখ্যা ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ.]

এইসব ফেরকার মধ্যে অন্যতম বাতিল ফেরকা হল খারেজি ফেরকা ।

এসব মৌলিক ফেরকাসমূহ থেকে অনেক ফেরকার সৃষ্টি হয়, যার কোনটির অস্তিত্ব আজও পৃথিবীতে বিরাজমান আবার কোনটি কালের গহবরে হারিয়ে গেছে। তাই বলে নতুন নতুন ফেরকার সৃষ্টি থেমে থাকেনি কোন কালে। গুরুত্বপূর্ণ এসব ফেরকার থেকে খারেজি ফেরকার নিয়ে সামান্য কিছু তুলে ধরছি ।

খারেজি একটি স্বতন্ত্র দল ও মতবাদরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটে ৩৭ হিজরিতে সিফফীনের যুদ্ধকালে। তবে ইতিহাসবিদ অনেকেরই ধারণা যে, খারেজির আবির্ভাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেই হয়ে ছিল কিন্তু তা ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের ঘটনা। এর প্রমাণ স্বরূপ তারা যুল খুআয়সারার ঘটনা উল্লেখ করেন।

আবু সাঈদ খুদরি (রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন___ 
"একবার আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ছিলাম। তিনি কিছু সম্পদ বন্টন করছিলেন। এমতাবস্থায় তামীম গোত্রের এক ব্যক্তি যুল খুআয়সারা আসল এবং বলল, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যায় করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমার ধ্বংশ হোক, আমি ইনসাফ না করলে কে করবে"। [ সহিহ বুখারি, ৩৬১০]

অন্য হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন___ 
"এর প্রজন্ম থেকে এমন এক সম্প্রদায় জন্ম নিবে, যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে কিন্তু তা তাদের কন্ঠনালী পার হবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন তীর শিকার থেকে বের হয়ে যায়। বর্ণনাকারী বলেন__ আমার মনে হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন___ 
যদি আমি তাদের পেয়ে যাই তাহলে আমি তাদের সামূদ কাওমের ন্যায় হত্যা করব"। [ সহিহ বুখারি, ৪৩৫১]

ওই ব্যক্তি ছিল প্রথম খারেজি যে, সবচেয়ে বড় ইনসাফপরায়ণ মহা মানব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বন্টনের প্রতি প্রকাশ্যে আঙ্গুল তোলে এবং নিজ রায়কে প্রাধান্য দেয়।

অন্য দিকে উসমানে গণী রাদি.- এর হত্যার ষড়যন্ত্রকারী এবং পরে অন্যায় ভাবে তাঁকে হত্যাকারী উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে ও ইমাম তাবারি ও ইবনে কাসির রহ. খারেজি বলে অভিহিত করেছেন। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,১০,২৭০,২৯৪]

কিন্তু ওই সময় পর্যন্তও খারেজি একটি সম্পূর্ণদল ও মতবাদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনি। দল হিসারে ৩৭ হিজরির দিকে আবির্ভান ঘটে ছিল।
সিফফীনের যুদ্ধকালে, যখন হযরত আলী ও মুআবিয়া রাদি. উভয়ের পক্ষ থেকে সমস্যার সমাধানার্থে দু'জন বিচারক নির্ধারণ করেন এই মর্মে যে, তারা দু’জনে মুসলিমউম্মাহর জন্য যা কল্যাণকর মনে করবেন, তা ফায়সালা করবেন এবং উভয় পক্ষ তাদের ফায়সালা মেনে নিবে। তাই হযরত আলী রাদি.- এর পক্ষ থেকে আবূ মূসা আল আশ'আরি রাদি. এবং মু'আবিয়া রাদি.- এর পক্ষ থেকে আমর বিন আস রাদি.- কে নির্ধারণ করা হয়। সালিস চুক্তির পর আশআস ইবনে কাইস তামিম গোত্রের নেত্রীস্থানিয় লোকদের সালিসের ফায়সালা পড়ে শুনান। সেখানে ছিল বারিয়া ইবনে হানজালা বংশের সন্তান উরওয়া ইবনে উযায়ন (মাতার নাম) সে দাড়িয়ে বলল তোমরা কি ধর্মিয় বিষয় ফায়সালার জন্য মানুষ কে বিচারক মানছ? এ কথা বলেই সে আশআস ইবনে কাইস তাহনের পিছে আঘাত করে। এতে আশআস ইবনে কাইস গোত্রের লোকেরা ভীষন রাগান্তিত্ব হন। পরে তার কাজের জন্য ক্ষমা চাইলে ক্ষামা করা হয়। হযরত আলী রাদি.-এর পক্ষের কিছু লোক যারা কুররা নামে পরিচিত ছিল তারাও ঐ ব্যক্তির কথায় উদ্বুদ্ধ হয়। এবং ঘোষনা দেয় “লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ” (আল্লাহ তা'আলার বিধান ছাড়া কারো বিধান মানি না, মানব না।) 
এর পর হযরত মু'য়াবিয়া রাদি. সিরিয়ার দিকে আর হযরত আলী রাদি. কুফার দিকে রওয়ানা দেন কুফা দ্বারপ্রান্তে এসে বার হাজার লোক তাঁর থেকে আলাদা হয়ে যায়। ইতিহাসে এরাই খারেজি নামে পরিচিতি লাভ করে। এরা হযরত আলী রাদি. সাথে কুফা থাকতে অস্বীকৃতি জানায়। অতঃপর তারা যেমন হযরত আলী রাদি.-কে পরিত্যাগ করে, তেমন মুসলিম জামাআ'তকেও পরিত্যাগ করে হারূরা নামক স্থানে বসবাস শুরু করে। প্রথমে হযরত আলী রাদি. হযরত ইবনে আব্বাস রাদি.-কে তাদের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাদের সাথে বাহাস করেন, যার ফলে কিছু লোক তাদের ভ্রান্ত ধারণা থেকে ফিরে আসে। অতঃপর বাকিদের সাথে হযরত আলী রাদি. যুদ্ধ করেন, যা নাহারওয়ান যুদ্ধ নামে প্রসিদ্ধ। খারেজিদের অধিকাংশই সেই যুদ্ধে নিহত হয়। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,৭,৫০৩,]

আপনি লগড ইন নাই, দয়া করে লগ ইন করুন

এই বিষয়ে অন্যান্য বই