একটি স্বপ্নভেজা সন্ধ্যা

লেখক রশীদ জামীল

প্রকাশক কালান্তর প্রকাশনী(সিলেট)

আইএসবিএন 9789849047421

মুদ্রিত মুল্য ৳ ২০০.০০

ছাড়ে মুল্য ৳ ১৫০.০০

রেটিং

ক্যাটাগরি নতুন বই

তানজিনা বসে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন। টেলিভিশনের সংবাদগুলো তিনি নিয়মিত দেখতে চেষ্টা করেন। মানুষ বিনোদনের জন্য নাটক/সিনেমা দেখে। তিনি দেখেন সংবাদ। তারকাছে সেটাই বেশি বিনোদনমূলক মনেহয়।

মধ্যবয়েসী একজন ছড়ি হাতে আবহাওয়ার সংবাদ পড়ছেন। বেচারার চেহারা দেখে মনেহচ্ছে সম্প্রতি তার চেহারার উপর দিকে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের একটি ঝড় বয়ে গেছে। বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। তিনি বললেন, 'আজ সারাদিন বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যাকে বলে ক্যাটস এন্ড ডগ'। ক্যাটস এন্ড ডগ মানে মূষলধারে বৃষ্টি। মূষলধারে বৃষ্টির সাথে বেড়াল অথবা কুকুরের কী সম্পর্ক আছে, তানজিনা ভেবে পেলেন না। ইংরেজিওলারা এমন কিছু ফ্রেইজ তৈরি করে রেখেছে, যেগুলোর কোনো আগামাথা নাই। অথবা হয়ত আছে, তিনি জানেন না। তবে একটি ব্যাপার তানজিনাকে বেশ অবাক করে। ইংলিশ ফ্রেইজগুলো যখন নন-ইংলিশ কান্ট্রিতে ইউজ হয়, তখন সেগুলোতে কেমন তালগুল পাকিয়ে ফেলাহয়! যেমন, Fill একটি ইংলিশ শব্দ। এর অর্থ পূর্ণ করা। কিন্তু এটির সাথে যখন in, up, out ইত্যাদি যুক্ত হয়ে ফ্রেইজ তৈরি হয়, তখন বিভিন্ন অর্থ ধারণ করে।

fill in এবং fill out অর্থ to write information in blanks, as on a form ফরম শূন্যস্থান পূরণ করা (যেমন ফরমের শূন্যস্থান)। আবার ফিলের সাথে যখন up যোগ হয়ে fill up হয়, তখন অর্থ দাঁড়ায় fill to the top বা মুখেমুখে পূর্ণ করা। কেউ যদি বলতে চায় ‘আমি সবসময় পানির জগটি মুখেমুখে অর্থাৎ একেবারে পরপিূর্ণ ভরে রাখি’, তাহলে সেন্টেন্সটি হবে I always filled the water jug up.

তানজিনার মাথায় এখন যে ব্যাপারটি ঘুরছে, সেটিহল ফরম ফিলআপ। ফিলআপ মানে যদি হয় (জগ গ্লাস, ট্যাংকি বা এ জাতীয় কিছু একদম) উপর পর্যন্ত পূর্ণ করা, তাহলে যারা ফরম ফিলাপ করার কথা বলে, সেটা কোন অর্থ মিন করে? ফরম তো ফিল-ইন বা ফিল-আউট করার কথা। কিন্তু স্কুল/কলেজের টিচারদেরও তো ফরম ফিলাপ শব্দটি বলতে শোনা যায়। কেমনে কী?

তানজিনা রিমোর্ট ঘুরিয়ে ইউ টু চ্যানেলে চলে গেলেন। ইউ টু তাদের আজকের অনুসন্ধানি রিপোর্টটি প্রতি ঘণ্টার সংবাদ শিরোনামের মতো প্রচার করছে। প্রচুর টিআরপিও আসছে। আজকাল গঠনমূলক বা সৃষ্টিশীল নিউজ-প্রতিবেদনের প্রতি লোকজনের তেমন একটা আগ্রহ থাকে না। সবাই চায় মাসালা নিউজ। নিষিদ্ধ ব্যাপারের প্রতি মানুষের আগ্রহ স্বভাবজাত।

ইউ টু চ্যানেলের মালিক শিল্পপতি সাজিদ মুহাম্মদ ভাই। সাদা-কালো-বেগুনি মিলিয়ে প্রচুর পয়সা বানিয়েছেন। কিন্তু মিডিয়াওলারা তার পিছু ছাড়তে চায় না। তিনি কীভাবে এত সম্পদ বানালেন, কোন কোন দেশে তার কয়টা বাড়ি আছে, সুইস ব্যাংকে তার ব্যালেন্সের পরিমাণ কতো... একটা না একটা নিয়ে তার পেছনে লেগেই আছে। তিনি চিন্তা করলেন, কাটা দিয়ে কাটা তুলতে হবে। কথার জবাব কথা দিয়েই দিতে হবে। নিজস্ব একটা চ্যানেল থাকলে দুইটা লাভ।

১. অপপ্রচারের জবাব দেওয়া যাবে।
২. নিজেকে শোআপ করা যাবে।

তিনি তার চ্যানেলের নাম রাখলেন ইউ টু। ইন্টারনেটে Me too নামে অত্যন্ত পপুলার একটা সাইট আছে। মি টু হল a movement against sexual harassment and sexual assault বা যৌন হয়রানি এবং যৌন আক্রমণের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন। তিনি দীর্ঘদিন সেই সাইটে অ্যাকটিভ ছিলেন। এমন নয় যে, তিনি সেই আন্দোলনের অংশ ছিলেন। তার ভয় ছিল কেউ তাকে ভিকটিমাইজ করে সেখানে কিছু বলে কিনা। সেখান থেকে ইন্সপায়ার্ড হয়েই তিনি তার চ্যানেলের নাম রেখেছেন You too.

ইউ টু চ্যানেলের আজকের লিড হচ্ছে রান ইন্টু অ্যাডপ্টেড সান। পালকপুত্রের প্রতি দুর্বলতা। ইউ টু চ্যানেলের একটা বিশেষত্ব হল, অনুষ্ঠান যে ভাষাতেই হোক, শিরোনামটা ইংলিশেই দেওয়া হয়। এতে করে অনুষ্ঠানটির স্ট্যান্ডার্ড বেড়ে যায় বলে তাদের ধারনা।

রান ইন্টু অ্যাডপ্টেড সান শিরোনামটা একটু সহনশীল হলেও প্রতিবেদনের ভাষায় মসলাপাতি ভালোই দেওয়া হয়েছে। অ্যাংকারের অ্যাক্সেপ্রেশন এবং বডিল্যাঙ্গুয়েজ যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং। দেখেই মনেহচ্ছে এমন একটি প্রতিবেদন করতে পেরে বেচারী খুবই খুশি...

'দর্শক! ইউ টু’র বিশেষ অনুসন্ধানি অনুষ্ঠান হাড়ির খবরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি মরজিনা রূপা। স্কিনে আপনারা যে বাড়িটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটিহল খাদ্যমন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব খোন্দকার আমিনুর রেজা সাহেবের বাড়ি। এটিকে বাড়ি না বলে প্রাসাদও বলা যায়। পুরো বাংলাদেশে এমন বাড়ি আর দ্বিতীয়টি নেই। বাড়িটি জুড়ে সারাদেশের মানুষের কৌতূহলের কমতি ছিল না। কিন্তু কেউ কখনও এই বাড়ির ভেতরে যেতে পারেনি। সাংবাদিকের যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। সঙ্গতকারণেই সকলের মনে একটা কৌতূহল ছিল, কী আছে এমন বাড়িটির ভেতরে, যে কারণে কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয় না?

জ্বি দর্শক! বাড়িটি নিয়ে আপনাদের মতো আমাদেরও আগ্রহের কমতি ছিল না। আমাদের সাতমাসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে পিলে চমকানোর মতো কিছু খবর। কেউ কি কখনও কল্পনাও করেতে পেরেছিল ভেতরবাড়িতে এসব কাণ্ড-কারখানা ঘটে চলেছে? সুপ্রিয় দর্শক! আসছি আমরা ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে। আমাদের সাথেই থাকুন।'

ভূমিকা দিয়েই পুরো পাঁচমিনিট নাই। সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের অবস্থা আজকাল এমন। দশমিনিটের নিউজে আটারো মিনিট বিজ্ঞাপন। আগে খবরের মাঝেমাঝে বিজ্ঞাপন প্রচার হতো, এখন বিজ্ঞাপনের মাঝেমাঝে খবর প্রকাশিত হয়।

তানজিনা কফির মগ হাতে নিয়ে সোফায় শরীর এলিয়ে বসলেন। একই বাড়িতে থেকেও যে ব্যাপারটি এতদিন তিনি জানতে পারেননি, সেটি আজ টেলিভিশনের মাধ্যমে পৃথিবী জানছে। পৃথিবী কোথায় চলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন বিরতির পরে মেজেন্ডা কালারের রেডিমেট একটি হাসি দিয়ে টিভি অ্যাংকার মেয়েটি আবারো পর্দায় হাজির হয়ে বলল,

'সুপ্রিয় দর্শক! সাথে থাকার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ'। যদিও সে জানে না অধিকাংশ দর্শকই তাদের সাথে ছিল না। কেউ চলে গিয়েছিল চা বানাতে। কেউ জরুরি ফোনকল করতে। কেউ টুকটাক কাজ সারতে। মরজিনা আবার শুরু হলেন...

'আজ আমরা আপনাদের এমন একটি কাহিনির কথা জানাব, যা শুনে আপনারা আতকে ওঠবে। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হবে আপনাদের। আপনারা ভাববেন, মানুষ কী করে এতো নিচে নামতে পারে...'

তানজিনা রীতিমতো বিরক্ত হতে শুরু করেছেন। এরা মূলকথা রেখে এতো বেশি ভূমিকা দেয় যে, ইচ্ছেকরে কষে একটা থাপ্পড় লাগাতে। সবচে ভালো হতো যদি রিমোট দিয়ে তাদের ফালতু কথাগুলো বন্ধ করে ফেলা যেত। সেই সুযোগ নেই। কখনও হতেও পারে।

মরজিনা বলেছেন, 'প্রিয় দর্শক! কথা আর না বাড়িয়ে আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি বহুল আলোচিত সেই ভূবন বিলাসে। বাড়িটি নামের মতোই আলিশান। সুইজারল্যান্ড থেকে আর্কিট্যাক্ট আনিয়ে বাড়িটি ডিজাইন করানো হয়েছে। পুরো বাড়িটি শুধু সিসি ক্যামেরা প্রটেকটেডই না, বাড়িটির সবগুলো গেইট এবং দরজা-জানালা বায়োমেট্রিক সিস্টেমে লক করা। এই বাড়ির আরেকটি বৈশিষ্ট হল, বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখা না গেলেও বাড়িটির ভেতরে বসে বাইরের প্রায় এক স্ক্যায়ার কিলোমিটার দেখা যায়। জ্বি না, মনিটরে দেখার কথা বলা হচ্ছে না। সরাসরিই দেখা যায়। কারণ, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে যে ইটগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো আসলে ইট না। এক ধরনের ওয়ান সাইটেড লুকিং গ্লাস...'

স্কিনে বাড়িটি দৃশ্যমান হল। বাড়ির বিভিন্ন সাইট থেকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে বাড়িটি দেখানো হতে লাগল।

'দর্শক! এই মুহূর্তে সেখানে আছেন আমাদের সিনিয়র রিপোর্টার চুন্নিশাহা। আমি এখন সরাসরি চলে যাচ্ছি তার কাছে।
-চুন্নি! আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন'?

স্কিনে মাইক্রোফোন হাতে রিপোর্টার চুন্নিশাহার ছবি। কিন্তু তার কথা শোনা যাচ্ছে না।

-চুন্নি! আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন! হ্যালো!
চুন্নির ঠোঁট নড়ছে কিন্তু সাউন্ড হচ্ছে না। উপস্থাপিকা সামান্য বিব্রত হচ্ছেন। ‘দর্শক! আমরা দু:খিত। স্যাটেলাইট সিগনাল দুর্বল হওয়ার কারণে সংযোগ পেতে একটু বিলম্ভ হচ্ছে। আপনারা আমাদের সাথেই থাকুন। হ্যালো চুন্নি! হ্যালো! শুনতে পাচ্ছেন আমাকে’?

চুন্নিশাহার আওয়াজ শোনাগেল। সংযোগ পাওয়া গেছে। মুখ বাঁকিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে শুরুহল তার রিপোর্টিং-

'ধন্যবাদ মরজিনা। সুপ্রিয় দর্শক শ্রোতা। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি যে বাড়িটির সামনে, এটি খোন্দকার আমিনুর রেজার বাড়ি। বাড়িটির নাম ভূবন বিলাস। নামের মতোই একটা বাড়ি। রেজা সাহেব সরকারি কাজে প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকেন। ঘরে তাঁর স্ত্রী মিসেস জলি একা একা সময় পার করেন। সেই একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে বের হবার জন্য তিনি এমন কাজ করবেন, সেটা কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না'।

টেলিভিশন স্কিনের ডানপাশে ইনসেটে মিসেস জলির একটি ছবি দেখানো হচ্ছে। ছবিটিতে জলি গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। এটি একটি মন খারাপ করা ছবির পোজ হতে পারতো, কিন্তু জলির মুখভর্তি অন্যরকম হাসি। এই হাসির কী নাম দেওয়া যায়? চুন্নিশাহা বলে যাচ্ছেন,

'দর্শক! স্কিনে আপনারা যাকে দেখতে পাচ্ছেন, তিনি হচ্ছেন মিসেস জলি আমিন। খোন্দকার আমিনুর রেজার ওয়াইফ। এই মহিলা বিভিন্ন নারীবাদী সংস্তার সাথে জড়িত। মাইক হাতে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। কিন্তু তার নিজের মনের ভেতরটা যে এতো অসুন্দর, কে ভেবেছিল।

প্রেম কোনো অপরাধ নয়। এটা আমরা বিশ্বাস করি। কিন্তু নোংরামীকে তো আমরা প্রেম বলতে পারি না। তাও আবার একজন বিবাহিতা নারী হয়ে। সেটাও আবার এমন একটি ছেলের সাথে, যাকে তিনি নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করছিলেন। রোহান নামের যে ছেলেটির প্রেমে নিজের বিবেক বুদ্ধি বিসর্জন দিলেন মিসেস জলি, সেই ছেলেটি তার নিজের বাড়িতেই থাকে। সতের বছর থেকে এই ছেলেকে তিনি তার আপন ছেলের মতোই বড় করেছেন। আর সেই ছেলেটির সাথেই...।

সুপ্রিয় দর্শক! আমাদের এই সমাজে নারী ধর্ষণ একটি পরিচিত জঘন্যতা। এরসাথে মোটামুটি এই সমাজ ভালোই পরিচিত। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও কোনো কোনো মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে। এতো জঘন্য একটা কাজ, কিন্তু অপহরহ ঘটছে বলে আজকাল তেমন খবর আর সেভাবে গুরুত্ব পায় না। কিন্তু একজন নারী কর্তৃক পুরুষ ধর্ষণের সংবাদ সম্ভবত এটাই প্রথম। দর্শক! থাকুন আমাদের সাথে। আসছি আমরা আরেকটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন বিরতি নিয়ে'। 

আপনি লগড ইন নাই, দয়া করে লগ ইন করুন

ক্যাটাগরি বই