সমুদ্র ঈগল

লেখক আসলাম রাহি এম. এ

অনুবাদক ডা. মুহাম্মাদ ইলিয়াস আব্দুল গনী

প্রকাশক কালান্তর প্রকাশনী(সিলেট)

আইএসবিএন 9789849047384

পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৯২

মুদ্রিত মুল্য ৳ ৩০০.০০

ছাড়ে মুল্য ৳ ২২৫.০০(-25% Off)

রেটিং

ক্যাটাগরি ইসলামি অনুবাদ বই

সমুদ্র ঈগল

দক্ষিণ স্পেনের উপকুলীয় ওয়াদি আলবাশারাত। তিনদিক থেকে প্রাকৃতিক প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজের ঢেউখেলানো আলবাশারাত পর্বতশ্রেণি। সে পর্বতশ্রেণির শালির পাহাড়ের চূঁড়ায় একটা চাটানের উপর বসে রয়েছেন একজন লোক। লোকটা যেন সদ্যই যৌবনের উঠুন পেরিয়ে পৌঢ়ত্বের দরজায় কড়া নাড়াচ্ছে। তাঁর হাতে রয়েছে ছাগলের চামড়ার তৈরি একটা ছড়ি। দেখলে যে কেউ তাঁকে একজন রাখাল হিসেবেই মনে করবে। কারণ, তিনি যেখানে বসে আছেন ঠিক তার নিচেই ঘাস চিবুচ্ছে একপাল মেষ-ছাগল।

প্রৌঢ় লোকটি বে-তাব দৃষ্টি মেলে শালিরের গা ঘেঁষে বয়ে চলা ফারদিশ নদীর তীরে রাহিবদের খানকাগুলোর দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি বার বার তাঁর হৃদয়ে হতাশার কামড় বসাচ্ছিল। তাঁর চাহনি দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ওদিক থেকে কারও আগমনের অপেক্ষা করছিলেন।

আলবাশারাত শব্দের অর্থ সবুজ ঘাসে ছাওয়া ভূমি। গ্রানাডা শহরের দক্ষিণ দিকে যে সব সবুজ উপত্যকার মিছিল সাগরের উপকুল পর্যন্ত এগিয়ে চলেছিল পুরো আন্দালুসিয়ায় এরচে মনোরম কোনো এলাকা ছিল না। উপত্যকাটি ছিল সবধরনের ফসলের গাছের উৎসভূমি। বিশেষ করে আঙুর, নারাঙ্গি, আনজির, লেবুর সমারোহ ছিল দেখার মতো।

এই আলবাশারাত ওয়াদিতে বসবাস করতো কতিপয় মুসলিম গোত্র। বীরত্ব আর ঐতিহ্যে এরা ছিল আন্দালুসিয়ায় অদ্বতীয়। কারও অধীন হয়ে থাকা ছিল তাঁদের স্বভাব -বিরোধী।

আমরা যে কালের কথা বলছি—তখন মুসলিম আন্দালুসিয়ার ঐতিহ্যবাহী রাজধানীর পতন হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের শেষ শাসক আবদুল্লাহ পরাজয় স্বীকার করে রাজা ফার্দিনান্দের হাতে গ্রানাডার চাবি তুলে দিয়ে অশ্রুসজল চোখে আফ্রিকায় চলে গিয়েছিলেন। তাঁর চলে যাবার পর স্পেনের খ্রিষ্টান শাসকরা জোরপূর্বক মুসলমানদের নাসারা বানিয়ে নিচ্ছিল।

যেসব মুসলমানদেরকে তারা খ্রিষ্টান বানিয়ে নিতো, ওরা গির্জায় যেতো ঠিক, তবে ঘরে এসেই তারা নামাজ আদায় করে নিত। কারণ, ওরা আত্মরক্ষার জন্যে বাহ্যত নাসরানিয়াত গ্রহণ করলেও অন্তরে অন্তরে তাঁরা ছিল সাচ্চা মুসলমান। সাধারণ নাসারা আর শাসকশ্রেণীকে আশ্বস্ত করার জন্যে তাঁরা গির্জায় গিয়ে বিয়ে-শাদী করলেও বাড়িতে এসে তাঁদের ঐতিহ্য অনুযায়ী দ্বিতীয়বার আকদে নিকাহের আয়োজন করতো। আল বাশারাত ছাড়া পুরো স্পেনের অবস্থা ছিল একই ধরনের নাজুক। তবে আল বাশারাত ওয়াদিটা ছিল এসব বিধি-ব্যবস্থা থেকে স্বাধীন। কারণ, তারা ছিল যুদ্ধা জাতি। আর তাদের সাথে চলছিল স্পেনের শাসকদের একেরপর এক লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা।

এটা ছিল সেই অভিশপ্ত সময়ের কথা—যখন খ্রিষ্টান-শক্তি পুরো স্পেন তাদের করতলগত করে নিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, তারা স্পেন জয় শেষে আফ্রিকার বিশাল একটা উপকুলীয় অঞ্চল জয় করে সেখানে তাদের সেনাবাহিনী রেখে দিয়েছিল।

হিস্পানীয় মুসলমানরা তাঁদের ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ আলগ হয়ে পড়েছিল। তাঁদের সামনে হতাশার ভয়ঙ্কর সাগর আর নৈরাশ্যের ঘনকালো অন্ধকার ছাড়া কিছুই ছিল না।

তখনো আল বাশারাত ওয়াদিতে যে সমস্ত মুসলমান তাঁদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রেখেছিল এরা ছিল মোট দুভাগে বিভক্ত।

প্রথম দলটিকে বলা হতো আদনানি গোত্র। এদের মধ্যে ছিল—আরবের বানু হাশিম, বানু উমাইয়া, বানু মাখজুম, বানু ফিহর, বানু কেনানা, বানু হুজাইল, বানু তামিম, বানু সাকিফ, ও বানু রাবিয়া।

আর দ্বিতীয় দলটিকে ডাকা হতো কাহতানি গোত্র নামে। এদের মধ্যে ছিল—বানু আজদিনি, বানু খাজরাজ, বানু আওস, বানু হামদান, বানু তায়ি, বানু খাওলান, বানু মুররা, বানু লাহাম, বানু জুযাম, বানু কিন্দাহ, বানু হিমইয়ার, বানু কুজাআ, বানু হাওয়াজিন ও বানু কালব।

কাহতানিদের বেশিরভাগই ছিলেন বানু খাজরাজ আর আর বানু আউস। এদেরকে আনসারিও বলা হতো। কেননা, এঁদের পূর্বপুরুষরাই রাসূলুল্লাহ সা. ও মুহাজিরদেরকে সাহায্য করেছিলেন।
আন্দালুসিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা পাবার পর তাঁদের বেশিরভাগই ওখানে চলে এসেছিলেন। মদিনায় তাঁদের উল্লেখযোগ্য সদস্য ছিল না বললেই চলে।

তখনকার সময় কাহতানি গোত্রের নেতা যিনি ছিলেন তাঁর নাম ছিল কাব বিন আমির। আর আদনানি গোত্রের নেতার নাম ছিল সাদ বিন সালামা।
কাহতানি নেতা কাবের ছিল এক ছেলে। তাঁর নাম ছিল মুগিরা বিন কাব। আর মেয়ে ছিল দুজন। যথাক্রমে নাবিল এবং মাআজ। অপরদিকে আদনানি নেতা সাদের একমাত্র কন্যার নাম ছিল নুবায়রা।

এই দুই যোদ্ধা জাতি স্পেনের পতনের পরও তাঁদের স্বাধীনতা-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল এবং তখনো তা টিকিয়ে রেখেছিল। যদিও তখন পুরো স্পেনের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত মর্মন্তুদ।

শালির পাহাড়ের উপরে বসে থাকা সেই প্রৌঢ়; যিনি চূড়ার চাটানে বসে আকুল হয়ে ফারদিশ নদীর কিনারে গড়ে ওঠা রাহিব পল্লীর দিকে তাকাচ্ছিলেন হতাশা আর ক্ষোভে; তিনি মাঝে মাঝেই হাতের ছড়ি দ্বারা পাথরের গায়ে জোরে জোরে আঘাত হানছিলেন। কতক্ষণ এভাবে বসে থেকে কী যেন ভেবে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কয়েক পা পায়চারি করলেন, আবার তিনি রাহিব পল্লীর দিকে তাকালেন। কিন্তু হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন—

প্রভু হে কেমন করে শেষ হবে এ ইমতিহান।
আমাদের দিলে তো জ্বলছে হতাশার আগুন লেলিহান।
নিভে যাচ্ছে হৃদয়েরর শামাদানে রাখা আশার চেরাগ।
পূর্বাকাশে নেই কাঙ্ক্ষিত আলো, পাখির কুজন রাগ।
চলিছে ভাঙার খেলা গড়ার নেই চিহ্ন কোনো।
মাহরুম মোরা বখত থেকে শুষ্কপত্র বৃক্ষ যেন।
প্রভু! তোমার দুনিয়ায় কার কাছে চাব ইনসাফের বিচার,
সবই যে আজ আত্মক্লেদে ডুবন্ত উজাড়।
প্রভু! তুমি তো দেখছো চেয়ে কোথায় আমরা কোথায় আমাদের সন্তান।
মরে যাই যতোই তবু গাইব তব গান হে মেহেরবান।

এটুকু বলার পরই প্রৌঢ়ের আত্মলীন অবস্থাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কারণ, প্রৌঢ় দেখতে পেলেন ঘোড়ায় চড়ে তাঁরই দিকে ছুটে আসছে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ উদ্ভিন্ন যৌবনা দুটি গোলাপ কমনীয় বালিকা। তাদের সাথে চলে আসছিল একজন কালো হাবশি। সম্ভবত লোকটা তাদের গোলাম হবে।

পাহাড়ে উঠে মেয়ে দুটো তাদের ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল। তাদের দেখাদেখি কালো হাবশি লোকটিও তার ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালো।

মেয়ে দুটো ছিল অনির্বচনীয় সুরঞ্জনা। তাদের গায়ের রঙ এবং গড়ন-গঠন ছিল প্রায় একাকার। তারপরও ছোট মেয়েটির চেহারায় ছিল আলাদা এক আকর্ষণ; যা কেবল অনুভব করা যায়। সেই অনুভবের গায়ে ভাষার চাদর জড়ানো কারও পক্ষেই বোধহয় সম্ভব নয়।

ছোট মেয়েটা প্রৌঢ়ের কিছুটা নিকটে এসে তাকে লক্ষ করে বলল, চাচা মুনজির বিন জুবাইর! আমি উপর থেকে আপনার অবস্থাটা পর্যবেক্ষণ করে আসছি। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আপনি চিরাচরিত অভ্যাসের বিপরীতে ফারদিশ নদীর তীরবর্তী রাহিব পল্লীর দিকে উদ্বিগ্ন হয়ে বার বার তাকাচ্ছেন। আপনি কি ওখান থেকে কোনো তুফান জেগে ওঠার সন্দেহ করছেন, নাকি ওখান থেকে কোনো কল্যাণের প্রত্যাশা করছেন?

 

আপনি লগড ইন নাই, দয়া করে লগ ইন করুন

এই বিষয়ে অন্যান্য বই