সানজাক-ই উসমান

লেখক প্রিন্স মুহাম্মদ সজল

প্রকাশক গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স

আইএসবিএন 9789848254097

পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৩২

মুদ্রিত মুল্য ৳ ৫০০.০০

ছাড়ে মুল্য ৳ ৩৫০.০০(-30% Off)

রেটিং

ক্যাটাগরি ইসলামি বই , ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বইয়ের রিভিউ দেয়ার পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে-
১. পাঠকের ভাল লেগেছে, শিক্ষণীয় মনে হয়েছে; সংগত কারণেই পাঠক চাচ্ছেন অন্যদের সাথে শেয়ার করতে- যেন সবাই বেনিফিটেড হয়।
২. বইটি পাঠকের ভাল লাগে নি; তাই তিনি তার মন্তব্য নেগেটিভলি প্রকাশ করে জানান দিতে চান।
অবশ্য উপরোক্ত দুই কারণেই বইটির প্রচার বাড়ে, প্রসারও বাড়ে বৈকি! ইদানিং প্রসার বৃদ্ধির জন্যও কেউ কেউ আদিস্ট অথবা নির্দেশিত হয়ে রিভিউ লিখছেন। তবে যিনি যে কারণেই রিভিউ দেন, প্রাজ্ঞ পাঠক সমাজ বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়টিই মুখ্য ভাবে নেন বোধকরি।

'সানজাক-ই-উসমান' বইটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছাত্রের লেখা ইতিহাসের ভিন্ন এক মানবিক বর্ণনা। প্রথাগত ঐতিহাসিক গণের বিরক্তিকর উপস্থাপনা আর ইতিহাস নির্ভর ঔপন্যাসিকগনের অতি মাত্রায় রং চং লাগানোর ধারা হতে বাইরে এসে নতুন স্টাইলের এক আলেখ্য।
সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত ৬১টি শিরোনামে লেখা বইটিতে রয়েছে মহাকালের এক প্রস্ত বিবর্তন।
১. মৃত্যুর সম্রাট
২. জানবাজ মামলুক
৩.গাজীর সোড়া
৪.চারদিকে শত্রু
৫. বারুদী সালতানাত
৬.বীর-মহাবীর
৭. নয়া দুনিয়ায়
এখানে ১১৬২ সাল হতে শুরু করে ১৫০০ সাল পর্যকার ঘটনাবলীর চুম্বক অংশ গুলোর আকর্ষণীয় উপস্থাপন রয়েছে। বিষয়বস্তু ও ঘটনাপ্রাহ অনুধাবনে আপনাকে জানতেই হচ্ছে বইয়ের প্রারম্ভে সংযুক্ত 'নির্দেশিকা'র। আরও জানতে হচ্ছে মঙ্গেলিয়া-চীন-রাশিয়া হতে আনাতোলিয়া হয়ে মধ্যপ্রাচ্য আফ্রিকা আর পশ্চিমে ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। আপনি আরও পরিচিত হচ্ছেন কিছু পরিভাষার সাথে:
১. স্তেপ
২. তাতার
৩. উহঘুর
৪.কিপচাক
৫. খান-খাকান
৬. নাইট, টেম্পলার ইত্যাদি টার্মের সাথে।

#প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে মোঙ্গলদের উত্থান, বিস্তার আর সাহসিকতার পাশাপাশি বরবরতার চিত্রায়ন। টিকে থাকার লড়াইয়ের মূলমন্ত্র হিসেবে এই জাজাবর জাতি গ্রহণ করেছিল একটি কথা-
‘ইরিন মোর নিগেন বুই”
অর্থাৎ "মানবজাতির পথ একটাই। যুদ্ধ!!"মোঙ্গলদের এই অপ্রতিরোধ্যে যাত্রায় বাধা বিপত্তির ছিটেফোটা ছিল একজন সুলতান জালাল-উদ-দীন, যাকে এ অধ্যায়ে পাওয়া যাবে হালকা প্রতিরোধ গড়তে।

#দ্বিতীয় অধ্যায়ে মোঙ্গল জয়রথ থমকে যাবার দৃশ্য দেখা যায় মিশরীয় জানবাজ মামলুকদের সামনে। একের পর এক মুসলিম সম্রাজ্যেগুলোর অসহায় আত্মসমর্পনের বিপরীতে বাহরিয়্যা মামলুক নেতা বাইবাস বুঝিয়ে দিলেন যে মোঙ্গলরাও পরাজিত হতে পারে। বাহিরে থেকে মামলুক আর ভেতর থেকে বন্দিনী মুসলিম নারীরা মোঙ্গলদের মধ্যে ধর্মের বীজ বুনলেন। যার ফলশ্রুতিতে চেঙ্গিজ খানের বিশ্বজয়ের অভিযানে বেরোনের একশ বছরের মধ্যেই তার গড়ে তোলা সম্রাজ্যের চারটি খানাতের তিনটিই মুসলিম প্রধান হয়ে পড়ে; চতুর্থটি হয়ে যায় বৌদ্ধ অধ্যুষিত।এ অধ্যায় শেষ করা হয় লেখকের কালজয়ী মন্তব্যের মাধ্যমে-
"সভ্যতা এভাবেই অসভ্যদের কাছে হেরে গিয়েও শেষমেষ তাদের জয় করে নেয়।"
#তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে দেখতে পাবেন মোঙ্গলীয় বর্বরতার ধ্বংসস্তুপ থেকে নতুন শক্তির উত্থান যার সূচনা হয়েছিল আনাতোলিয়ার তুর্কি বীর আরতুগুলের সন্তান উসমানের নেতৃত্বে। কঠোর পরিশ্রম, ঈমানী চেতনা, অসাধারণ বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তায় গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর ইতিহাসে গ্রেট উসমানিয় সম্রাজ্য।সুলতান বায়েজিদ, মুরাদ আর মুহাম্মদ আল ফাতিহর নেতৃত্বে মহানবী (স:) এর কনস্টানটিনোপল জয়ের ভবিষ্যৎ বানী পূর্ণ করা হয়, যার মাধ্যমে ইউরোপের বড় অংশ পদানত হয় অটোমানদের হাতে। ধ্বংসস্তুপ থেকে নতুন সভ্যতার জন্ম ও বিকাশ দেখানো হয়েছে এখানে। এই অটোমানদের সফলতার চাবিকাঠি ছিল তিনটি-
১.সুশাসন
২.ইনসাফ
৩.পুরোনোকে লালনের সাথে সাথে নতুনকে গ্রহণ করার মানসিকতা

#ষষ্ঠ অধ্যায়ে পুরোটা জুড়ে রয়েছে অটোমান আর ইউরোপের বীর-মহাবীরদের গল্প-চিত্র। মধ্যযুগে ইউরোপের সাম্রাটদের উপর পোপের প্রভাব প্রতিপত্তি আর অর্থ বিত্তের বৈভব আর ক্রুসেডের সুবিশাল সুদূর প্রসারী প্রভাব জানা যায় এখান থেকে। ড্রাকুলা, হুনায়দি আর উজুন হাসানের মোকাবেলায় অটোমানদের নিরন্তর সংগ্রাম আপনাকে রোমাঞ্চিত করবে। একদিকে অটোমানদে ট্যাক্স দিতে ভ্যানিসের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা অপরদিকে পোপকে চাঁদা দিতে দিতে সালতানের কোষাগারের দুরাবস্থার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে নির্মোহ ভাবে। মুসলিম নেতৃবৃন্দের ভোগবিলাসীতা, অলসতা আর অদূরদর্শিতার ফলশ্রুতিতে মুসলিম সম্রাজ্য ডুবে যেতে লাগলো হতাশা আর পরাজয়ের বৃত্তে। ক্ষমতার লড়াই আর ভাই-ভাইয়ে বিদ্রোহও এর অন্যতম কারণ বলে দেখানো হয়েছে।

#শেষ অধ্যায়ে রিকন কুইস্তা’র পরিচয়ের মাধ্যমে আপনি পাবেন আরব যাযাবরদের সফলতার আর শহরে বিলাসীদের ব্যর্থতার মূল কারণ। লেখকের ভাষায়-
“এই দুর্দান্ত স্বপ্নবাজ কিন্তু বাস্তববাদী জাতিটা যখন অস্টম ও নবম শতাব্দীতে প্রাচুর্যের বন্যায় ভেসে গেল তখন থেকেই তাদের মধ্যে শহরে সুশীলতার জন্ম হতে লাগল।
স্পেনের ঘটনা প্রবাহে এ কথাই যথার্থ হয়েছিল:
'যাদের হৃদয়ে মরচে ধরে, তাদের পতন কেউই ঠেকাতে পারেনা।'
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে দ্রুত বদলায়মান পৃথিবীতে ইউরোপীয়দের পুনরাত্থান আটলান্টিকের উপারে আমেরিকা আবিষ্কার আর ক্যাথলিক ক্ষুরধার মগজ দেখেছে বিশ্ব। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের খিলাকত নিয়ে ত্রিমুখী লড়াই, শিআবাদের নতুন সংস্করণ সাফাভি মতবাদের জন্ম আর অটোমানদের দৃঢ়তার গল্প চলতে লাগলো। এসবের সাথে ষোড়শ শতাব্দী আনল 'রেনেসাঁ'।

*বইটির ভাললাগার বিষয়কগুলো:
১.আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ, নজরকারা রাজকীয় ইসলামী ভাবধারায় করা ডিজাইন সাথে চিত্তাকর্ষক ফ্ল্যাপ
২. 'লেখকের কথা'টা কনস্ট্রাকটিভ যা একটা পারফেক্ট ইনট্রোর কাজ করছে। ভাল বইয়ের তিন ধরণের শ্রেনী বিভাগের বিষয়টি একটি অনন্য উপস্থাপনা। লেখকের ভাষায়- 
“পৃথিবীতে তিন ধরণের ভাল বই আছে। প্রথম ধরনের বই আপনাকে আনন্দ দেবে, পড়বেন, ভাল লাগবে, তারপর ভুলে যাবেন। দ্বিতীয় ধরনের বই আপনাকে জীবন নিয়ে ভাবতে শেখাবে। আর তৃতীয় ধরনের বই আপনার জীবনটাকে বদলে দেবে।’’

৩.লেখক বয়সে তরুন হলেও বইটির কনটেন্ট ও কনটেক্সটে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার ছাপ বিদ্যমান
৪.থ্রিল মিশ্রিত ফিকশনের ইতিহাস সিদ্ধ উপস্থাপনা যা, আপনাকে কোনভাবেই বিরক্ত করবে না
৫.কিছু টার্মের প্রচালিত অর্থও ব্যাখ্যার বিপরীতে ভিন্নতর উপস্থাপন যেমন-
১.ইয়াজুজ-মাজুজ
২.জানিসারি
৩.হেরেম
৪.মসলা
৫.গ্লোবালাইজেশন

৬.সম্মুখ সমর গুলোর বিস্তারিত বিবরণ
৭. এছাড়াও লেখকের চমৎকার চমৎকার কিছু মন্তব্য বইটিকে অনন্য উচ্চতায় উঠিয়েছে। যেমন:
১) চেঙ্গিস খান নিয়ে লেখক বলছেন-
“মানব ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম পুরুষটিরও ভালবেসেছিলেন। তাকে শাসন করার অধিকার শুধুু দুজন নারীরই ছিল। প্রথম জন তার মা হোয়েলুন, দ্বিতীয় জন বোর্তি। 
জীবন মৃত্যুর সন্ধিমানে চেঙ্গিস খানের আত্মজিজ্ঞাসা-
“বলতো আমি সারা জীবনে ভালো কি করেছি? আমার জীবনের সবচেয়ে ভাল কাজ কি?"
২) মোঙ্গলদের জয়রথ থামানো মিশরীয় মামলুকদের নিয়ে লেখকের মন্তব্য
“আইন জালুতের যুদ্ধের মাধ্যমে আরেকটা বিষয় স্পস্ট হয়ে যায়, মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেবার মত কোন আরব রাজনৈতিক সামরিক শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। নেতৃত্ব চলে গেছে তুর্কি মামলুকদের হাতে।
৩). স্পেনের কর্ডোভার পরাজয় সম্পর্কে লেখাকর মন্তব্য-
"এক বিজয়ী জাতির তালোয়ারে নয়, হৃদয়ে মরচে ধরেছে। যাদের হৃদয়ে মরচে ধরে, তাদের পতন কেউই ঠেকাতে পারে না।
৪). জাতি হিসেবে মুসলমানদের নিয়ে মোঙ্গলদের মন্তব্য ছিল মারাত্নক ধরনে নিচু ধরনের
“চেঙ্গিস খান এবং তার সন্তানরা মুসলিমদের দাসের জাত বলে ডাকতেন।’’
জ্ঞান বিজ্ঞানের খুটিনাটি বিষয়ে প্রয়োজনীয়তা ও অপপ্রয়োগ নিয়ে বলা হয়েছে-
“যৌক্তিকভাবে ধর্মীয় বিষয়ের ফায়সালা করার শুভ উদ্দেশ্যে একসময় যে বাহাস শুরু হয়েছিল কালে কালে সেই বাহাস পরিণত হয়েছিল বিভেদের হাতিয়ারে।
আর এজাতির বিবর্তনটা ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। 
মানব সভ্যতার দুইতৃতীয়াংশ স্থানে পৌছে গিয়েছিল আরব মুসলিমরা দুটো কারণে-
১. ত্যাগী মনোভাব। ২.যাযাবর স্বভাব আর বাস্তববাদী চিন্তাভাবনা।
৫. অধিকাংশ মোঙ্গলই ইসলামের বা বৌদ্ধ ধর্মের গ্রহণ প্রসঙ্গে লেখকের মন্তব্য-
“সভ্যতা এভাবেই অসভ্যদের কাছে হেরে গিয়েও শেষ মেষ তাদের জয় করে নেয়।”

* বইটির অসম্পূর্ণতা:
১.খান তেমুজিনকে পৃথিবী বাসি ‘চেঙ্গিজ খান' নামে চেনে। এ বইয়ে ‘চেঙ্গিজ’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে কিছু বলাহয় নি; উপরন্ত এহেন শব্দের হঠাৎ আগমনের হেতুও বোধগম্য হয় নি।
২. এই বইয়ে ইতিহাসের চলার গতি মোঙ্গল ঘোড়ার গতিবেগের চেয়েও অধিক, যা সাধারণ পাঠকদের মানিয়ে নেওয়া কষ্টকর।
৩. সম্মুখ সমর গুলোর টেকনিকাল ও ট্যাকটিকাল বিশদ বর্ণনায় পাঠককুলের আগ্রহে ও ধৈর্য্যে চিড় ধরিয়েছে। এ যুগের পাঠক কখনও কখনও চায় শুধু যুদ্ধের ফলাফল জানতে; সাথে কিঞ্চিত যুদ্ধ বিবরণ কিংবা পর্যালোচনা; বিস্তারিত নয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

আপনি লগড ইন নাই, দয়া করে লগ ইন করুন

এই বিষয়ে অন্যান্য বই